একাত্তরের পরাজিত শক্তির দোসররা মাথার মধ্যে হিংসার কতটা আগুন বহন করে, স্বাধীনতার ৫৪ বছর তা এত তীব্রভাবে বোঝা যায়নি, যার আঁচ লাগতে শুরু করে চব্বিশের জুলাই–আগস্ট অভ্যুত্থানের অব্যবহিত পর থেকে। শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতনের পর সৃষ্ট নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি দেখে উদারপন্থি পর্যবেক্ষকদের অনেকে ভেবেছিলেন, এগুলো তাৎক্ষণিক উত্তেজনার বহিঃপ্রকাশ বৈ কিছু নয়। শিগগিরই মিলিয়ে যাবে সাবানের ফেনার মতো। ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনে অবদমিত মানুষের বিক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া মাত্র। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে যে সেসব ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড ছিল আসলে পরাজিত শক্তির বিষাক্ত নিশ্বাসের দাহ্যতা। দেশের বাইরে থেকে ইউটিউবের মাধ্যমে অনলাইন অ্যাকটিভিস্টদের কেউ কেউ বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও বিজয় দিবস সম্পর্কে এমন সব বিষাক্ত কথাবার্তা বলছে, যা কোনো শিক্ষিত মানুষের পক্ষে লেখা বা বলা–কোনোটাই সম্ভব নয়। বাংলাদেশের একজন ইউটিউবার ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসকে পিউবিক হেয়ারের সঙ্গে তুলনা করে। যে উর্দু শব্দটি দ্বারা পিউবিক হেয়ারের বাংলা করা হয় সেটা উর্দু হরফে লিখলে অর্থ দাঁড়ায় চুল। দুঃখিত এর চেয়ে স্পষ্ট করে সেই কদর্য শব্দটি লিখতে আমার লিখনী অক্ষম। আমার সম্পাদকও হয়তো সেটি ছাপার অনুমতি দেবেন না। কেননা সংবাদপত্র জনগণের ভাষায় কথা বললেও অশালীন শব্দ লিখে না।
বিদেশে বসে যেমন দেশের ভিতরে থেকেও কেউ কেউ ১৬ ডিসেম্বরকে বিজয় দিবস মানে না বলে বক্তৃতা করে চলেছেন। এ ধরনের বক্তৃতা স্পষ্টতই রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল। তাহলেও রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা হয়নি। যিনি এ ধরনের কথা বলছেন তিনি খুব বিখ্যাত কেউ না হলেও একটি নিবন্ধিত দলের জেনারেল সেক্রেটারি। হয়তো এসব কারণেই তিনি তাঁর নিজের নির্বাচনি এলাকায় জনরোষের শিকার হয়েছিলেন। এই নেতা জনরোষের শিকার হওয়ার ঘটনায় এনসিপির প্রধান এবং একজন নেত্রী উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, যদিও জুলাই যোদ্ধাদের এই দলটিকে বাংলাদেশে মবোক্রেসির অন্যতম প্রমোটর মনে করা হয়ে থাকে। আরেকজনকে বলতে শুনলাম, একাত্তরের প্রজন্ম ইতিহাসের নিকৃষ্ট প্রজন্ম। এদের মুক্তিযুদ্ধ মিথ্যা। এ দেশে কোনো যুদ্ধ হয়নি। ৩০ লাখ মানুষের জীবনের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন–সার্বভৌম বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ কথা বলা সম্ভব হচ্ছে; ভাবতেও অবাক লাগে! অথচ সরকার নির্বিকার। যারা মহান মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, স্বাধীনতা ও বিজয় দিবস নিয়ে ক্রমাগত নেতিবাচক ও কুরুচিপূর্ণ কথা বলে চলেছেন তারা সব সময়ই ভারতের দিকে আঙুল তুলে থাকেন। তাদের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে মনগড়া কিছু যুক্তি থাকলে থাকতেও পারে।
মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের ভারতনির্ভরতা, মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অব্যাহত সহযোগিতা, মিত্রবাহিনী হিসেবে ভারতীয় সৈন্যদের বাংলাদেশ ভূখণ্ডে প্রবেশ, ১৬ ডিসেম্বর মিত্রবাহিনীর কাছে পরাজিত পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণ, বন্দি পাক সৈন্যদের ভারতে স্থানান্তর, মুজিব সরকারের অতিমাত্রায় ভারতপ্রীতি ইত্যাদি কারণে পুরো বিষয়টিকে খণ্ডিতভাবে দেখার ফাঁক তৈরি হয়েছে। কিন্তু সঠিক মূল্যায়নের জন্য ডিটেইলস দেখতে হবে। বৈদেশিক সম্পর্ক বা অভ্যন্তরীণ রাজনীতি–উভয় ক্ষেত্রে রণকৌশল বা স্ট্র্যাটেজি বলে একটা অতিগুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। স্থান–কাল–পাত্র অনুযায়ী তা নির্ধারিত হয়। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালির ২৩ বছরের বিরামহীন সংগ্রামের শেষ অধ্যায়। মুক্তিযুদ্ধের উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা। সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য বাস্তবতার নিরিখে যে রণকৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন ছিল সেটাই তখন গ্রহণ করা হয়েছে। ২৫ মার্চ নিরস্ত্র বাঙালির ওপর রাতের অন্ধকারে পাকবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ার পর বিপন্ন বাঙালির জন্য প্রতিবেশী দেশের সাহায্য নেওয়া ছাড়া আর কী পথ খোলা ছিল? ৯ মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে এসে ৩ ডিসেম্বর পাক–ভারত যুদ্ধ বাধে। পাক–ভারত যুদ্ধে পাকিস্তান পরাজিত হয় এবং যুদ্ধের রীতি অনুযায়ী নিয়াজির বাহিনী বাংলাদেশ–ভারতের যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধারা বিজয় নিশান উড়িয়ে ঢাকায় প্রবেশ করে। এখানে উত্তোলিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের সোনালি মানচিত্রখচিত পতাকা। অর্জিত হয় মুক্তিযুদ্ধের ঈপ্সিত লক্ষ্য। এটা মুক্তিযুদ্ধের বিজয় নয় তো কী! সেই সময়ের রণকৌশল সঠিক ছিল কি না, তা নিয়ে হাজার বছর ধরে একাডেমিক তর্কবিতর্ক চলতেই পারে।
তাই বলে বিজয় বাংলাদেশের নয়–ধরনের কুটিল ব্যাখ্যা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বাংলাদেশ তো একটা ছোট দেশ। ১৯৭১ সালে তার না ছিল অস্ত্র, না ছিল অর্থ। সম্বল ছিল তার কেবল জনবল আর বিপন্ন মানুষের স্বাধীনতার অদম্য আকাঙ্ক্ষা। ১৯৩৯ সালে শুরু হওয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয়ই ছিল শক্তিমান। তখনো দেশ দুটি পরাশক্তি। ওয়াশিংটনের সঙ্গে তখনো ছিল মস্কোর আদর্শগত বৈপরীত্য ও মনস্তাত্ত্বিক লড়াই। ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত আমেরিকা সোভিয়েত ইউনয়নকে স্বীকৃতি পর্যন্ত দেয়নি। তেত্রিশে এসে স্বীকৃতি দিলেও ওয়াশিংটন–মস্কোর সম্পর্ক ছিল বৈরিতাপূর্ণ। তা সত্ত্বেও ২২ জুন জার্মানির নাৎসি বাহিনী কর্তৃক সোভিয়েত ইউনিয়নের বারবারোসা আক্রান্ত হলে মস্কোর নেতা যোসেফ স্তালিন আজন্ম শত্রু ওয়াশিংটনের প্রতি মিত্রতার হাত বাড়ান। সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন মিত্রশক্তির অংশ হয়ে যায়। জার্মানির আগ্রাসন প্রতিরোধে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে মস্কো তখন বিপুল সামরিক সহযোগিতাও পায়। সেটা ছিল কৌশলগত মিত্রতা। নাৎসি বাহিনী বিভিন্ন রণাঙ্গনে বিভিন্ন দেশের বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে।
কাজেই কৌশলগত মিত্রতার যারা অপব্যাখ্যা করেন তারা অর্বাচীন কিংবা ধুরন্ধর। দূরের বা কাছের পরদেশের সাহায্য–সহযোগিতা ছাড়া বিশ্বের খুব কম দেশই স্বাধীনতার যুদ্ধে বিজয়ী হয়েছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়েছে। চীনের সামরিক বাহিনী চীন–ভিয়েতনাম সীমান্তে প্রস্তুত ছিল। বলা হয়ে থাকে কিউবার বিপ্লবে অন্য কোনো দেশের সাহায্য নেওয়া হয়নি। কিন্তু বাস্তবতা হলো কিউবার বিপ্লবী লড়াইয়ে আর্জেন্টিনার চে গুয়েভারা পালন করেন ঐতিহাসিক ভূমিকা। তিনি ছিলেন কিউবার বিপ্লবী কমান্ডের অন্যতম সদস্য। এ ছাড়াও লাতিন আমেরিকার আরও অনেক দেশের যোদ্ধারা কিউবার লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করেন। এমন আরও অসংখ্য দৃষ্টান্ত দেওয়া যাবে বিশ্ব ইতিহাসের পাতা থেকে। আমরা এক্ষণে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ফিরে আসি। স্বাধীন–সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সাড়ে পাঁচ দশক পর স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি মরণকামড় দিতে চাইছে। কেন; কোন পরিস্থিতিতে এটা সম্ভব হচ্ছে! এজন্য দায় কার? স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি এত দিন মুখ ঢেকে রেখেছিল। মুখোশ পরে এরা মিশে গিয়েছিল স্বাধীনতার পক্ষশক্তির রাজনৈতিক জনস্রোতে। এদের আস্তিনের নিচে লুকানো ছিল বিষাক্ত ছুরি। এখন মুখোশ ছেড়ে বিষাক্ত ছুরির আঘাতে বিদীর্ণ করতে চাইছে জাতির বক্ষ। পাকি হানাদার বাহিনীর কবল থেকে বাংলাদেশ একাত্তরের ডিসেম্বরেই মুক্ত হয়েছে। কিন্তু এ দেশে রয়ে গেছে হানাদার বাহিনীর গণহত্যার সহযোগী আলবদর, রাজাকার ও শান্তি কমিটির সদস্যরা। বাংলাদেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর ক্ষুদ্র একটা অংশ এরা। এরাও এ দেশেরই নাগরিক। যাতে তারা তাদের ভুল বুঝতে পারে এবং একাত্তরের ভূমিকার জন্য অনুতপ্ত হয় সেজন্য স্বাধীনতার পর সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়েছিল। ১৯৭২ সালে প্রায় ৩৭ হাজার বা তার চেয়েও কিছু বেশি লোক দালাল আইনে বন্দি হয়েছিল। এদের মধ্যে ছিল শান্তি কমিটির সদস্য, আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনীর সদস্য। বন্দিদের মধ্য থেকে তিরিশ হাজার দালালকে সাধারণ ক্ষমার অধীনে মুক্তি দেওয়া হয়। পঁচাত্তর–পরবর্তী বাদবাকি ছয়–সাত হাজারও মুক্তি পায়। সাধারণ ক্ষমা ও মুক্তি দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল, এরাও বাঙালি; এ দেশের নাগরিক। ১৯৭১ সালে ভুল করে ভুল ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল।
এরা জেলের বাইরে এসে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসুক, দেশগঠনে সবার সঙ্গে মিলে কাজ করুক। এত দিনে নিশ্চয় তারা তাদের ভুল বুঝতে পেরেছে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানও একই দৃষ্টিকোণ থেকে সাধারণ ক্ষমার ধারাটি অব্যাহত রেখেছিলেন। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের সেদিনকার ঔদার্য ও প্রত্যাশা; এখন মনে হচ্ছে, পুরোপুরি সঠিক ছিল না। একাত্তরের দালালদের একটা বড় অংশ মূলধারায় ফিরে এলেও অনেকেই রয়ে গেছে পাকিস্তানি ঘোরের মধ্যে। যারা আজকে স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ ও মহান বিজয় দিবসকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাইছে তারাই পোষণ করে সেই পরিত্যক্ত পাকিস্তানি ভাবাদর্শ। সামনে জাতীয় নির্বাচন। এই নির্বাচন জাতিকে এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের দল হিসেবে এবং এই সময়ের বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিএনপিকে পালন করতে হবে ঐতিহাসিক ভূমিকা। বিএনপিকে তার নিজের জাত চিনতে হবে। মুক্তিযুদ্ধ ও মহান স্বাধীনতার পক্ষের ছোটবড় সব রাজনৈতিক শক্তি–সংঘগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। সমুন্নত করতে হবে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের পতাকা।


