ইরানের ওপর সামরিক অভিযানের জন্য স্পেনের সামরিক ঘাঁটিগুলো ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি মাদ্রিদ। স্পেনের এই অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে দেশটিতে অবস্থানরত মার্কিন বিমানগুলো অবিলম্বে তাদের ঘাঁটি ত্যাগ করেছে। ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ‘ফ্লাইটরাডার২৪’-এর তথ্য অনুযায়ী, স্পেনের রোটা এবং মোরন বিমান ঘাঁটি থেকে অন্তত ১৫টি মার্কিন বিমান ঘাঁটি ত্যাগ করেছে, যার অধিকাংশই ছিল বোয়িং কেসি–১৩৫ স্ট্র্যাটোট্যাঙ্কার গোত্রীয় আকাশ থেকে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান। এর মধ্যে অন্তত সাতটি বিমান জার্মানির রামস্টেইন বিমান ঘাঁটিতে অবতরণ করেছে, বাকিগুলোকে দক্ষিণ ফ্রান্স বা অন্যান্য গন্তব্যে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে ম্যানুয়েল আলবারেস জোর দিয়ে বলেছেন, যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যৌথভাবে এই ঘাঁটিগুলো পরিচালিত হয়, তবুও এগুলোর ওপর স্পেনের পূর্ণ সার্বভৌমত্ব রয়েছে। তিনি জানান, পূর্ব–নির্ধারিত চুক্তির বাইরে বা জাতিসংঘের সনদের পরিপন্থী কোনো সামরিক অভিযানে এই ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। স্পেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মার্গারিটা রবেলস নিশ্চিত করেছেন যে, যেসব বিমান স্পেন ত্যাগ করেছে, সেগুলো আগে থেকেই সেখানে স্থায়ীভাবে মোতায়েন ছিল।
ফ্লাইটরাডার২৪–এর তথ্য অনুযায়ী, মোরন বিমান ঘাঁটি থেকে নয়টি এবং রোটা থেকে দুটি ট্যাঙ্কার বিমান উড্ডয়ন করেছে। এছাড়া রোটা থেকে আরও চারটি বিমান অন্য গন্তব্যে রওনা হয়েছে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ইরানের ওপর এই একতরফা হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি একে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতাকে অস্থিতিশীল করে তোলার মতো একটি উস্কানিমূলক পদক্ষেপ বলে অভিহিত করেছেন। সানচেজ স্পষ্ট করেছেন যে, একটি দমনমূলক শাসনের বিরোধিতা করার অর্থ এই নয় যে বিপজ্জনক সামরিক হস্তক্ষেপকে সমর্থন করা যাবে। তিনি ইরান কর্তৃক উপসাগরীয় দেশগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং লেবাননে ইসরায়েলের পাল্টা হামলার কারণে সৃষ্ট বৃহত্তর বিপদের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। সানচেজ পুনর্ব্যক্ত করেন যে, “সহিংসতা কেবল আরও সহিংসতাই ডেকে আনে।” মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করে স্পেন নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে, সেইসাথে ইরানি আগ্রাসনেরও নিন্দা জানিয়েছে। স্পেনের এই অবস্থান ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিয়ন সা’আরের সমালোচনার মুখে পড়েছে, যিনি স্পেনের বিরুদ্ধে ইরানের পক্ষে থাকার অভিযোগ তুলেছেন। তবে স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলবারেস এই অভিযোগকে “অযৌক্তিক ও হাস্যকর” বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি স্পেনের অটল অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
মাদ্রিদে অবস্থিত ইরানি দূতাবাস স্পেনের এই অবস্থানকে স্বাগত জানিয়েছে এবং একে জাতিসংঘের মূলনীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে। স্পেনের এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাজ্যের অবস্থানের সম্পূর্ণ বিপরীত। যুক্তরাজ্য শুরুতে বাধা দিলেও পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার “সম্মিলিত আত্মরক্ষার” দোহাই দিয়ে মার্কিন বাহিনীকে তাদের ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে স্পেন এক্ষেত্রে কিছুটা ব্যতিক্রম। বেশিরভাগ সদস্য রাষ্ট্র ইরানের হামলার নিন্দা জানালেও মার্কিন–ইসরায়েলি পাল্টা হামলার বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করা থেকে বিরত ছিল। ইইউ–এর উচ্চ প্রতিনিধি কাজা ক্যালাস এবং ২৭টি সদস্য রাষ্ট্রের স্বাক্ষরিত একটি যৌথ বিবৃতিতে বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে, তবে সেখানে ইরানের ওপর আক্রমণের বিষয়ে সরাসরি কোনো উল্লেখ ছিল না। স্পেন তার সামরিক স্থাপনাগুলোর ওপর নিজের সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে এবং ইরানের বিরুদ্ধে একতরফা সামরিক অভিযানে অংশগ্রহণ যে তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়, তা স্পষ্ট করে দিয়েছে। ভূ–রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও বাড়তে না দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি দায়বদ্ধতা প্রদর্শনের জন্য স্পেনের সরকারের এই পদক্ষেপ প্রশংসিত হচ্ছে।


