এক দশক আগের কথা। এনামুল হক স্বপন দুবাই থাকতেন। দেশে পরিবার আম চাষে জড়িত। হঠাৎ ফলন বিপর্যয়ে লোকসান হলো। প্রবাসে বসে স্বপন সমাধান খুঁজতে লাগলেন। বিভিন্ন মাধ্যমে থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে বারোমাসি আম চাষের কথা জানতে পারলেন। এরপর থাইল্যান্ডে বাগান দেখতে গিয়ে স্বপন ‘কাটিমন’ নামে বারোমাসি জাতের আমের কয়েকটি চারা নিয়ে দেশে ফেরেন। চার বিঘা জমিতে শুরু করেন আবাদ। এর পরের গল্প শুধু সফলতার। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ পৌর এলাকার মরদানা গ্রামে ২০১৫ সালে কাটিমন চাষ শুরু করেন স্বপন। প্রথম বছরই গাছ মুকুলে ভরে যায়। পরিপক্ব আম বাজারে ওঠার পর মেলে দারুণ সাড়া। এর পর থেকে বছর বছর বাড়ছে স্বপনের বাগান, বর্তমানে ৭৪ বিঘা জমিতে করছেন চাষ, যার মধ্যে কাটিমন ৫৪ বিঘায়। এক দাগে ৩২ বিঘায় আছে বারোমাসি জাত। স্বপনের দেখাদেখি মরদানা গ্রামের ৪০ শতাংশ জমিতে এখন হচ্ছে কাটিমন চাষ। আশপাশের উপজেলা, পার্শ্ববর্তী জেলায়ও বিস্তৃত হয়েছে।
স্বপনের পথ অনুসরণে চাঁপাইনবাবগঞ্জে কাটিমনের বাজার প্রায় ২৫০ কোটি টাকার। স্বপনের দাবি, তিনিই প্রথম দেশে বাণিজ্যিকভাবে কাটিমন চাষ শুরু করেন। স্থানীয় আম চাষিরা একই স্বীকৃতি দেন। কৃষি কর্মকর্তারা জানান, আম বিষয়ে সভা–সেমিনারে স্বপন এ দাবি করলে, কাউকে আপত্তি করতে দেখিনি। তবে কাটিমন নিয়ে ২০১০ সালে গবেষণা শুরু করেন ড. মেহেদী মাসুদ। তখন তিনি কৃষি বিভাগের অধীন বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ছিলেন। বর্তমানে অবসরে থাকা মেহেদী মাসুদ সমকালকে বলেন, কাটিমন প্রজাতি আমিই প্রথম থাইল্যান্ড থেকে দেশে আনি। এরপর গবেষণা শুরু করি। কৃষি বিভাগ থেকে পরীক্ষামূলক চাষে সফল হওয়ার পর কাটিমন নিয়ে প্রচার চালানো হয়। বিভিন্ন হর্টিকালচার সেন্টারে চারা উৎপাদন করা হয়। সেখান থেকে বিভিন্ন নার্সারির মাধ্যমে কাটিমন সারাদেশে ছড়িয়েছে। তিনি বলেন, কাটিমনকে স্থানীয়ভাবে ‘অমৃত’ নামে ডাকা হয়। বারোমাসি জাতগুলোর মধ্যে এটি আঁশহীন সেরা জাত। সম্প্রতি স্বপনের সঙ্গে কথা হয়। তাঁর বাগানে গাছে গাছে ঝুলছে বিষমুক্ত কাটিমন। একই গাছের কোনো ডালে মুকুল; কোনোটিতে গুটি। স্বপন বলেন, ভরা মৌসুমে কাটিমনের মণ ছিল দুই হাজার টাকা। আমার মতো চাষিরা সে সময় মুকুল নষ্ট করে চার মাস পরে মুকুল নিতে আরম্ভ করেন। পরিচর্যা শেষে এখন বাজারজাত হচ্ছে সে আম।
অন্য চাষিরা যা বলছেন
মরদানা গ্রামের সোহেল রানা বলেন, স্বপন ভাইয়ের পরামর্শে ২০২২ সালে তিন বিঘা জমি লিজ নিয়ে কাটিমন চাষ শুরু করি। বর্তমানে লাভের টাকায় ১৫ বিঘা জমিতে চাষ করছি। পাইকারিতে ‘এ’ গ্রেডের আম ২৭০ টাকা কেজি। একটু কম মানের আম বিক্রি করছি ১৫০ থেকে ২০০ টাকায়।
শিবগঞ্জের পিঠালিতলা গ্রামের মনিরুল ইসলাম বলেন, মৌসুম শেষ হলে জমে ওঠে কাটিমনের বাজার। বর্ষা ছাড়া বছরে প্রায় তিনবার ফলন হয়। পরিচর্যা ও কীটনাশক খরচ তুলনামূলক কম।
শিবগঞ্জ উপজেলা ম্যাংগো ফাউন্ডেশনের সদস্য সচিব আহসান হাবিব জানান, একসময় কাটিমন আম থাইল্যান্ড থেকে আমদানি হতো। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে এটির চাষ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। রপ্তানিও হচ্ছে।
কৃষি অফিসের তথ্যে, কাটিমনের ২৫ বছর বয়সী গাছে বছরে গড়ে সাত মণ এবং পাঁচ বছর বয়সী গাছে ২০ কেজি ফলন সম্ভব।
বেড়েছে কাটিমন চাষ
কৃষি বিভাগ জানায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জে গত বছর এক হাজার ৭৯২ হেক্টর জমিতে কাটিমন চাষ হয়। চলতি বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে চার হাজার ৪৬২ হেক্টর। এর মধ্যে কৃষি বিভাগের প্রণোদনার অর্থে প্রদর্শনী বাগান রয়েছে ১২ হেক্টরে। চলতি বছর জেলা থেকে ১৫৩ টন বিভিন্ন জাতের আম রপ্তানি হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে কাটিমন রপ্তানি হয়েছে ২ দশমিক ৫৩ টন। জেলায় আমের বাগান রয়েছে ৩৭ হাজার ৫০৫ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন হয়েছে চার লাখ ৫৮ হাজার ৬০০ টন। এর মধ্যে এক হাজার ৭৯২ হেক্টরে ২১ হাজার ১৬৫ টন কাটিমন উৎপাদন হয়েছে। সদ্য শেষ হওয়া মৌসুমে জেলায় দুই হাজার ৪৪৪ কোটি টাকার আম বিক্রি হয়েছে, যার মধ্যে কাটিমন ২৫৪ কোটি টাকা।
স্থানীয় কৃষি অফিস জানায়, সারাদেশে অসময়ে চাহিদার ৭০ শতাংশ মেটে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কাটিমন দিয়ে। জেলায় আম চাষি এক লাখ ১৩ হাজার, যার মধ্যে কাটিমন আবাদে জড়িত ১৩ হাজার। কাটিমন উৎপাদনে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পরের স্থান নওগাঁ, রাজশাহী, সাতক্ষীরা ও যশোরের।
উপজেলাভিত্তিক পরিসংখ্যান
চাঁপাইনবাবগঞ্জে সবচেয়ে বেশি কাটিমন চাষ হচ্ছে শিবগঞ্জে। এরপর নাচোল, গোমস্তাপুর ও ভোলাহাটে; সবচেয়ে কম চাষ হয় সদরে। কৃষি অফিস জানায়, শিবগঞ্জে চারা রোপণ ও বড় গাছে টপওয়ার্কিংয়ের (কলম করার একটি পদ্ধতি) মাধ্যমে চলতি বছর দুই হাজার ২৪০ হেক্টর জমিতে ছয় হাজার ৬২৫ চাষি কাটিমন চাষ করেছেন। গত বছর ৯০০, ২০২৩ সালে ৪১৫ এবং ২০২২ সালে ৮০ হেক্টর জমিতে কাটিমন চাষ করেন ২৫০ কৃষক।
গোমস্তাপুর কৃষি অফিসের তথ্যে, উপজেলায় চলতি বছর ৪৫৫ হেক্টর জমিতে বারোমাসি আম চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে পাঁচ হাজার পাঁচ টন। অন্যদিকে, ভোলাহাটে ৫৪০ হেক্টর জমিতে আবাদ হচ্ছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তিন হাজার ৯০০ টন।
বাজার পরিস্থিতি
প্যাকেটজাত ফ্রুট ব্যাগিং আম বিষমুক্ত হওয়ায় চাহিদা বেশি। চাষিরা এটি মাথায় রেখে বর্তমানে ৮০ শতাংশ আম ব্যাগিং পদ্ধতিতে চাষ করছেন। সাধারণ আম ব্যাগিং ও নন–ব্যাগিং দুটি গ্রেডে ভাগ করে বিক্রি হয়। তবে কাটিমন তিন গ্রেডে বাছাই করে বিক্রি করায় ন্যায্য দাম পাচ্ছেন চাষিরা।
শিবগঞ্জের কানসাট আম বাজার ঘুরে দেখা যায়, ব্যাগিং কাঁচা ‘এ’ গ্রেডের কাটিমন ১১ থেকে ১৫ হাজার, ‘বি’ গ্রেড সাত থেকে ৯ হাজার ও ‘সি’ গ্রেড ও নন–ব্যাগিং আম পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা মণ বিক্রি হচ্ছে।
কানসাট আম বাজারের পরিচালক আলমগীর হোসেন জুয়েল বলেন, বাজারে প্রতিদিন আড়াই হাজার টন মৌসুমি আম বিক্রি হয়। ছয় শতাধিক চাষির মাধ্যমে কাটিমন এখন বিক্রি হচ্ছে দিনে গড়ে দেড় হাজার মণ। গড়ে ১০ হাজার টাকা মণ ধরে প্রতিদিন ৭০ লাখ টাকার আম কেনাবেচা হচ্ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ইয়াছিন আলী জানান, সুবিধামতো সময়ে বছরে তিনবার ফলন ও দাম ভালো পাওয়ায় জেলায় কাটিমন চাষ লাফিয়ে বাড়ছে। এ জাতের আমে রোগবালাই কম; পরিচর্যা খরচও সীমিত। এ জন্য চাষিরা লাভবান হচ্ছেন।


