অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক দরকার। কিন্তু সেই সম্পর্ক হবে ন্যায্যতা এবং সমতার ভিত্তিতে। তিনি প্রতিবেশীর সঙ্গে পারস্পরিক সমান সম্মান এবং ন্যায্যতার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
গতকাল রবিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অবস্থিত প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে ছাত্র সংগঠক এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের ছাত্র প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক মতবিনিময়সভায় প্রধান উপদেষ্টা এসব কথা বলেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের এক মাস পূর্তি উপলক্ষে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়া ১৫০ জন ছাত্র প্রতিনিধি সরকারপ্রধানের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
পরে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহফুজ আলম সাংবাদিকদের জানান, শিক্ষার্থীদের এক প্রশ্নের উত্তরে ভারত-বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয়ে বর্তমান সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন ড. ইউনূস।
প্রধান উপদেষ্টা দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়াতে সার্ক পুনরুজ্জীবনের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেছেন, এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার কাজ করতে আগ্রহী।
স্বপ্নপূরণের আগে দমে যেয়ো না
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘ছাত্র-জনতার আকাঙ্ক্ষার যে স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার কাজ শুরু হয়েছে, তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তোমরা এর থেকে বেরিয়ে যেয়ো না।
’ তিনি এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে ছাত্রদের সার্বক্ষণিক কাজ করে যাওয়ার আহবান জানান।
সভার শুরুতে প্রধান উপদেষ্টা ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শহীদ ও আহত শিক্ষার্থীদের কথা গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। এ সময় হতাহতদের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ড. ইউনূস। কাঁদতেও দেখা যায় তাঁকে।
অধ্যাপক ইউনূস গত ১৫ বছরের অপশাসনের কথা স্মরণ করে শিক্ষার্থীদের বলেন, ‘এত দিন তারা চুপচাপ শুয়ে শুয়ে স্বপ্নের মধ্যে ছিল এবং আনন্দ সহকারে লুটপাট করে যাচ্ছিল। এরা কি এখন চুপচুপ বসে থাকবে। না, তারা খুব চেষ্টা করবে আবার তোমাদের দুঃস্বপ্নের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়ার। চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখবে না। কাজেই যে কাজ শুরু করেছো, তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত এর থেকে বেরিয়ে যেয়ো না।
দেশের সফল অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়ায় শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে নোবেল বিজয়ী ইউনূস বলেন, ‘বাংলাদেশের জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত এই সুযোগ আসেনি। তবে সুযোগ যেন হাতছাড়া না হয়। এই সুযোগ হাতছাড়া হলে বাংলাদেশের আর কোনো ভবিষ্যৎ থাকবে না। রাষ্ট্র আর থাকবে না। কাজেই এটা শুধু রাষ্ট্র নয়, পৃথিবীর সম্মানিত রাষ্ট্র হিসেবে যেন প্রতিষ্ঠিত হয়, সেটা করতে হবে।’
তরুণরা কোন জাদুমন্ত্রে বাংলাদেশে বিপ্লব সংঘটিত করেছে, তা দেখতে সারা দুনিয়ার মানুষ এ দেশে আসবে—এমন উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘দুনিয়ার মানুষ দেখতে আসবে, তোমাদের কাছ থেকে শিখতে আসবে। তোমাদের কাছে জানতে চাইবে—কোন মন্ত্র দিয়ে এই বিপ্লব করেছ। এই মন্ত্র তারা শিখতে চাইবে।’
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘তোমাদের মন্ত্র কী, সেটা হয়তো তোমরা বুঝতে পারছ না। এটা একটা বড় মন্ত্র। এই মন্ত্র ধরে রাখ। মন্ত্র যদি শিথিল হয়ে যায়, আমাদের কপালে অশেষ দুঃখ আছে। সেই দুঃখ যেন আমাদের দেখতে না হয়।’
শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ চিন্তায় অনড় থাকার পরামর্শ দিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, তোমাদের চিন্তা স্বচ্ছ ও সঠিক। তোমরা নিজ নিজ চিন্তায় অনড় থাক। কেউ যদি স্বপ্নপূরণের চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসার পরামর্শ দেয়, সেটা গ্রহণ কোরো না।
আহতদের হাসপাতালে দেখতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে ড. ইউনূস বলেন, ‘যখন হাসপাতালে শিক্ষার্থীদের দেখার জন্য যাই, তাদের দিকে তাকাতে কষ্ট হয়। একটা ছেলে, একটা মেয়ে কিভাবে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এই দিকে পা চলে গেছে, ওই দিকে মাথা।’
আবেগাপ্লুত কণ্ঠে ড. ইউনূস বলেন, ‘একজন তাজা তরুণ রংপুরে আমাকে বলল, ফুটফুটে একটা ছেলে, স্যার আমি সারা জীবন ক্রিকেট খেলতে চেয়েছিলাম। ক্রিকেটার হতে চেয়েছিলাম। এখন দেখেন আমার পা কেটে ফেলেছে। সে আমাকে জিজ্ঞাসা করেছে স্যার ক্রিকেট খেলব কী করে? ক্রিকেট তার মাথা থেকে যাচ্ছে না।’
তিনি বলেন, ‘আহতদের যতবার দেখি ততবার মনে প্রশ্ন জাগে, কী বাংলাদেশ আমরা বানিয়েছি যে এতগুলো তাজা প্রাণ, তাদের পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হলো। আমরা যারা আজ এখানে বসে কথা বলছি, আমাদের একমাত্র দায়িত্ব তাদের এই ত্যাগ, এই জীবনের মূল্যের স্বপ্ন পূরণ করা।’
সভায় উপস্থিত ছিলেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল; বন, পরিবেশ ও জলবায়ু উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম এবং যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া।
মব জাস্টিস বরদাশত করা হবে না : মাহফুজ
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহফুজ আলম বলেছেন, সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা হলো—মব জাস্টিসের (গণপিটুনি) মতো ঘটনা কোনোভাবে বরদাশত করা হবে না। কেউ অপরাধ করলে আইন অনুযায়ী তার বিচার হবে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ নেই।
ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে প্রেস ব্রিফিংয়ে মাহফুজ আলম বলেন, মব জাস্টিসের বিষয়ে সরকারের অবস্থান খুব স্পষ্ট। কোনোভাবে হতে দেওয়া যাবে না। মাজার ও মন্দিরে হামলা বা কোনো ব্যক্তি আক্রোশের কারণে হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী বলেন, ‘স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের দোসর হিসেবে যাঁরা কাজ করেছেন, জনগণ তাঁদের বিচার করবে না। তাঁদের আইনের আওতায় সোপর্দ করতে হবে। কারো মানবাধিকার লুণ্ঠিত হোক, সেটা আমরা চাই না।’
তিনি বলেন, আইন নিজস্ব গতিতে তাদের বিচার করবে। জনগণকে শুধু এটুকু খেয়াল রাখতে হবে, দোসররা যেকোনোভাবে পার না পেয়ে যায়। যাঁরা আন্দোলনে শহীদ হয়েছেন, আহত হয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে কোনো ধরনের বেঈমানি যেন না হয়।
ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করার বিষয়ে সরকারের কোনো দিকনির্দেশনা আছে কি না জানতে চাইলে মাহফুজ বলেন, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করতে দেওয়া না দেওয়ার বিষয়ে সরকারের স্পষ্ট কোনো অবস্থান নেই। তবে ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার বানানো যাবে না। এ বিষয়ে বাংলাদেশে একটি ঐকমত্য আছে। এমনকি ধর্মভিত্তিক রাজনীতি যাঁরা করেন তাঁরাও এ ব্যাপারে একমত। রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার এবং ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল পরিচালনা দুটি আলাদা বিষয় বলে তিনি ব্যাখ্যা দেন।
শিক্ষাঙ্গনে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী বলেন, দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা হচ্ছে। সবার মতামত গ্রহণ করে সরকার তার অবস্থান পরিষ্কার করবে। তবে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ যে অপরাজনীতি করেছে, সেই রাজনীতি যেন ক্যাম্পাসে ফিরে না আসে, সেটা সরকারের অঙ্গীকার বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের আলোচনায় সরকারের তরফ থেকে আহত ও নিহতদের ক্ষেত্রে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা উঠে এসেছে। একটি ফাউন্ডেশন গঠনের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে মাহফুজ আলম বলেন, এর মাধ্যমে শহীদ পরিবারকে ক্ষতিপূরণ, আহত পরিবারকে পুনর্বাসন এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মানের বিষয়টি আলোচনা হয়েছে।
এ সময় প্রধান উপদেষ্টার প্রেসসচিব শফিকুল আলম বলেন, আহত ও নিহতের তালিকা তৈরি করতে খুব ভালোভাবে কাজ করছে সরকার। এখন পর্যন্ত ১৮ হাজার মানুষ আহত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। প্রথম দিকে ছাত্ররা ছিল, পরে দেশব্যাপী সাধারণ মানুষ এই আন্দোলনে যুক্ত হয়। এ জন্য এই তালিকা অনেক লম্বা হচ্ছে।
তিনি জানান, অনেকেই পুলিশি ঝামেলার কারণে ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়ায় যাননি। ফলে সবার তথ্য সংগ্রহ করতে একটু বেগ পেতে হচ্ছে। অনেকেই জানাজার কাজ তাড়াতাড়ি করেছেন পুলিশি ঝামেলা এড়াতে। প্রাথমিক একটি তালিকা হয়েছে। এখন ছাত্ররা করছেন, অনেকে প্রাইভেটলি করছেন। সব তালিকা পাওয়ার পর সমন্বিত একটি তালিকা প্রকাশ করা হবে।
দেশের বিভিন্ন জায়গায় গণহারে মামলা হচ্ছে—এমন উল্লেখ করে একজন সাংবাদিক জানতে চাইলে মাহফুজ আলম বলেন, গণমামলা কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। তবে প্রতিটি মামলার ক্ষেত্রে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া মেনে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।


