যবনিকা পতন হইল আর–একটি বিশ্বকাপ ফুটবলের। নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামের আলো নিভিয়া আসিল, বিজয়ের উল্লাস ও পরাজয়ের অশ্রু মিলিয়া রচিল ইতিহাসের আরো একটি অধ্যায়। আবার চার বৎসর পর পৃথিবীর কয়েক শত কোটি জোড়াচোখ খুঁজিয়া লইবে সেই সময়কার খেলোয়াড়দের পায়ের জাদু, ফুটবলের অপার সৌন্দর্য। ইহাই ফুটবলের বিস্ময়, ইহাই বিশ্বকাপের অনির্বচনীয় আকর্ষণ। এই কারণে বিশ্বকাপ ফুটবল কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নহে—ইহা বিশ্ব মানব–আবেগের মহোৎসব। বাংলাদেশের মানুষও তাহার ব্যতিক্রম নহে। বরং বলা যায়, বিশ্বকাপের উন্মাদনায় বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম প্রাণবন্ত দেশ। রাজধানীর অলিগলি হইতে গ্রামের চায়ের দোকান, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল হইতে মধ্যরাতের পারিবারিক আড্ডা—সর্বত্রই বিশ্বকাপের আলোচনা প্রবলভাবে উপস্থিত থাকে। প্রিয় দলের জয়ে মানুষ আনন্দাশ্রু বিসর্জন করে, পরাজয়ে গভীর বেদনাভার বহন করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশ্লেষণের ঢেউ উঠে, কখনো–বা বন্ধুত্বপূর্ণ বাক্যযুদ্ধেরও অবতারণা হয়; কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফুটবলই মানুষকে একসূত্রে বাঁধিয়া রাখে। এই বিশ্বকাপও তাহার ব্যতিক্রম ছিল না। লিওনেল মেসির শেষ বিশ্বকাপ কি না, স্পেনের নবপ্রজন্মের ফুটবলের ঔজ্জ্বল্য, আর্জেন্টিনার শিরোপা ধরিয়া রাখিবার সংগ্রাম—সমস্তই বিশ্বকাপকে করিয়াছে নাটকীয় ও স্মরণীয়।
ফাইনালে স্পেন ১–০ গোলে অতিরিক্ত সময়ে আর্জেন্টিনাকে পরাজিত করিয়া দ্বিতীয় বারের ন্যায় বিশ্বকাপ শিরোপা অর্জন করিয়াছে। ম্যাচের ১০৬ মিনিটে ফেরান তোরেসের গোলই নির্ধারণ করিয়া দেয় বিশ্বসেরার মুকুট; কিন্তু স্কোরলাইন যাহা বলিতে পারে না, ম্যাচের পরিসংখ্যান তাহার অধিকতর স্পষ্ট ভাষ্য প্রদান করে। স্পেন ২০টি শট লইয়াছে, যাহার মধ্যে ১২টি ছিল লক্ষ্যভেদী। অন্যদিকে, আর্জেন্টিনা নির্ধারিত ৯০ মিনিটে একটি শটও লইতে পারে নাই। স্পেন বলের নিয়ন্ত্রণ, মাঠের বিস্তার ও আক্রমণের ছন্দ—প্রত্যেক ক্ষেত্রেই নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করিয়াছে। ৩৪ শতাংশ বলের দখল লইয়া আর্জেন্টিনা পুরো ম্যাচে নিজেদের স্বাভাবিক ফুটবল খেলিতে পারে নাই। গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেসের অসাধারণ নৈপুণ্য না থাকিলে ফলাফল আরো ব্যবধানপূর্ণ হইতে পারিত। তবে লিওনেল মেসি এই বিশ্বকাপে আবারও তাহার অনন্যসাধারণ প্রতিভার স্বাক্ষর রাখিয়াছেন; কিন্তু ফুটবল একক কোনো নায়কের কাহিনি নহে। ইহা ১১ জনের সম্মিলিত শিল্প। স্পেন সেই শিল্পের পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ ঘটাইয়াছে। মেসিকে তাহারা এমনভাবে ঘিরিয়া রাখিয়াছিল যে, তাহার বিশ্বকাপ জীবনের অন্যতম নীরব একটি রজনিতে পরিণত হয় এই ফাইনাল।
তথাপি
একটি পরাজয়
কখনো একজন
কিংবদন্তির উত্তরাধিকারকে ম্লান করিতে
পারে না।
ফুটবল তাহাকে
স্মরণ রাখিবে
তাহার শিল্পের
জন্য, তাহার জাদুকরি
পায়ের বিস্ময়
নৈপুণ্যের জন্য। বিশ্বকাপের প্রকৃত মাহাত্ম্য
কোনো একটি
দলের জয়
বা পরাজয়ে
সীমাবদ্ধ নহে।
বিশ্বকাপ আমাদের
স্মরণ করাইয়া
দেয় যে,
ফুটবল পৃথিবীর
সর্বজনীন ভাষা।
ধর্ম, বর্ণ, ভাষা কিংবা
ভৌগোলিক সীমারেখা—সকল কিছুকে
অতিক্রম করিয়া
একটি বল
কোটি কোটি
মানুষকে একই
আবেগে যুক্ত
করিতে পারে।
পৃথিবীতে এমন
আর কোনো
ক্রীড়া আসর
নাই, যাহা একই
সঙ্গে আফ্রিকার
একটি গ্রামের
শিশুকে, ইউরোপের একটি
নগরবাসীকে এবং
বাংলাদেশের একটি
প্রত্যন্ত অঞ্চলের
মানুষকে একই
মুহূর্তে উল্লাসে
উদ্বেলিত করিতে
পারে। ফুটবলের
সৌন্দর্য এখানেই
যে, ইহা কেবল
গোলের হিসাব
শেখায় না—ইহা আমাদের
অপেক্ষা করিতে
শেখায়, পরাজয়কে মর্যাদার
সহিত গ্রহণ
করিতে শেখায়
এবং বিজয়ের
আনন্দকে অন্যের
সহিত ভাগ
করিয়া লইতে
শেখায়। একটি
ম্যাচের ৯০
মিনিট কখনো
কখনো জীবনের
বহু দর্শনের
প্রতিফলন হইয়া
উঠে। বিশ্বকাপ শেষ
হইয়াছে; কিন্তু ফুটবলের
গল্প শেষ
হয় নাই।
চার বৎসরের
দীর্ঘ প্রতীক্ষা
আজ হইতে
পুনরায় আরম্ভ
হইল। হয়তো
সেই প্রতীক্ষার
মধ্যে অনেক
নক্ষত্রের আবির্ভাব
ঘটিবে, অনেক কিংবদন্তি
বিদায় লইবেন;
কিন্তু একটি
বিষয় অপরিবর্তিত
থাকিবে—ফুটবল
তাহার আপন
সৌন্দর্যে পৃথিবীর
মানুষকে বারংবার
একত্র করিয়া
যাইবে।
এই কারণেই
বিশ্বকাপের যবনিকা
পতন হয়;
কিন্তু ফুটবলের
নহে।



