প্রশান্ত মহাসাগরে দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনো বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তায় নতুন শঙ্কা তৈরি করছে। এর প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ার মৌসুমি বৃষ্টিপাত দুর্বল ও অনিয়মিত হলে দেশের প্রধান খাদ্যশস্য ধানের দুই গুরুত্বপূর্ণ মৌসুম আমন ও বোরো উৎপাদন ঝুঁকিতে পড়তে পারে। আমনে বৃষ্টির ঘাটতি ও দীর্ঘ শুষ্ক বিরতি, বোরোতে বাড়তি তাপমাত্রা ও সেচের পানির সংকট–দুই মৌসুমেই উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর সঙ্গে অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিও থাকছে। উৎপাদন কমলে বাজারে চালের সরবরাহে চাপ তৈরি হয়ে দাম বাড়তে পারে। ঘাটতি পূরণে বাড়তে পারে সরকারি–বেসরকারি আমদানিও। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, চলমান এল নিনো ২০২৬ সালের শেষভাগে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে এবং ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জাতিসংঘের সতর্কতায় বলা হয়েছে, এটি গত ৭০ বছরের অন্যতম শক্তিশালী এল নিনোতে রূপ নিতে পারে। প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির তাপমাত্রা ইতোমধ্যে স্বাভাবিকের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বেড়েছে।
আগামী কয়েক মাসে তা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৪ ডিগ্রি পর্যন্ত বেশি হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে ডব্লিউএমও। এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা। প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বেড়ে গেলে বায়ুপ্রবাহের ধরন বদলে যায়। এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে আবহাওয়ার স্বাভাবিক ছন্দে পরিবর্তন আসে। কোথাও খরা ও দাবানল বাড়ে, কোথাও দেখা দেয় অতিবৃষ্টি ও বন্যা। ডব্লিউএমওর পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক মাসে দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া, মধ্য আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাঞ্চলের বড় এলাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হতে পারে। শুধু এল নিনোই দক্ষিণ এশিয়ার বর্ষাকে প্রভাবিত করে না। ভারত মহাসাগরীয় ডাইপোল (ভারত মহাসাগরের পশ্চিমাংশ পর্যায়ক্রমে পূর্বাঞ্চলের তুলনায় উষ্ণতর এবং শীতলতর হয়ে ওঠা)-সহ অন্যান্য সমুদ্র–আবহাওয়া ব্যবস্থাও এতে ভূমিকা রাখে। তবে অতীতের অনেক এল নিনো পর্বে বাংলাদেশসহ ভারত, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাতের প্রবণতা দেখা গেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বর্ষা দুর্বল হলে আমনে পানির সংকট এবং বেশি তাপমাত্রায় মাটির আর্দ্রতা দ্রুত কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আমনেই প্রথম ধাক্কা : দেশের দ্বিতীয় প্রধান ধান আমন মূলত বর্ষার পানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে বর্ষা দেরিতে শুরু হওয়া, বৃষ্টির পরিমাণ কমে যাওয়া কিংবা দীর্ঘ শুষ্ক বিরতি হলে চারা রোপণ ও ধানের বেড়ে ওঠা ব্যাহত হতে পারে। বাড়তে পারে সেচের প্রয়োজন, বাড়বে উৎপাদন খরচও। ফলে এল নিনোর কারণে বর্ষার স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত হলে আমন উৎপাদনে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বোরোতে তাপ–পানির চাপ : দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৫৫ শতাংশ আসে বোরো থেকে। এটি শুষ্ক মৌসুমের সেচনির্ভর ফসল। এল নিনোর প্রভাবে শুষ্ক ও উষ্ণ আবহাওয়া বাড়লে সেচের পানির চাহিদা বাড়বে। একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ এবং ডিজেল ও বিদ্যুতের সেচ ব্যয়ও বাড়তে পারে। কৃষিবিদরা বলছেন, ধানের ফুল আসা ও দানা গঠনের সময় অতিরিক্ত তাপমাত্রা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর। এতে পরাগায়ন ব্যাহত হয়ে চিঁটা বাড়তে পারে এবং দানার ওজন কমে যেতে পারে। ফলে আবাদি জমির পরিমাণ ঠিক থাকলেও একরপ্রতি ফলন কমার আশঙ্কা রয়েছে। খরার পাশাপাশি অস্বাভাবিক বৃষ্টিও বোরোর জন্য ঝুঁকি বাড়ায় । চলতি বছরের মে মাসে আগাম ভারি বৃষ্টি ও উজানের পানিতে হাওরাঞ্চলের ৪৬ হাজার হেক্টরের বেশি বোরো জমি তলিয়ে যায়। এতে আবারও স্পষ্ট হয়েছে, আবহাওয়ার ধরন ও সময়ের অনিশ্চয়তাই কৃষির বড় ঝুঁকি। দীর্ঘ শুষ্কতা যেমন ক্ষতিকর, অল্প সময়ে অতিবৃষ্টিও তেমনি বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
উৎপাদন কমলে বাড়বে চালের দাম : ধানের উৎপাদন সামান্য কমলেও এর প্রভাব দ্রুত খাদ্যবাজারে পড়তে পারে। কৃষি বিভাগ দেশে চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দাবি করলেও প্রতি বছরই চাল আমদানি করতে হচ্ছে। জনসংখ্যা ও ভোগের চাপের সঙ্গে উৎপাদন কমে গেলে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এতে চালের দাম বাড়ার পাশাপাশি আমদানির ওপর নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২৬–২৭ বিপণন বছরে বাংলাদেশে প্রায় ১৫ লাখ টন চাল আমদানি করা হতে পারে। একই সময়ে ভারতসহ প্রধান চাল উৎপাদনকারী দেশগুলোতেও এল নিনোর প্রভাবে উৎপাদন কমলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। দেশের উৎপাদন কমার সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারেও সরবরাহ সংকুচিত হলে আমদানি ব্যয় বাড়বে।
আগাম প্রস্তুতির তাগিদ : শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. তুহিন শুভ্র রায় বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এল নিনোর প্রভাব মোকাবিলায় এখনই আমন ও বোরোর জন্য পৃথক প্রস্তুতি নিতে হবে। আবহাওয়ার আগাম পূর্বাভাস কৃষকের সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদি, খরাসহিষ্ণু ও বন্যাসহিষ্ণু জাতের আবাদ বাড়াতে হবে। সেচের পানির দক্ষ ব্যবহার এবং হাওরে আগাম বন্যার পূর্বাভাস আরও কার্যকর করা জরুরি। তিনি বলেন, এখনই বন্যা ও খরাসহিষ্ণু জাতের পর্যাপ্ত বীজ উৎপাদনে যেতে হবে। পর্যাপ্ত বীজ ও সারের মজুত রাখতে হবে এবং মধ্যস্বত্বভোগী এড়িয়ে কৃষক কার্ডের মাধ্যমে তা সরাসরি কৃষকের হাতে পৌঁছাতে হবে। তার মতে, এল নিনো আসবে কি না, সেটা এখন বড় প্রশ্ন নয়, এর অভিঘাতে ধানের উৎপাদন কমলে বাংলাদেশ কীভাবে দ্রুত খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারবে– সেটাই বিবেচ্য। উৎপাদন, সরকারি মজুত, আমদানি ও বাজার ব্যবস্থাপনায় আগাম প্রস্তুতি না থাকলে প্রশান্ত মহাসাগরের এই জলবায়ুগত ঘটনা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের মানুষের খাবারের টেবিলেও চাপ তৈরি করতে পারে।


