রাতের আঁধারে যখন আধুনিক সভ্যতার ঝলমলে আলোয় চারপাশ উদ্ভাসিত হয়, তখন শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলার সদর ইউনিয়নের সারিকালীনগর নামাপাড়ার গহীন জনপদে দীর্ঘদেহী অন্ধকার যেন চেপে বসে। প্রায় শতাব্দী ছুঁইছুঁই বৃদ্ধ কাশেম আলীর ৯৩ বছরের জীবনের মতো এখনো বিদ্যুতের আলো পৌঁছায়নি এই বাড়িগুলোয়। সন্ধ্যায় হারিকেন আর কুপি বাতির ক্ষীণ আলোয় জীবন চলছে। যা বর্তমান যুগে প্রায় কল্পনাতীত। এই অবহেলিত জনপদের চিত্র যেন আধুনিক বাংলাদেশের এক ভিন্ন প্রতিচ্ছবি। কাশেম আলী দীর্ঘশ্বাসের সাথে জানান, ‘দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় থেকেই অনেক কষ্টে এই জায়গায় আছি। এই বয়সেও নিজের চোখে কারেন্টের আলো দেখতে পাইনি। হারিকেনেই চলি।
পুরা বর্ষাকাল ঘরবাড়ি ডুবে থাকে। যাতায়াত করতে হয় কলা গাছের ভেলায় চড়ে। শুকনো মৌসুমে রাস্তা নেই। আইল দিয়ে হাঁটি।’ তিনি আরো বলেন, ‘অনেকেই ছবি তোলে, কিন্তু পরে আর কেউ খবর নেয় না।’ এলাকাবাসী জানায়, কাশেম আলীর বসতবাড়িতে তিনটি পরিবার বছরের পর বছর সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। রাস্তা বন্যার পানিতে টইটম্বুর থাকে। বিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ খাবার পানির অভাব বছরব্যাপী। সরকার বা কোনো সংগঠনের নেই কোনো দৃষ্টি। পরিবারগুলোর নেই কোনো সোলার প্যানেল, নেই চলাচলের পাকা রাস্তা। বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা কিংবা স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার। বর্ষায় বন্যার সময় তাদের ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে যায়। পানিবন্দি অবস্থায় কাটাতে হয় পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন। শিশুরা স্কুলে যেতে পারে না। পড়ার বইয়ের অভাব নিত্যদিনের সঙ্গী। রাতের বেলায় কুপি বাতির আলোয় চলে রান্না। কাপড় সেলাই এবং গৃহস্থালি কাজ। পুরোনো কাপড় ছিঁড়ে বানানো কুপির সলতের আলোই তাদের একমাত্র ভরসা।সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে কাশেম আলীর ছেলের মৃত্যুর সময়। কবরস্থান না থাকায় ছেলেকে কবরস্থ করতে হয় নিজ ঘরের মাটির মেঝেতেই।
কাশেম আলীর আক্ষেপ, ‘এখন যদি আবারও কেউ মারা যান, তবে তাকেও কবরস্থ করতে হবে সেই ঘরের মেঝেতেই!’ এটি যেন এই জনপদের চরম অসহায়ত্বের এক জ্বলন্ত উদাহরণ। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আল–আমিন দৈনিক বলেন, বিষয়টি সত্যিই কষ্টদায়ক। দ্রুত খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিদ্যুৎ, রাস্তা, পানি ও টয়লেট এই মৌলিক সুবিধা যেন পরিবারগুলো পায়, সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে অবহিত করা হবে। স্থানীয় তরুণ সমাজের পক্ষ থেকেও এই অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দাবি উঠেছে। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা বলেন, যেখানে স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে, সেখানে এখনো এমন পরিবারগুলো অন্ধকারে থাকছেÑএটা খুবই দুঃখজনক। এই বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।



