রাজধানীর মোহাম্মদপুরের একটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের গেটের সামনে দশম শ্রেণির চার ছাত্রছাত্রীকে ইউনিফর্ম পরে প্রকাশ্যেই ধূমপান করতে দেখা যায়। ইত্তেফাকের এই প্রতিনিধির সঙ্গে কথা হয় এক ছাত্রীর। সে অকপটে বলে, ‘ধূমপান হচ্ছে আধুনিকতা’। এক ছাত্র বলল, ‘স্মোকিং না করলে পুরুষ হওয়া যায় না, প্রেমিক হওয়া যায় না, আধুনিক হওয়া যায় না।’ ঐ স্কুলের গেটের সামনে ফুটপাতেই রয়েছে চা–সিগারেটের কয়েকটি দোকান। একইদিন ধানমন্ডিতে একটি নামি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের সামনে ১০ জন শিক্ষার্থীকে সিগারেট খেতে দেখেন এই প্রতিনিধি। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদরা বলেন, ধূমপান থেকে শিক্ষার্থীদের দূরে রাখতে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে, ফেসবুকের বন্ধু কারা, স্কুলের বন্ধু কারা—এগুলো নিয়মিত খোঁজখবর রাখতে হবে। শুধু এই দুই বিদ্যালয়ই নয়, রাজধানীর অধিকাংশ স্কুলের সামনে ও আশপাশে ইউনিফর্ম পরেই ছাত্রছাত্রীদের প্রকাশ্যে ধূপমান করতে দেখা গেছে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১০০ গজের মধ্যে ফুটপাত দখল করে চা–সিগারেটের দোকান গড়ে উঠেছে। ফুটপাতে বেঞ্চ পেতে চলছে রমরমা ব্যবসা। শিক্ষার্থীদের কাছেও তারা সিগারেট বিক্রি করছেন অবাধে। অথচ দেশে বিদ্যমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নের নির্দেশিকা অনুযায়ী, দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ক্লিনিক, খেলার মাঠ ও শিশু পার্কের সীমানার ১০০ মিটারের মধ্যে তামাক ও তামাকজাত পণ্য (বিড়ি, সিগারেট, জর্দা, গুল ইত্যাদি) বিক্রি, ব্যবহার ও প্রচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়ে গত ২৫ জানুয়ারি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট অফিসগুলোতে তামাকমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে।
নতুন এই নির্দেশনা অনুযায়ী, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাকজাত পণ্য বিক্রয়, ব্যবহার ও প্রচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।’ কিন্তু আইনের বাস্তবায়ন নেই। সরেজমিনে দেখা যায়, ধানমন্ডির ১৫ নম্বর রোডে একটি প্রথিতযশা সংগীতবিদ্যায়তন ও বেসরকারি হাসপাতালের সামনে গড়ে উঠেছে পান–বিড়ি–সিগারেটের ৮ থেকে ১০টি দোকান। ফুটপাতের ওপর বেঞ্চ পেতে দিব্যি সিগারেট বিক্রি চলছে। ধূমপায়ীরা ভবনের সামনেই জ্বলন্ত সিগারেট হাতে আড্ডা জমিয়েছেন। মোহাম্মদপুরে ক্যাম্পের বাজার থেকে একটি রাস্তা সোজা চলে গেছে জান্নাতবাগ ঈদগাহের সামনে। ছোট মাঠটিতে সকাল–বিকাল ফুটবল ও ক্রিকেট খেলা হয়। মাঠের নিয়মিত খেলুড়ে মোহাম্মদপুর সরকারি স্কুলের তিন শিক্ষার্থী ক্রিকেটের কাভার ড্রাইভ শট অনুশীলন করছিল। তারা জানায়, স্কুলের সামনে সিগারেটের দোকান আর এই মাঠের চারপাশজুড়ে মাদকসেবীদের আড্ডার কারণে প্রতিনিয়ত বিড়ম্বনায় পড়তে হয় তাদের। ফার্মগেটের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী মো. রফিক বলে, ‘হলফ করে বলতে পারি এখানকার এমন কোনো স্কুল, কলেজ কিংবা কোচিং সেন্টার নেই যেখানে স্টুডেন্ট ধূমপায়ীদের আড্ডা নেই।’
বন্ধুদের হাত ধরেই সিগারেটে হাতেখড়ি :মনোরোগ ও মাদকাসক্তি চিকিত্সাবিদদের মতে, বন্ধুদের হাত ধরেই সিগারেটে হাতেখড়ি হচ্ছে অনেক শিক্ষার্থীর। বস্তির শিশু, রাস্তার টোকাই এবং যারা মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, তাদের সন্তানেরাই আগে মাদক নিত। এখন সমাজের অভিজাত শ্রেণির ছেলেমেয়েরাও মাদক নিয়ে থাকে। সাধারণত ১০–১৫ বছর বয়সি শিশুদের মাদক গ্রহণের সংখ্যা বেশি। মাদকের সহজলভ্যতাই এর মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। যারা মাদকের এজেন্ট হিসেবে কাজ করে তারা শিশু ও কিশোরদের বিভিন্ন কৌশলে প্রলুব্ধ করে। কৌতূহলী হয়েও শিশুরা মাদক নেয়। শুরুতে তারা বলে—নেশা করব না, শুধু একটু খেয়ে দেখি। একসময় তারা মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ে। এর ফলে লেখাপড়ায় অমনোযোগী হয়ে যায়, স্বাভাবিক জীবন হারিয়ে ফেলে। কিডনি নষ্ট হয়ে যাওয়াসহ নানা ধরনের শারীরিক ক্ষতি হয়। শুধু দেহ নয়, মননশীলতা, চিন্তা–ভাবনা, মমতা, ভালোবাসা—সব কিছুই শেষ হয়ে যায়।
প্রকাশ্যে ধূমপান করায় কলেজছাত্রকে বহিষ্কার :মিরসরাইয়ে প্রকাশ্যে ধূমপান করা এবং সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফেসবুকে প্রচার করায় এক কলেজছাত্রকে বহিষ্কার করা হয়েছে। গত ১০ মে উপজেলার ‘প্রফেসর কামাল উদ্দিন চৌধুরী কলেজের’ অধ্যক্ষ মো. আবছার উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক নোটিশে বিষয়টি জানানো হয়।
সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করার পরামর্শ :দেশে নেশা করার জন্য টাকা না পেয়ে মা–বাবাকে খুন করার ঘটনা ঘটছে। স্বামী স্ত্রীকে খুন করছে। মাদকের জন্য চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই—সমাজে বেড়েই চলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে শিশুদের ক্ষেত্রে এটি নিরাময়যোগ্য, তবে সময়সাপেক্ষ। সরকারি পর্যায়ে শিশুদের মাদকাসক্তি প্রতিরোধে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। মাত্র চারটি সরকারি নিরাময় কেন্দ্র আছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। তবে মাদকাসক্ত শিশুদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে চাইল্ড সেনসিটিভ সোশ্যাল প্রোটেকশন অব বাংলাদেশ (সিএসপিবি) শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় কিছু স্থানে ড্রপ ইন সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে মাদকাসক্ত শিশুদের চিকিত্সা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন অথবা পরিবারে বা সমাজে নির্যাতিত, লাঞ্ছিত শিশুরাই পরবর্তী সময়ে মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। তাই মা–বাবার উচিত সন্তানদের সঙ্গে মাদকের কুফল নিয়ে খোলামেলা আলোচনা ও বন্ধুসুলভ আচরণ করা।
মাদকের কুফল সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করতে হবে :ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন অধ্যাপক বলেন, মাদক নির্মূলে সরকারের পাশাপাশি সমাজের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। মাদকের কুফল সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করতে হবে। শিশুদের নৈতিক মূল্যবোধ তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। মাদকাসক্ত শিশুকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে পরিবারের সব সদস্যদের সৌহার্দপূর্ণ আচরণ দেখাতে হবে। যাদের অভিভাবক নেই তাদের সহায়তায় বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলে মাদকের ভয়াবহতা থেকে অনেকটা রক্ষা করা যাবে আমাদের শিশুদের।
কেন ধূমপানে ঝুঁকছে শিশুরা : শিশুদের ধূমপানে আকর্ষিত হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘সিনেমা, নাটক কিংবা চারপাশের পরিবেশ থেকে তাদের কাছে এক ধরনের বার্তা পৌঁছায় যে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় কিংবা টেনশন, হতাশায় সিগারেট খেতে হয়।’ ঢাকা আহছানিয়া মিশন ইয়ুথ ফোরাম ফর হেলথ অ্যান্ড ওয়েলবিং জানিয়েছে, বাংলাদেশে ১৫ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর মধ্যে তামাক ব্যবহারের হার ৩৫.৩ শতাংশ। টোব্যাকো অ্যাটলাসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সিদের মধ্যে তামাক ব্যবহারকারীর হার ছিল ৬ শতাংশ। অন্যদিকে ২০১৪ সালে পরিচালিত গ্লোবাল স্কুল–বেজড হেলথ সার্ভে (জিএসএইচএস) অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৩–১৫ বছর বয়সি ছাত্র–ছাত্রীদের মধ্যে তামাক ব্যবহারের হার ৯.২ শতাংশ।
স্কুলের সামনে সিগারেটের দোকান দেখতে চান না অভিভাবকরা :দশম শ্রেণির দুই শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, কিশোর থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সি ধূমপায়ী স্কুলের সামনে প্রকাশ্যে ধূমপান করছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রকাশ্যে সিগারেট বিক্রি হয়। চলে বাজে আড্ডা। তারা স্কুলের সামনে সিগারেটের দোকান দেখতে চান না। রামপুরার এক বাসিন্দা রবিউল ইসলাম বলেন, ‘আমার ছেলে যে স্কুলে পড়ে তার সামনে একটি পদচারী–সেতু রয়েছে। পদচারী–সেতুর কোণ ঘেঁষে দুই–তিনটি ভ্রাম্যমাণ দোকানে সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত নিয়মিত সিগারেট বিক্রি হয়। শিক্ষার্থীরা স্কুলে যাওয়া–আসার সময় ধূমপানের দৃশ্য দেখছে। এর ফলে তাদের মনোজগতে প্রভাব পড়ছে। শিক্ষার্থীদের ধূমপানে আসক্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।’



