প্রাচীন নদী প্রমত্তা করতোয়ার সেই স্রোত আর নেই। তবে অসময়ের বর্ষায় নদী ভরে উঠেছে। সোমবার দুপুরের পর থেকেই দুই তীরে উৎসুক দর্শকের ঢল নামে। ঢাকঢোলের বাদ্যে একে একে নামে বাঙালির ঐতিহ্যের সংস্কৃতির বাইচের নাও। বাইচওয়ালারা এসেছে বগুড়ার বিভিন্ন এলাকা থেকে। ‘নদী বাঁচলে পরিবেশ বাঁচবে স্লোগানে’ আনন্দ ও উৎসাহের মধ্যে বগুড়ার করতোয়া নদীর এসপি ঘাট থেকে দক্ষিণে বেজোরা ঘাট পর্যন্ত দুই কিলোমিটারের বেশি নৌপথে অনুষ্ঠিত হলো নৌকাবাইচ। বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার ও বগুড়া সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাংগঠনিক তৎপরতায় নৌকাবাইচের মূল আয়োজনে ছিল জেলা পুলিশ। উদ্যোক্তা পুলিশ সুপার সুদীপ কুমার চক্রবর্ত্তী নৌকাবাইচের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
স্বল্প প্রশস্তের প্রতিটি নৌকার দৈর্ঘ্য গড়ে ৮০ হাত। ছেলে–বুড়ো সবাই আছে নৌকায়। তাদের হাতে বৈঠা। নৌকার মধ্যে কারও হাতে ঢোলক কারও হাতে খোল। ক’জনের হাতে পিতলের কাসর। হেলে দুলে বাজাচ্ছেন। মাঝি–মাল্লারা বৈঠা বাইয়ে নৌকাকে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সামনের এক মাঝি বৈঠা বাতাসে ঘুরিয়ে তাল মেলাচ্ছে। ¯্রােতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছার এই খেলা ‘নৌকাবাইচ’-ছাড়লাম দৌড়ের নাও রে। বাইচের নৌকা নদীতে প্রাণ ফিরে এনেছে। নদীর দুই ধারে হাজারো মানুষ করতালি দিয়ে বাইচওয়ালাদের উৎসাহ দেয়। নাও (নৌকা) নদী আর নাইয়া, বাঙালীর হৃদয়ে এই তিনের রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক, যা দেশের সংস্কৃতির বাহক।
বগুড়ার করতোয়া বাঙ্গালী ইছামতি নদীতে প্রতি বছর নৌকাবাইচ ট্রাডিশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের সাধারণ সম্পাদক তৌফিক হাসান ময়না জানালেন গ্রাম থিয়েটার ২০১৮ সালে করতোয়ায় প্রথম নৌকাবাইচ করেছিল। বর্ষা ও শরত মৌসুমে এলাকার জনপ্রতিনিধি, গ্রামের বড় গৃহস্থ ও কৃষক নৌকাবাইচের উদ্যোগ নিয়ে বাইচওয়ালাদের আমন্ত্রণ জানায়। বাইচের নৌকার মহামিলন ঘটে। এ ছাড়াও সব উৎসব পার্বণে নৌকাবাইচের আসর বসে নদীতীরে। এবার আয়োজনে অংশ নিয়েছিল বগুড়ার বিভিন্ন এলাকার ৮টি বাইচওয়ালা। বাইচের নৌকার নাম আছে। আল্লাহ ভরসা, বিজয়–৭১, মাঝিমাল্লা এমন অনেক নাম।
কবে কোথায় এই নৌকাবাইচের শুরু তা স্পষ্ট জানা যায় না। ব্রিটেনের টেমস্ নদীতে বোট রেসের একটা তথ্য পাওয়া যায়। তারও আগে ১৩শ’ খ্রিস্টাব্দে গনডোলেতে প্রথম নৌকাবাইচের কথা জানা যায়। প্রত্নসমৃদ্ধ এলাকায় টেরাকোটায় নৌকা সাদৃশ্য অঙ্কন দেখে ধারনা করা যা নৌকা বাইচ আড়াই হাজার বছর আগের। দেশের পূর্বাঞ্চলের মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলার জামিতরি ধলেশ্বরী নদী, পদ্মার তীর এবং পুরান ঢাকায় বুড়িগঙ্গার তীরের নৌকাবাইচ প্রাচীন। বাইচের নৌকার নানা নাম– ছিপা নৌকা (ছিপ), ঘাসি দোল, সুন্দরা, পানসী, ছান্দি, দক্ষিণ ছান্দি ইত্যাদি। গ্রামের লোক মাঝারি ডিঙির মতো লম্বা নৌকা দেখেই বুঝতে পারে এটা ‘বাইচের নাও’।


