‘কেউ মোবাইলের ভিতরেততে (ভিতর) টেহা তুলে, আর কেউ কাড দেহাইয়া চাউল আনে। আমার কাছেও একটা কাড আছে কিন্তু এইডা দিয়া তো কিছুই পওয়া যায় না। এইডা ভুলে ভোডের কাড, এইডা দিয়া কি পেড ভরে?
রবিবার (৮ সেপ্টেম্বর) তপ্ত রোদে ভর দুপুরে ভিক্ষা করতে বের হন হাজেরা খাতুন (৭০) নামে এক বৃদ্ধা। সড়কের পাশে গাছের ছাঁয়ার নিচে বসে জিরানোর সময় এ প্রতিবেদককে দেখে এমন কথাগুলো বলেন।
তাঁর ভাগ্যে জুটেনি বয়স্ক, বিধবা বা অন্য কোনো সরকারি সুযোগ–সুবিধা।কুঁচকানো চামড়ার ক্লান্ত শরীরটা কিছুটা জুড়ানোর পর পুটলি থেকে পান–সুপারি বের করে মুখে দিয়ে চিবাতে থাকলেন তিনি। সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়ার সময় এ প্রতিবেদক নির্জন সড়কের পাশে নিঃসঙ্গ বৃদ্ধাকে বসে থাকতে দেখে দাঁড়ালেন। কাছে গিয়ে পরিচয় জানতে চাইলে ওই নারী নিজের নাম হাজেরা খাতুন বলে জানান।
নির্জন সড়কের কিনারে বসে থাকার কারণ জানতে চাইলে হাজেরা খাতুন বলেন, বাবারে একটু জিরাইতাছি।
আইজকাল কেউ কাউরে জিগায় না। তুমি (প্রতিবেদক) আমারে জিগাইতাছো। বাবা তুমি কি সরহারি লোক? আমার নিজের ভোডের কার্ড আছে (এনআইডি)।
কিন্তু আমারে কেউ সরহারি সাইজ্যের (সাহায্য) বাও (ব্যবস্থা) কইরা দিল না। খালি টেহা চায়। আমি কইত্যে টেহা দিয়াম। টেহা দেওনের খেমতা থাহলে কি পাড়া ঘুইরা চাউল ওগানিত (যোগাড়) বাইর অই।
হাজেরা খাতুন ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার রাজীবপুর ইউনিয়নের বৃ–দেবস্থান গাতীপাড়া গ্রামের মৃত মংলা মিয়ার স্ত্রী।
দুই মেয়ে এক ছেলের জননী তিনি। মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। ছেলেকে বিয়ে করিয়েছেন। তবে ছেলের সংসারে বাচ্চা–কাচ্চার সংখ্যা বেশি হওয়ায় মায়ের কদর তেমন নেই।
ছেলে কি আপনাকে দেখে না প্রশ্ন করলে– হাজেরা খাতুন বলেন, বাবারে কিবায় দেখবো। হেরারেই তো চলে না। আমারে কিবায় দেখবো। ছেড়াডা গাঙ্গো (নদী) মাছ মাইরা বাজারো বেইচ্চা যে টেহা পায় হেইডা দিয়া নিজের সংসার চালায়। এর লাইগ্যা আমি নিজেরে পেডের লাইগ্যা পাড়া ঘুইরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাউল ওগাই (যোগাড়)। চালের পুটলিটি এ প্রতিবেদককে দেখান। বৃদ্ধার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁর বাবার বাড়ির কেউ বেঁচে নেই। গ্রামের লোকজনের সাহায্য সহযোগীতা নিয়ে স্বামীর ভিটায় একটি ঘর তুলে তাতে বসবাস করছেন। একদিন পর পর আশেপাশে গ্রামগুলোতে গিয়ে চাল চাইতে বের হন হাজেরা খাতুন। বৃদ্ধার অবস্থা দেখে গ্রামের গৃহবধূদের কেউ তাঁকে ফিরিয়ে দেন না।
হাজেরা খাতুন কান্না করে জানান, তার বাড়ির আশপাশে বিত্তবান লোকরা সরকারি বিভিন্ন সুযোগ–সুবিধা পাচ্ছে। কিন্তু বেশ কয়েকবার চেয়ারম্যান মেম্বারদের কাছে গিয়ে কোনো কাজ হয়নি। তাঁর এই দুরবস্থা দেখার পরও কেউ এগিয়ে আসেননি।
আবদুর রহিম (৬০) নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, এই রকম মানুষ যদি সরকারি সাহায্য না পায় তাহলে কারা পাচ্ছে তা খতিয়ে দেখা দরকার।


