ঈদ সামনে রেখে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে ছিনতাইয়ের ঘটনা বাড়ছে। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক মহাপরিচালক ও এক পুলিশ সদস্যও ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন। পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, গত বছর সারা দেশে ছিনতাইসহ দস্যুতার ঘটনায় প্রায় দুই হাজার মামলা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই পথচারীরা ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি মাসে ডিএমপির বিভিন্ন থানায় ছিনতাইয়ের ঘটনায় ৩০৮টি অভিযোগ দেওয়া হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের মাসিক অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে সারা দেশে ছিনতাইসহ দস্যুতার ঘটনায় ১৬৩টি মামলা হয়েছে।
এর মধ্যে রাজধানীতে ২৯টি এবং ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ৪২টি মামলা হয়েছে। এ ছাড়া ফেব্রুয়ারি মাসে ১৩৭টি মামলা হয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এসব ছিনতাইয়ের প্রায় ৬৫ শতাংশই মোটরসাইকেল ব্যবহার করে সংঘটিত। এ ছাড়া প্রায় ২০ শতাংশ ছিনতাই সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে এবং বাকি ১৫ শতাংশ ছদ্মবেশে বা কথার ছলে পথচারীদের বিভ্রান্ত করে সংঘটিত হয়। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে সারা দেশে ছিনতাইসহ দস্যুতার ঘটনায় এক হাজার ৯৩৫টি মামলা হয়েছে।
এর আগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় পাঁচ মাসে ছিনতাইকারীদের হাতে ১৬ জন নিহত হন। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, অপরাধের প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি। কারণ বেশির ভাগ ভুক্তভোগী আইনি ঝামেলা এড়াতে মামলা না করে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, রাতের বেলা পুলিশের টহল কম থাকায় ছিনতাইকারীরা সুযোগ পাচ্ছে। বেকারত্ব, মাদকাসক্তি, পর্যাপ্ত সিসিটিভি ও স্ট্রিট লাইটের অভাব এবং আইনি দুর্বলতাও ছিনতাই বৃদ্ধির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির বলেন, ছিনতাই–ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সারা দেশের পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ছিনতাই প্রতিরোধে টহল জোরদার করা হয়েছে। তিনি বলেন, আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সড়ক, মহাসড়ক, নৌ ও রেলপথে ঘরমুখো মানুষের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
মহাসড়কে ডাকাতি ও দস্যুতা রোধে হাইওয়ে পুলিশের পাশাপাশি জেলা পুলিশকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। র্যাবও এই কাজে সহায়তা করছে। গতকাল সোমবার পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া সেন্টারে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
রাজধানীতে ৪৩২ ছিনতাইপ্রবণ স্থান : গোয়েন্দা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর আটটি ক্রাইম জোনে ৪৩২টি ছিনতাইপ্রবণ স্থান রয়েছে। এসব এলাকায় প্রায় ৯৭৯ জন ছিনতাইকারী সক্রিয়। এর মধ্যে মিরপুর ও তেজগাঁও বিভাগে ৩৮৬ জন, মতিঝিল ও ওয়ারী বিভাগে ২১২ জন, রমনা ও লালবাগ বিভাগে ২১৭ জন এবং উত্তরা ও গুলশান বিভাগে ১৫৪ জন ছিনতাইকারী সক্রিয় রয়েছে। ডিএমপির উপকমিশনার (মিডিয়া) মোহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, ছিনতাই প্রতিরোধে রাত্রিকালীন টহল বাড়ানো হয়েছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দুদকের মহাপরিচালক ছিনতাইয়ের শিকার : গত শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে তারাবি নামাজ শেষে হাঁটাহাঁটির সময় ছিনতাইয়ের শিকার হন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মহাপরিচালক মোতাহার হোসেন। তিন ছিনতাইকারী তাঁর আইফোন, মানিব্যাগ ও হাতঘড়ি ছিনিয়ে নেয়। আইফোনের পাসওয়ার্ড জানতে চেয়ে তাঁকে মারধরও করা হয়।
এ ঘটনায় তাঁর স্টাফ কর্মকর্তা জাবেদ হোসেন সজল রবিবার মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করেন। মোহাম্মদপুর থানার ওসি মেজবাহ উদ্দিন বলেন, এ ঘটনায় সন্দেহভাজন দুজনকে আটক করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। সাম্প্রতিক আরো কিছু ছিনতাইয়ের ঘটনা তদন্তে জানা গেছে, গত বুধবার ভোর ৫টার দিকে ভ্যান নিয়ে যাত্রাবাড়ীর দিকে যাওয়ার সময় ফয়জুর রহমান নামের এক বৃদ্ধ জুরাইনের মুন্সিবাড়ী এলাকায় ছিনতাইয়ের শিকার হন। ধারালো অস্ত্রের পোঁচ দিয়ে তাঁর মোবাইল ফোন সেট এবং পাঁচ হাজার টাকা ছিনিয়ে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। পুলিশের এএসআইয়ের পিস্তল ছিনতাই : নারায়ণগঞ্জ শহরের নগর ভবনের সামনে দায়িত্বরত এক পুলিশ সদস্যের কাছ থেকে সরকারি পিস্তল ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
গতকাল ভোরে এই ঘটনা ঘটে। পুলিশ জানায়, শীতলক্ষ্যা পুলিশ ফাঁড়িতে কর্মরত পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) লুৎফর রহমান ভোরে তিন ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন। এ সময় তারা তাঁর ব্যবহৃত সরকারি পিস্তল (তারাস) ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়। নারায়ণগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তাসনিম আক্তার বলেন, ঘটনাটি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জড়িতদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।


