সংসারে তিনটি মেয়ে। মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি খুব চিন্তিত ছিলেন। কোনো রকমে খাইয়ে পরিয়ে তাদের বড় করে তুলতে পারবেন, কিন্তু বিয়ের খরচ জোগাড় করবেন কী করে? করাতকলে কাজ করার সুবাদে কাঠের মূল্যটা তিনি বুঝেছিলেন। এই চিন্তা থেকে বাড়ির আঙিনা আর চারপাশে শ খানেক সেগুনগাছের চারা লাগিয়েছিলেন। পরিবারের সবাই মিলে গাছগুলোর খুব যত্ন নিতেন। বড় মেয়ের বিয়ের সময় দেখা গেল পঁচিশ–তিরিশটি সেগুনগাছ বিক্রির উপযুক্ত হয়েছে। সেই গাছ বিক্রি করে তিনি মেয়ের বিয়ে দিলেন। উদ্বৃত্ত কিছু টাকাও রয়ে গেল হাতে। শূন্য জায়গাটিতে নতুন করে সেগুনগাছের চারা লাগালেন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় মেয়ের বিয়েও দিলেন একইভাবে, সেগুনগাছ বিক্রি করে। বছর বিশেক সময়ের মধ্যে দেখা গেল গাছ বিক্রির টাকায় তিন মেয়ের বিয়ে দেওয়ার পরেও হাতে বেশ কিছু টাকা রয়ে গেছে। অন্যদিকে নতুন চারাগুলোও বড় হয়ে উঠেছে।
এই গাছগুলোই মানুষটির সবচেয়ে ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছিল।
গাছ বিক্রির টাকায় মধ্য বয়সে তিনি নিজেই একটি করাতকলের মালিক হয়ে উঠেছিলেন। বাকি জীবন কাটিয়েছেন সচ্ছলভাবে।
এ রকম বহু মানুষের জীবন বদলে দিয়েছে গাছ। সংসারে সচ্ছলতা এনে দিয়েছে গাছ। গাছের চেয়ে বড় বন্ধু মানুষের আর কেউ নেই। নানা রকমভাবে মানুষের ভরসার জায়গা গাছ। গাছ থেকে আপনি ফল পাবেন, কাঠ পাবেন। গাছ আপনাকে প্রাকৃতিক ঝড়ঝঞ্ঝা থেকে রক্ষা করবে। বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বহু বহু প্রচণ্ড ঝড়ের সামনে বুক পেতে দাঁড়িয়েছে সুন্দরবনের হাজার লক্ষ গাছ। ঝড়ের তীব্রতা বুক দিয়ে ঠেকিয়েছে অনেকখানি। সমুদ্র উপকূলবর্তী লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে। গাছ আপনার পরিবেশ রক্ষা করবে। গাছ আপনাকে স্নিগ্ধ শীতল ছায়া দেবে। অক্সিজেন দিয়ে আপনাকে বাঁচিয়ে রাখবে। আয়ুর্বেদীয় চিকিৎসা পৃথিবীর প্রাচীনতম চিকিৎসা পদ্ধতি। গাছের শিকড়বাকড় আর লতাপাতা দিয়ে ওষুধ তৈরি করে এই শাস্ত্রের কৃতি মানুষেরা প্রাচীনকাল থেকে কোটি কোটি মানুষের জীবন বাঁচিয়ে এসেছেন। আধুনিক বিজ্ঞানের কালেও আয়ুর্বেদীয় ওষুধ মানুষের জীবন বাঁচাচ্ছে। গাছ নিয়ে ভাবলে গাছের সীমাহীন উপযোগিতা আপনি খুঁজে পাবেন।
গাছের সৌন্দর্যের কোনো তুলনা নেই। এই পৃথিবী সুন্দর করে রেখেছে গাছ, এই পৃথিবী সজীব করে রেখেছে গাছ।
অনাদিকাল থেকে গাছের ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছে প্রাণিকুল। গাছ খাদ্য জুগিয়েছে, গাছ জীবন বাঁচিয়েছে, গাছ প্রকৃতিকে সুন্দর করে সাজিয়ে দিয়েছে। বসন্তে ফুলে ফুলে ভরে গেছে প্রকৃতি। ফুলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছে মানুষ। গাছপালা, ফুলের সৌন্দর্য আর বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ অথবা সবুজ ঘাসের মাঠের বর্ণনা সারা পৃথিবীর কবি–লেখকরা লিখে গেছেন। আমাদের দেশের কত প্রকৃতিপ্রেমীর কথা শুনি। গরিব মানুষ। সংসার ভালোমতো চলে না। তার পরও সেই মানুষ পয়সা বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে নিজের বাড়ির আঙিনা আর গ্রামজুড়ে একের পর এক গাছ লাগিয়ে গেছেন। ও রকম এক দরিদ্র মানুষ ত্রিশ হাজারেরও বেশি তালগাছের চারা রোপণ করেছেন। তালগাছ বজ্রপাত থেকে রক্ষা করে। গ্রাম থেকে তালগাছগুলো উধাও হয়ে গেছে বলে বজ্রপাতে জীবনহানির পরিমাণ বেড়ে গেছে। আমরা বহু রকমভাবে, সামান্য লোভের কারণে বনভূমিগুলো উজাড় করে ফেলেছি। গাছপালা ধ্বংস করে ফেলেছি। আমরা একবারও ভেবে দেখিনি, নিজেদের ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কত বড় সর্বনাশ আমরা করছি। নিজেদের মৃত্যু আমরা নিজেরা ডেকে আনছি। নির্বিচারে বৃক্ষ হত্যা করে আমরা আসলে নিজেদেরই হত্যা করছি। আজ যে পরিবেশ বাঁচাও বাঁচাও বলে আমরা চিৎকার করছি, এই চিৎকার বহু বহু বছর আগেই করা উচিত ছিল। তাহলে পরিবেশের এতটা ক্ষতি হতো না।
পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে নিজের আঙিনার গাছের একটি ডাল কাটতে হলেও সিটি করপোরেশনের পারমিশন লাগে। আর আমরা শত্রুতা করে একজনের বাগানের হাজার হাজার কলা বা পেঁপেগাছের চারা কেটে দিয়ে এলাম। এসব দেখে মনে হয়, আমরা মানুষ হব কবে? সুসংবাদ হলো, পরিবেশের এই দুর্দিনে মানুষের কিছুটা সচেতনতাও এখন দেখা যাচ্ছে। মানুষ সচেতন হলে, আর সেই সচেতনতার প্রতিফলন যদি তার কর্মে ঘটে, তাহলে সবকিছুই জয় করা সম্ভব। গাছের প্রয়োজনীয়তা বাংলাদেশের মানুষ অনেকটাই যেন নতুন করে অনুভব করতে পারছে। নতুন করে প্রকৃতির প্রেমে যেন নিমজ্জিত হতে যাচ্ছে মানুষ। এর চেয়ে বড় আনন্দের সংবাদ আর কিছু নেই। মানুষ তার আঙিনা সুন্দর করতে চাইছে গাছ বুনে। ইট–রডের শহরেও ছাদবাগান করছে। গ্রামের পথঘাট খোলা জায়গায় গাছের চারা রোপণে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। সবুজ বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান বিশাল এক উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে পঁচিশ কোটি বৃক্ষচারা রোপণ করার ঘোষণা দিয়েছেন।
জাতির প্রতি আহবান জানিয়েছেন, ‘আসুন, সবুজ বসতি গড়ে তুলি। বৃক্ষরোপণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণের মতো বিষয়টি যদি আমাদের নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত করতে পারি, তাহলে আমরা সবুজ স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ বসতি গড়ে তুলতে পারব।’ [দৈনিক কালের কণ্ঠ, ১০ জুলাই ২০২৬]। এ এক অবিস্মরণীয় আহবান। এই আহ্বানে দেশের মানুষ উদ্দীপ্ত হয়েছে, ব্যাপক সাড়া পড়েছে দেশজুড়ে। সবুজ সুন্দর পরিবেশে সবাই বাঁচতে চায়। আমাদের ‘বসুন্ধরা শুভসংঘ’ যাত্রা শুরুরকাল থেকেই প্রতি বর্ষাঋতুতে হাজার হাজার চারা রোপণ করে চলেছে সারা দেশে। এই বছরও ব্যাপকভাবে চলছে সেই কাজ। ‘শুভসংঘ’র মতো অন্যান্য সামাজিক সংগঠনও চারা রোপণ করছে। এই সচেতনতা ও চেষ্টা নিশ্চয় আগামীর বাংলাদেশ সবুজ করে তুলবে, সুস্বাস্থ্যময় করে তুলবে। ‘শুভসংঘ’র একটি স্লোগান, ‘সবুজে সুন্দর আগামী’। আমরা আমাদের আগামীর জীবন সবুজে সুন্দর করে তুলতে চাই। একটি অনুরোধ দেশের মানুষকে করছি, আসুন, আজ থেকে আমরা যে যেখানে আছি সেখানে জন্মগ্রহণ করা প্রতিটি নবজাতকের জন্য একটি চারা রোপণ করি। বাড়ির আঙিনায় বা আশপাশের খোলা জায়গায় চারাটি যেন পত্রপল্লবে সুশোভিত হতে পারে সেদিকে নজর রাখি। এই শুভকাজটি, আসুন, সামাজিক আন্দোলন হিসেবে গড়ে তুলি।



