শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে জড়িত সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেন গ্রেপ্তারের পর অনেক অমীমাংসিত অধ্যায়ের জট খুলবে বলে আশাবাদী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর মধ্যে তাঁর দীর্ঘ সাড়ে চার দশকের আত্মগোপন, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা নিয়ে এখন চলছে আলোচনা। বিশেষ করে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণ ও মামলার নথি অনুযায়ী জানা যাচ্ছে যে, হত্যাকাণ্ডের পর মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেনই জিওসি মঞ্জুরকে টেলিফোনে জানিয়েছিলেন, ‘দ্য প্রেসিডেন্ট হ্যাজ বিন কিল্ড’। ওই সময় তাকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কারও ঘোষণা করেছিল সামরিক আদালত। সেক্ষেত্রে দেশের বহুল আলোচিত এমন নৃশংস রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের পর কীভাবে পালালেন তিনি? এত বছর তিনি কোথায় ছিলেন? কীভাবে বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেছেন? আবার দেশেই এলেন কীভাবে? ২৯ বছর ধরে বাংলাদেশে বসবাস করলেও কেন তাঁর খোঁজ মিলছিল না? এমন নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে জনমনে। জানা যায়, গ্রেপ্তার হওয়ার পর গোয়েন্দা পুলিশের জেরার মুখে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড নিয়ে কোনো প্রশ্নের সদুত্তর না দিলেও নিজের দীর্ঘ আত্মগোপন সম্পর্কে মুখ খুলেছেন তিনি। মেজর (অব.) মোজাফফর জানান, বনানী ডিওএইচএসের যে ফ্ল্যাট থেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন, সেটি তাঁর শ্বশুরের। সেখানে এক ছেলে, এক মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়েই তিনি থাকতেন। একই ফ্ল্যাটে থাকতেন তাঁর শ্বশুরবাড়ির লোকজনও। ডিওএইচএসের ৫ নম্বর রোডের ৭১ নম্বর বাড়ির চার তলার একটি ফ্ল্যাট থেকেই গ্রেপ্তার হন তিনি। তবে নিজের নাম ও পরিচয় প্রকাশ না করায় কেউ ভাবতেই পারেনি ঢাকাতেই অবস্থান করছেন ইতিহাসের অন্যতম ন্যক্কারজনক এক হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নিজের আত্মগোপন সম্পর্কে মোজাফফর ডিবির কাছে স্বীকার করেছেন, হত্যাকাণ্ডের পরের দিন তিনি ভারতে পালিয়ে যান।
কিছুদিন বিভিন্ন রাজ্যে ঘোরাঘুরি করে কলকাতায় অবস্থান নেন। সেখানে বিভিন্ন ভাড়া বাসায় অবস্থান করার সময়ই বুঝতে পারেন তাঁর দ্রুত সময়ে দেশে ফেরা অনেকটা অনিশ্চিত। সেজন্য সেখানে ভুয়া নাম ও পরিচয় ব্যবহার করে তিনি পান নাগরিকত্ব। সেই জাল নথির সাহায্যে পেয়েছিলেন তিনি পাসপোর্ট। ভারতীয় পাসপোর্টে কাতারসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ ও বাংলাদেশি অনেকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বলেও জানান তিনি। ডিবি সূত্র জানায়, অত্যন্ত ধুরন্ধর প্রকৃতির এই সেনা কর্মকর্তা ভারতে থাকার সময়ও নিয়মিতই নিজের অবস্থান পরিবর্তন করতেন। এসবের পেছনে তাঁর একটিই উদ্দেশ্য ছিল, যাতে বাংলাদেশের কোনো গোয়েন্দা সংস্থা তাঁর অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে না পারে। বাস্তবে হয়েছেও তাই– আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা (ইন্টারপোল) বা বাংলাদেশের গোয়েন্দারা তাঁর আসল নামে খোঁজ করেও দীর্ঘদিন কোনো হদিস পায়নি। ডিবির কাছে তিনি আরও জানান, ১৯৯৬ সালে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে এলে মোজাফফর দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। ফলে কলকাতায় ১৭ বছরের পলাতক জীবনের অবসান ঘটিয়ে ১৯৯৮ সালে গোপনে দেশে ফিরে আসেন। এরপর গত ২৯ বছর বাংলাদেশেই আছেন বলে গোয়েন্দাদের কাছে দাবি করেন তিনি। তবে এই সময়েও তিনি একটানা কোথাও থাকতেন না, বিভিন্ন জেলায় ভাড়া বাসায় থেকেছেন। শেষ দিকে গোয়েন্দারা তাঁর সম্পর্কে কোনো তথ্য না পাওয়ায় ভাবতে থাকেন হয়তো মৃত্যুর আগে আর কেউই তাঁর হদিস পাবে না। এজন্য শেষ জীবনটা পরিবারের সঙ্গে কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন। সে অনুযায়ী ডিওএইচএস এলাকায় শ্বশুরের ফ্ল্যাটে ওঠেন। কয়েক বছর ধরে পরিবারের সঙ্গেই সেখানেই থাকছিলেন। এ সময় তিনি সম্পূর্ণ নতুন একটি ছদ্মনাম ধারণ করেন। নিজের চেহারা ও বেশভূষায় পরিবর্তন আনেন। শুধু তা–ই নয়, দীর্ঘ ৪৫ বছরে পুরোনো চেনা পরিমণ্ডলের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিলেন। যাতে কোনোভাবেই কল ট্র্যাকিং বা নজরদারির মাধ্যমে তাঁর সন্ধান না মেলে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মোজাফফর হোসেনের অবস্থান শনাক্ত করা হয়। বাসায় প্রবেশের পর তিনি বিচলিত হয়ে পড়েন। আমরা তাঁকে সেভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করার প্রয়োজন মনে করিনি। তিনি একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা হওয়ায় কোর্ট মার্শালের জন্য আমরা তাঁকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করেছি। এর বাইরে কিছু জানা নেই।’
স্পষ্ট হবে হত্যাকাণ্ডে মোজাফফরের ভূমিকা : ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের সময় সেখানে তাঁর উপস্থিতি, আগে ও পরে মোজাফফরের ভূমিকা জানা গেলেই বেরিয়ে আসবে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মোটিভ। এর নেপথ্যে বিপথগামী সেনাসদস্য ছাড়াও অন্য কারও দায় রয়েছে কি না, এমন অনেক কিছুর রহস্য উন্মোচিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যে শহীদ জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন বই ও পত্রপত্রিকায় মোজাফফরের ভূমিকার কিছুটা উঠে এসেছে। জানা গেছে, এই হত্যাযজ্ঞে সরাসরি অংশ নেওয়া সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে তৎকালীন মেজর মোজাফফর হোসেন ও ক্যাপ্টেন মোসলেহ উদ্দিন ছিলেন অন্যতম।
বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও মামলাসংক্রান্ত বিবরণ অনুযায়ী, মেজর মোজাফফর হোসেনই প্রথম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে শনাক্ত করেন এবং তাঁকে লক্ষ্য করে সরাসরি গুলি চালান। হত্যাকাণ্ড নিশ্চিত করার পর তিনিই চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ২৪ পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরকে টেলিফোন করে জানান, ‘দ্য প্রেসিডেন্ট হ্যাজ বিন কিল্ড’। জানা যায় হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক ঘণ্টা পর মেজর শওকত আলী ও মেজর রেজাকে সঙ্গে নিয়ে আবার সার্কিট হাউসে গিয়েছিলেন মোজাফফর। তখন জিয়ার কক্ষে তল্লাশি চালিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত কাগজপত্র ও ডায়েরি খোঁজা হয়। জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর বিদ্রোহ ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট সেনা কর্মকর্তারা চট্টগ্রাম সেনানিবাস ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। সেই দলে ছিলেন মোজাফফরও। পরে গোলাগুলির মধ্যে তিনি পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
জিয়াউর রহমান হত্যার ঘটনায় সামরিক আদালতে ১৮ সেনা কর্মকর্তার বিচার হয়। তাঁদের মধ্যে ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড এবং অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। তবে মেজর এস এম খালেদ ও মেজর মোজাফফর পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। ওই সময় তাঁদের ধরিয়ে দিতে পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছিল। মেজর জেনারেল (অব.) মইনুল হোসেন চৌধুরীর স্মৃতিকথা ‘এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য : স্বাধীনতার প্রথম দশক’-এ মোজাফফরের অবস্থান সম্পর্কে কিছু তথ্য পাওয়া যায়। স্মৃতিকথার বরাতে জানা যায়, ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত থাইল্যান্ডে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত থাকার সময় মইনুল হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে ব্যাংককে দেখা করেছিলেন পলাতক মেজর এস এম খালেদ ও মোজাফফর। জিয়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নিয়ে তাঁদের সঙ্গে আলোচনাও হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি। মোজাফফর তখন ভারতে থাকতেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২৩ মার্চ ওয়ান–ইলেভেনের অন্যতম কুশীলব অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। বর্তমানে কারাগারে থাকা সাবেক এই বিতর্কিত সেনা কর্মকর্তার মোবাইল ফোন ফরেনসিকেই বেরিয়ে আসে জিয়াউর রহমানের খুনি মোজাফফরের সন্ধান। সূত্র জানায়, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর ফোনে জনডো নামে এক ব্যক্তির নিয়মিত যোগাযোগের কল লিস্ট বিশ্লেষণ করেন গোয়েন্দারা। একপর্যায়ে ছদ্মনামের এই রহস্যজনক ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে জানতে পারে পুলিশ। কিন্তু কথা বলার সময় ভিপিএন ব্যবহার করায় অবস্থান সম্পর্কে সঠিক তথ্য মিলছিল না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে ভিপিএন ছাড়াই সরাসরি ফোন কলে তাদের মধ্যে কথোপকথন হয়। সেই সূত্র ধরেই মেলে জিয়াউর রহমান হত্যার জীবিত একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী খুনির। অথচ ১৭৩ বার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ পেছানোর পর ২০০১ সালে সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবে ফাইনাল রিপোর্ট দিয়েছিল সিআইডি। তবে মোজাফফর গ্রেপ্তার হওয়ায় জিয়াউর রহমানকে হত্যার রক্তাক্ত কালো অধ্যায়ের অবসান ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের কুশীলবদের নাম বেরিয়ে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।



