পাকিস্তানের ইনিংসের ৫৩ ওভার চলছে। বোলিংয়ে বাংলাদেশের ‘স্পিড স্টার’ নাহিদ রানা। টাইগার দীর্ঘকায় পেসার ১০তম ওভার বোলিং করছিলেন তিন স্লিপ, এক গালি ও ফরোয়ার্ড শট লেগ রেখে। প্রতিটি বলই করছিলেন শট অব লেন্থে। ওভারের পঞ্চম বলটি বাউন্সার মারেন নাহিদ। আফ্রিদি ডাক করলেও বল গ্লাভসে লেগে ফরোয়ার্ড শর্ট লেগে যায়। মাহমুদুল হাসান জয় বল তালুবন্দি করেই জয়োচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন। শুধু জয় নন, ঘরের মাটিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথমবারের মতো টেস্ট জয়ের ঐতিহাসিক মুহূর্তটিকে ফ্রেমবন্দি করে আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে। মিরপুর টেস্টে ২৬৮ রানের মামুলি টার্গেট দিয়েও ১০৪ রানে জিতেছে বাংলাদেশ। টাইগারদের সিরিজে এগিয়ে নিয়ে গেছেন নাহিদ রানা আগুনে বোলিং করে। বাংলাদেশের ২৬ বছরের টেস্ট ইতিহাসে নাহিদ প্রথম পেসার হিসেবে চতুর্থ ইনিংসে ৫ উইকেট বা ‘ফাইফার’ নেন। মিরপুরে পাকিস্তানকে ১৬৩ রানে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ইনিংসে নাহিদের স্পেল ৯.৫–২–৪০–৫। এটা নাহিদের ১১ টেস্ট ক্যারিয়ারের সেরা বোলিং। আগের সেরা ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৬১ রানে ৫ উইকেট। মিরপুরে ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ের ম্যাচটিতে সেরা ক্রিকেটার হয়েছেন দেশের সফলতম টেস্ট অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। টাইগার অধিনায়ক প্রথম ইনিংসে ১০১ রানের পর দ্বিতীয় ইনিংসে ৮৭ রান করেন। মুমিনুল হক প্রথম ইনিংসে ৯১ রানের পর দ্বিতীয় ইনিংসে ৫৬ রান করেন।
টেস্টে বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটার হিসেবে টানা পাঁচ ইনিংসে হাফ সেঞ্চুরি করেন। সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট সিলেটে ১৬ মে। ঘরের মাটিতে টেস্টে এই প্রথম পাকিস্তানকে হারিয়েছে বাংলাদেশ। গতকালের জয়টি অবশ্য টেস্টে পাকিস্তানের বিপক্ষে টানা তৃতীয় বা হ্যাটট্রিক জয়। ২০২৪ সালে নাজমুলের নেতৃত্বেই টাইগাররা শান মাসুদের পাকিস্তানকে রাওয়ালপিন্ডিতে হারিয়েছিল ১০ ও ৬ উইকেটে। গতকালের জয়টি অধিনায়ক নাজমুলের নেতৃত্বে সপ্তম জয়। তিনি যুগ্মভাবে দেশের পক্ষে সবচেয়ে বেশি টেস্ট জয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন। নাজমুল ১৭ টেস্টের ৭টিতে জিতেছেন, একটি ড্র করেছেন এবং হেরেছেন ৯টি। অধিনায়ক মুশফিক ৭ টেস্ট জিততে দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন ৩৪টি। ড্র করেছেন ৯টি ও হেরেছেন ১৮টি। সাবেক অধিনায়ক সাকিব চারটি জিতেছেন ১৯ টেস্টে। আরেক সাবেক অধিনায়ক মুমিনুল জিতেছেন তিনটি। একটি করে টেস্ট জিতেছেন হাবিবুল বাশার সুমন, মাশরাফি বিন মর্তুজা, মেহেদি হাসান মিরাজ ও লিটন দাস। একটি টেস্টও জেতেননি খালেদ মাসুদ পাইলট, খালেদ মাহমুদ সুজন, মোহাম্মদ আশরাফুল। পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট জয়ের আনন্দে ভাসছেন অধিনায়ক নাজমুল। তার নেতৃত্বে টাইগাররা পাকিস্তানের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক টেস্ট জিতেছে। বৃষ্টিস্নাত মিরপুর টেস্টে অসাধারণ জয়ের পর ম্যাচসেরা নাজমুল ভূয়সী প্রশংসা করেন সতীর্থদের, ‘জয় পেয়ে খুব খুশি। ছেলেরা যেভাবে খেলেছে, তাতে আমি গর্বিত। গত কয়েক মাস আমরা কঠোর পরিশ্রম করেছি। আমরা ধীরে ধীরে টেস্ট ক্রিকেটে উন্নতি করছি। এটাই আমি সব সময় চেয়েছিলাম।’ টস হেরে প্রথম ব্যাটিংয়ে ৪১৩ রান করে নাজমুল বাহিনী। অধিনায়ক নাজমুল ১০১, মুমিনুল ৯১ ও মুশফিক ৭১ রান করেন। পাকিস্তান ৩৮৬ রানে গুটিয়ে যায় মেহেদি হাসান মিরাজের স্পিনে।
২৭ রানে এগিয়ে থেকে ৯ উইকেটে ২৪০ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করেন অধিনায়ক নাজমুল। নাহিদের আগুন ঝরানো বোলিং ও তাসকিন আহমেদের বিধ্বংসী বোলিংয়ে ৫২.৫ ওভারে ১৬৩ রানে অলআউট হয়। মাত্র ২৬৮ রানে টার্গেট ছুড়ে টেস্ট জয়ের বিষয়ে টাইগার অধিনায়ক নাজমুল আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের বোলিং আক্রমণ যথেষ্ট মানসম্পন্ন। এ উইকেটে নাহিদ রানা, তাসকিন, তাইজুল দারুণ বল করেছেন। জয়ের বিষয়ে আত্মবিশ্বাস ছিল বলেই ইনিংস ঘোষণার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।’ মুমিনুল ও মুশফিক উভয় ১৩টি করে সেঞ্চুরি করে যুগ্মভাবে সবার ওপরে রয়েছেন। দুজনই সেঞ্চুরির সুযোগ সৃষ্টি করেছিলেন। কিন্তু পারেননি তিন অঙ্কের জাদুকরী ইনিংস খেলতে। মুমিনুল প্রথম ইনিংসে ৯১ ও দ্বিতীয় ইনিংসে ৫৬ রান করেন। মুশফিক খেলেন প্রথম ইনিংসে ৭১ রান করেন। সেঞ্চুরি না পেলেও দুই অভিজ্ঞ ব্যাটারের প্রশংসা করেন টাইগার অধিনায়ক, ‘মুমিনুল ভাই দুর্দান্ত খেলেছেন।
উইকেটে বাউন্স বেশি ছিল। কিন্তু আমরা ভালো শট মেরেছি। মুশফিক ভাইও দারুণ ছিলেন।’ হারের কারণ ব্যাখ্যায় সফরকারী অধিনায়ক শান মাসুদ বলেন, ‘এ ধরনের উইকেটে টেস্ট ক্রিকেট শেখায়। প্রতিপক্ষকে যখন চাপে রাখার সুযোগ পাও, তখন সেটা কাজে লাগাতে হয়। আমরা সেটা করতে পারিনি।’



