সংঘর্ষ, সড়ক অবরোধ, অগ্নিসংযোগ ও হামলায় আবারও অস্থির হয়ে উঠেছে দেশের তিনটি শিল্পাঞ্চল। ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্তি ছাড়াও ‘অন্যায়ভাবে’ ছাঁটাই বন্ধের দাবিতে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গতকাল গাজীপুর, সাভার ও নারায়ণগঞ্জে পোশাক শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। গতকাল সকালে সাভারের হেমায়েতপুরে শ্রমিকদের অবরোধে ঢাকা–আরিচা মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সকাল ৮টার দিকে হেমায়েতপুরের পদ্মার মোড়ে স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের সামনে এবং সকাল ৯টায় উলাইলের আল–মুসলিম পোশাক কারখানার সামনে বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা জড়ো হতে শুরু করেন। একপর্যায়ে ঢাকা–আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন। এতে মহাসড়কের দুই পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে ভোগান্তিতে পড়েন হাজারো যাত্রী। পুলিশ শ্রমিকদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে শ্রমিকরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে।
একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধরা পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন বলেন, সকালে পদ্মার মোড় এলাকায় দুই পাশ থেকে ৩০ থেকে ৪০ হাজার শ্রমিক জড়ো হয়ে পুলিশের ওপর আক্রমণাত্মক হয়ে উঠলে পুলিশ প্রতিরোধ করে। এ সময় আন্দোলনকারীরা সাভার মডেল থানার ওসির গাড়িতে আগুন দেন। তাদের হামলায় ওসি গুরুতর আহত হন। সংঘর্ষে ওসি সাইফুল আলমসহ পুলিশ সদস্য, শ্রমিক, সাংবাদিক ও পথচারী মিলিয়ে অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছেন। তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এদিকে হেমায়েতপুরে শ্রমিক আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে পাঁচ সাংবাদিক হামলা ও মারধরের শিকার হয়েছেন। সকাল সাড়ে ৯টায় পদ্মার মোড়ে স্টার নিউজের প্রতিনিধি আহমাদ সোহান সিরাজী, একাত্তর টেলিভিশনের প্রতিনিধি রাইয়ান বিন আমিন ও ক্যামেরাপারসন উজ্জ্বল হোসেনের ওপর হামলা হয়। সাংবাদিকদের ভাষ্য, মাস্ক পরা একদল ব্যক্তি তাদের পরিচয় জেনে লাঠি ও ইট দিয়ে মারধর করেন। বেলা ১২টায় সরাসরি সম্প্রচার চলাকালে নিউজ টোয়েন্টিফোরের প্রতিবেদক নাজমুল হুদা ও ক্যামেরাপারসন ইমদাদুল হকের ওপরও হামলা হয়।
নাজমুল হুদা জানান, ১৫ থেকে ২০ জন মুখোশধারী তাদের ওপর হামলা চালিয়ে ক্যামেরা ভাঙচুর করেন। রড, লাঠি ও ইট দিয়ে মারধর করা হয়। শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ায় হেমায়েতপুর, পদ্মার মোড় ও উলাইলসহ আশপাশের এলাকার প্রায় শতাধিক পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ–১ এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, সকালে কারখানাগুলোতে উৎপাদন শুরু হয়েছিল। পরে কিছু লোকের ইন্ধনে শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে কারখানার ভিতরে অবস্থান নেন। দীর্ঘ সময় কাজ না হওয়ায় কর্তৃপক্ষ ছুটি ঘোষণা করে। বিজিবি ঢাকা ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তাইমুন জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সাভার ও আশুলিয়ায় তিন প্লাটুন বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এ ছাড়া উত্তরাতেও সতর্ক অবস্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দেখা যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন এলাকায় ২৫ প্লাটুন বিজিবি–এসআরবি–আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়। এদিকে গাজীপুরে শ্রমিক আন্দোলনের ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে হামলার শিকার হওয়া এক পোশাকশ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। তার নাম তৌফিক শেখ। মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর উত্তরার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় তার। তৌফিকের মৃত্যুর প্রতিবাদে গতকাল সকাল ১০টায় লায়লা স্টাইলস লিমিটেড কারখানার শ্রমিকরা রাজেন্দ্রপুর–বাংলাবাজার সড়কের গাজীপুর সদর উপজেলার বাংলাবাজার এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল বের করেন।
এদিকে তৌফিক শেখের গায়েবানা জানাজা পড়তে এসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধাওয়ার মুখে পড়েন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা–কর্মীরা। দুপুর পৌনে ১টায় গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ। এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা আলী নাছের খান বলেন, পুলিশ আমাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বাধা প্রদান করেছে। গাজীপুরের গাছা, সাইনবোর্ড, বাংলাবাজার ও মির্জাপুর এলাকায় গতকাল শ্রমিকদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এদিকে গতকাল সকালে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় শিবু মার্কেট ও কাঠেরপুল এলাকায় শ্রমিকরা ঢাকা–নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড অবরোধের উদ্দেশে জড়ো হলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। এ সময় শ্রমিকরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। পুলিশ টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে। এ সময় বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়। নারায়ণগঞ্জে আন্দোলনের আড়ালে সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং সংঘাত উসকে দেওয়ার অভিযোগে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা–কর্মীদের বিরুদ্ধে মঙ্গলবার রাতে মামলা করেছে পুলিশ। মামলায় ২১ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও দেড় হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এদিকে গতকাল দুপুরে টঙ্গীর গাজীপুরা এলাকায় মাসকো কটন, স্যাটার্ন, হোপননসহ বেশে কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে।
এখবর অন্যান্য কারখানায় ছড়িয়ে পড়লে অন্তত ২০ থেকে ২২ কারখানায় তাৎক্ষণিক ছুটি ঘোষণা করে। পরে ওই কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষোভে যোগ দেয়। এ সময় শ্রমিকরা কয়েটি কারখানায় ইটপাটকেল নিক্ষেপও করেন। প্রায় ২০ মিনিট অবরোধের কারণে সড়কের টঙ্গী গাজীপুরা, কলেজ গেট, চেরাগআলী, স্টেশনরোড এলাকায় যানজটের তৈরি হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। নৈরাজ্যের প্রতিবাদে বিএনপির অবস্থান কর্মসূচি : অপরদিকে শ্রমিক অসন্তোষের নামে নৈরাজ্যের প্রতিবাদে গতকাল সকালে স্থানীয় বিএনপি নেতা–কর্মীরা অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির অন্যতম সদস্য হাসান উদ্দিন সরকার। গাজীপুর মহানগর বিএনপির সাবেক ১ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক রাকিব উদ্দিন সরকার পাপ্পু, বিএনপি নেতা সরকার শাহনুর ইসলাম রনিসহ বিএনপির অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতারা।


