সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে ওয়েবসাইট তৈরির অন্যতম জনপ্রিয় প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপিতে গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি ধরা পড়ায় সাইবার হামলার আশঙ্কায় বাংলাদেশ ব্যাংক ও ডিজিটাল ভূমি সেবাসহ দেশের কয়েকটি ব্যাংকের ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। সরকারের সাইবার নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট সংস্থা বিজিডি ই–গভ সার্টের জারি করা জরুরি সতর্কবার্তার পর তথ্যভান্ডার সুরক্ষায় প্রতিষ্ঠানগুলো ওই পদক্ষেপ নেয়। সাইবার হামলা হলে মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে দেশের তথ্যভান্ডার। সাইবার সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় গাইডলাইন ও দুর্বল ব্যবস্থাপনায় এ ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি সাইবার সুরক্ষা নিয়ে কাজ করার মতো দক্ষ জনবলের ব্যাপক সংকট রয়েছে। শিগগিরই এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে পরবর্তী সাইবার হামলা দেশের তথ্যভান্ডারকে অনিরাপদ করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন প্রযুক্তি বিষেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকরা। তাদের ভাষায়, বিষয়টি মারাত্মক ‘উদ্বেগজনক’। এমনটা হলে দেশের নাগরিক সেবা ব্যাহত হতে পারে। ভোগান্তির মুখে পড়তে পারেন সাধারণ জনগণ।
এ থেকে রক্ষা পাবে না বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও। তাই বিষয়টিকে এখনই গুরুত্ব সহকারে দেখতে হবে। এর আগে কয়েক দফায় কোটি কোটি নাগরিকের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ফাঁসের মতো ঘটনা ঘটায় বর্তমান পরিস্থিতিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। অতীতে রিজার্ভ চুরি ও এনবিআরের সার্ভার হ্যাকের ঘটনা তুলে ধরে তারা জানান, সঠিক পরিকল্পনা ও সুরক্ষার অভাবে দেশের প্রায় শতভাগ ওয়েবসাইট ঝুঁকিপূর্ণ। তবে ঝুঁকি এড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠান তাদের ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করে পুনরায় সচল করে। সংশ্লিষ্টরা জানান, আমাদের দেশের সরকারি–বেসরকারি অধিকাংশ কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তৃতীয় পক্ষের কাছে গচ্ছিত থাকে। যেকোনো ইস্যুতে প্রথম ও দ্বিতীয় পক্ষের মধ্যে অমিল হলে বা কোনো অনৈতিক উদ্দেশে ব্যবহারের প্রয়োজন হলে অন্য পক্ষের কাছে সরবরাহ করলেও প্রথম বা দ্বিতীয় পক্ষের কিছু করার থাকবে না। একজন হ্যাকার একজন ব্যক্তির একটি মোবাইল নম্বর বা তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য নিয়ে ওই ব্যক্তির অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অতি দ্রুত বের করতে পারবে। এ বিষয়ে উন্নত দেশগুলোতে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিরাপত্তা দেওয়া হয়।
আমাদের দেশে এরকম কোনো ব্যবস্থা নেই। বাংলাদেশের খুবই কম প্রতিষ্ঠান আছে যেখানে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত আছে। সরকারি–বেসরকারি সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের সাইবার নিরাপত্তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সাইবার নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও এশিয়া–প্যাসিফিক নেটওয়ার্ক ইনফরমেশন সেন্টারের (এপনিক) নির্বাহী কমিটির (ইসি) সদস্য সুমন আহমেদ সাবির বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ডেটা সিকিউরিটি ও ডেটা প্রাইভেসি ঝুঁকিতে থাকায় দেশের তথ্যভান্ডার চরম নিরাপত্তাহীনতায় আছে। সম্প্রতি দেশে যে সাইবার হামলা হলো এটা আমাদের জন্য বড় ধরনের শিক্ষা বলে মনে করি। ওয়েবসাইট বন্ধ করে পরে সচল করাটা ছিল সঠিক সিদ্ধান্ত। ওইসময় ওয়েবসাইট সচল থাকলে হ্যাকড হওয়ার সম্ভাবনা ছিল সবচেয়ে বেশি। তিনি বলেন, সফটওয়্যার যেখানে আছে সেখানে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা আছে। বাংলাদেশ সাইবার সুরক্ষায় বরাবরই দুর্বল। বিশ্বের অনেক দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে সাইবার সুরক্ষায় গাইডলাইন ও দক্ষ জনবল রয়েছে। এটা ডায়নামিক চিন্তা। আমাদের দেশে এটা নেই। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা গণমাধ্যমকে বলেন, সাইবার নিরাপত্তা এজেন্সির নিজস্ব দক্ষ জনবল না থাকায় এতদিন কার্যক্রম পরিচালনায় বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা ছিল। তবে এজেন্সির জন্য ১০০টি পদের অনুমোদন পাওয়া গেছে। এসব পদের অধিকাংশেই কারিগরি বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেওয়া হবে। দ্রুত নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। সংশ্লিষ্টরা জানান, সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকার বেশ কিছু কারণ আছে। দেশে যে ওয়েবসাইটগুলো তৈরি করা হয়, এগুলো সঠিকভাবে পরিকল্পনা না করেই তৈরি করা হয়।
নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত ইস্যুগুলো ভালোভাবে সংরক্ষিত রাখা হয় না। কোনো ধরনের বাগ বা ত্রুটি বের না করেই ওয়েবসাইট চালু করা হয়। তাই যারা ওয়েবসাইট তৈরি করতে চান, তাদের উচিত হবে একজন ভালো প্রোগ্রামার দিয়ে ওয়েবসাইট তৈরি করা। দ্বিতীয়ত, ওয়েবসাইটে দুর্বলতাগুলো খুঁজে বের করে তা মূল্যায়নের পর সেগুলো নির্দিষ্টভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সিস্টেম উন্নত (আপগ্রেড) করতে হবে। গত সপ্তাহে ক্যালিফ ও উইজ নামের দুটি মার্কিন সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের একদল গবেষক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সাহায্যে পিএইচপির এক দশকের পুরোনো এই গুরুতর ত্রুটি শনাক্ত করেন। এরপর ২১ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা (এনএসএ) জরুরি সতর্কতা জারি করে। এর পরপরই হ্যাকিংয়ের আশঙ্কায় উইকিমিডিয়া, যুক্তরাজ্য সরকার, ফ্রান্সের অরেঞ্জ, ফিনল্যান্ড সরকারসহ বিশ্বজুড়ে শত শত ওয়েবসাইট তাদের সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়।



