ঘন জঙ্গলের মধ্যে খোলা আকাশের নিচে মাটিতে শুয়ে কাঁদছেন জেলেকা বেগম। শরীরে কয়েক টুকরো ময়লা কাপড়। মাথার নিচে প্লাস্টিকের বস্তা। চারপাশে ছড়িয়ে আছে মলমূত্র। পাশে পরিত্যক্ত শৌচাগার। আশপাশে পোকামাকড়ের চলাফেরা। সেখানে নেই আলো। অসুস্থ ও চলাফেরায় অক্ষম একজন বৃদ্ধার জন্য জায়গাটি যে কতটা বিপজ্জনক, তা সহজেই বোঝা যায়।
জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে এমন করুণ পরিস্থিতিতে পড়েছেন ফরিদপুরের সদরপুরের জেলেকা বেগম। তাঁর আনুমানিক বয়স ৭৫। গত শুক্রবার রাত ৯টার দিকে উপজেলার সদর ইউনিয়নের পূর্ব শ্যামপুর গ্রামে পাওয়া যায় জেলেকা বেগমকে। তাঁর অভিযোগ, গত ১০ অক্টোবর রাতে তাঁকে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে জঙ্গলে ফেলে দিয়েছেন বড় মেয়ে ময়না বেগম।
গত শুক্রবার রাতে কাছে যেতে অপরিচিত মানুষের উপস্থিতিতে চমকে ওঠেন জেলেকা। পরে অস্পষ্ট কণ্ঠে জানান, মেয়ের বাড়িতে তাঁকে ঠিকমতো খাবার দেওয়া হয় না। পাঁচ দিন আগে ঘর থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। গলা চেপে ধরে ও লাঠি দিয়ে পেটানোর অভিযোগও করেন তিনি।
এই বৃদ্ধার স্বামী মারা গেছেন অনেক আগে। কোনো ছেলে নেই।
বড় মেয়ে ময়না বেগম (৪৮) স্বামী ও এক ছেলেমেয়েকে নিয়ে একই গ্রামে থাকেন। মেজ মেয়ে মনি আক্তার (৩৫) সৌদি আরবে। ছোট মেয়ে সীমা আক্তার (৩০) আগে সৌদি আরব থাকতেন। এখন দেশে আছেন। জেলেকা দীর্ঘদিন ধরে থাকেন বড় মেয়ের বাড়িতে। প্রতিবেশীরা জানান, ছোট দুই বোনের বিদেশ থেকে পাঠানো টাকায় ময়নার বাড়িতে পাকা ঘর তৈরি করা হয়েছিল। বৃদ্ধা মাকে সেখানেই রাখার কথা ছিল। কিন্তু সেই সুযোগ হয়নি। পুরোনো ঘরে জেলেকা থাকতেন, সেটির অবস্থাও শোচনীয়। ঘরের ভেতরে আলো কিংবা বৈদ্যুতিক পাখার ব্যবস্থা নেই। দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ। প্রতিবেশী নুরুল ইসলাম বলেন, ‘বৃদ্ধা যেভাবে জঙ্গলে পড়ে আছেন, এতে যে কোনো সময় শিয়াল–কুকুরের আক্রমণের শিকার হতে পারেন। সাপ–বিচ্ছুরও ভয় রয়েছে। রাতের অন্ধকারে মাটির ওপর একা পড়ে থাকেন তিনি। এভাবে একজন মানুষ কীভাবে বেঁচে থাকবেন?’
আরেক প্রতিবেশী তোফাজ্জেলের ভাষ্য, জেলেকা বেগমকে নিয়মিত খাবার দেওয়া হয় না। কখনও শুধু লবণ দিয়ে ভাত দেওয়া হয়, পানিও ঠিকমতো দেওয়া হয় না। যে পাত্রে তাঁকে খাবার দেওয়া হয়, সেটিতে কুকুর–বিড়ালও খায়! ময়না বেগম এসব অস্বীকার করে বলেন, ‘আমার মা নিজেই ঘর থেকে বের হয়ে যান। তিনি ঘরে থাকতে চান না। আমি তাঁকে মারধর করি না। তাঁর থাকার ঘরটিও আমরা সাধ্য অনুযায়ী পরিষ্কার রাখতাম। প্রতিদিন সম্ভব না হলেও সপ্তাহে এক–দুই দিন তাঁকে গোসল করানো হতো।’ ময়নার কিশোর ছেলে মাসুমের ভাষ্য, তাদের সংসারে অভাব–অনটন লেগেই থাকে। নিজেদের খাওয়া–দাওয়া ঠিকমতো চলে না। এর মধ্যেও নানির দেখাশোনা করছে। নানির আরও দুই মেয়ে রয়েছেন, তারা কেউ একবারের জন্যও খোঁজখবর নিতে আসেননি। এমনকি কোনো খরচও দেন না। সদরপুরের ইউএনও শরীফ শাওন বলেন, সাংবাদিকদের মাধ্যমে বিষয়টি জেনেছেন। বৃদ্ধার নিরাপত্তা ও সহায়তার বিষয়ে যে ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা করবেন।



