মৃত মাছ স্রোতেনুকূলে ভেসে যায়, আর জীবিত মাছ চলে নিজের ইচ্ছায়, স্বীয় প্রয়োজনানুসারে। সূত্রটি যদি মানুষের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়, তখন দেখা যাবে, প্রাজ্ঞ ও অজ্ঞ লোকের বিষয়ে মন্তব্যটি যুতসই হবে। যে বিষয়টি আপনার জানা থাকে না, তেমন বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া আপনার পক্ষে কষ্টকর হবে। তখন আবশ্যক হবে পরামর্শকের, তিনি হবেন তেমন বিষয়ে প্রাজ্ঞ। আবার আপনি যখন নিজেই বুঝতে পারবেন তেমন বিষয়ের ইতিবৃত্ত খুটিনাটি, তখন নিজেও যেমন একা একা চলতে পারবেন, প্রয়োজন বোধে অন্যকোনো অজানা ব্যক্তিকেও সাহায্য করতে পারবেন। প্রসঙ্গক্রমে অতি সাধারণ দৃষ্টান্ত টানা যেতে পারে। মোমের রাজ্যে কেবল প্রজ¦লিত মোমটির পক্ষেই সম্ভব আর একটি মোমকে জ¦ালিয়ে দেয়। যিনি শিক্ষাগ্রহণ করেছেন কেবল তিনিই আর একজনকে শিক্ষার আলোতে নিয়ে আসতে পারেন। সুশিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তি আর অশিক্ষিত ব্যক্তিদের যথাক্রমে জীবিত ও মৃত মাছের সাথেই তুলনা করা চলে।
ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নেতানেত্রীর ক্ষেত্রে দেখেছি তারা যেন স্বাচ্ছন্দবোধ করছে অজানা অচেনা বিষয় বিদেশি ভাষায় নসিহত করতে, আর সাধারণ মানুষ আদিঅন্ত মোদ্দাকথা না বুঝেই আমিন আমিন কলোরবে সভাকক্ষ মুখর করে সম্মতি জ্ঞাপন করে চলে। মুহুর্মুহ করধনি দিয়ে বক্তাকে দ্রুতলয়ে এগিয়ে চলতে প্রেরণা দেয়। বাঙ্গালী জাতি নিজের মাতৃভাষাটাও ভালভাবে বুঝতে পারে না, তাহলে বিদেশি ভাষায় প্রকাশিত বক্তব্য, পরামর্শ, উপদেশাবলি বুঝতে কেমন করে। ফলে মুখে শতবার সহজ সরলপথে চলার প্রতিজ্ঞা দেয়ার পরক্ষণেই যেই ভুলপথে ইতোপূর্বে চলছিল, পুনরায় হেথায়ই হাজির হলো দ্বিগুন শক্তি নিয়ে।
সমস্যা হলো শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে। সুশিক্ষা বিস্তার আর প্রতিষ্ঠা তো একই প্রক্রিয়া। অন্ধকার দূর করার জন্য যেমন আলো ও আলোর উৎসের উপস্থিতি অত্যাবশ্যক, মানুষের হৃদয়ে জমে থাকা ভ্রান্তধারণা দূর করার জন্যও সুশিক্ষার বিস্তার অপরিহার্য। ক্ষুধার্তের জন্য খাদ্য, তৃষ্ণার্তের জন্য পানীয়, বস্ত্রহীনের জন্য ব¯্র আর গৃহহীনের জন্য গৃহ, কথাগুলো সমাজ কল্যাণকর সিঃসন্দেহে, তবে কারো জন্য মঞ্জুর করা ঘরে যদি সে উঠতে না পারে তবে তেমন বরাদ্দ কোন কাজে আসবে বলুন। টিনজাত খাদ্য পরিবেশন করা হলো যার মুখ খোলাও সম্ভব হলো না, আর ক্ষুধাও হলো না নিবৃত, প্রয়োজনীয় কাপড় পড়ে র’লো গাঁট বাধা অবস্থায় গোডাউনে, আর নগ্ন অর্ধনগ্ন লোকজন ভুখানাঙ্গা অবস্থায় আশেপাশে ধুকে ধুকে মরছে, শিক্ষা বিস্তার হচ্ছে ঠিকই তবে তা অজানা অচেনা বিদেশি ভাষায, কেবল বর্ণনার শেষে আমিন আমিন ধ্বনি উচ্চারণ করা ছাড়া তাদের (শ্রোতামন্ডলির) আর কিছুই করার থাকে না। কতকগুলো ঠকবাজদের কবলে সমাজ কবলিত।
অবশ্য মৃত মৎস যেমন স্রোতের বিপরীতে চলার ক্ষমতা রাখে না, একইভাবে সমাজের সাধারণ লোকজন ধোকাবাজদের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস রাখে না। মগের মল্লুক তো তাকেই বলে “জ্বী হুজুর, যাহাপনা” না বলে আনপড় অধিনস্থ লোকজন অধিক করার তো কোনো উপায় খুঁজে পায় না।
খোদা সমাজ সংস্কারের নিমিত্তে মাঝে মধ্যে সংস্কারক প্রেরণ করেন মানবের প্রতি তাঁর সীমাহিন প্রেম প্রকাশের জন্য। সামাজিক শোষণ নির্যাতনের বিরুদ্ধে সাধারণ জনতাকে সচেতন করতঃ প্রবল গণশক্তি সৃষ্টি করে কায়েমি স্বার্থান্বেষিদের শক্তির ভিত গুড়ো করতে দেখেছি, দেখেছি সমাজের আমূল পরিবর্তন সাধনকল্পে পরিচালিত বিপ্লব আন্দোলন, ঠিক একইভাবে ধর্মীয় কুহেলিকা তথা ভ্রান্ত মতবাদের বেড়াজাল ছিন্ন করে সাধারণ মানুষকে বন্দি শিবির থেকে মুক্ত স্বাধীন করার আন্দোলন। খোদাবন্দ হযরত ঈসা মসিহ একবার এবাদতগৃহে ঢুকে আত্মার আগুনে জ¦লে উঠেছিলেন। পিতার গৃহ হলো এবাদতের গৃহ, অথচ কায়েমি স্বার্থান্বেষি মহল তা বাণিজ্যের আড়তে করেছিল পরিণত। তিনি বাণিজ্যের পসরা, টাকা বদল করার টেবিল উল্টে দিয়েছিলেন।
আজকের বণিকদের কাছে খোলা প্রশ্ন রাখতে চাই, তোমরা কি ভেবেছো? মসিহ পুনরায় এ ধরাপৃষ্ঠে কি ফিরে আসবেন না? আর বর্তমানেই বা তিনি কোথা কি করছেন? খোদা ক্রোধে ধির আর দয়াতে মহান! খোদার দয়া ও অনুগ্রহের অপচয় করে তোমরা কি পার পেতে চাও? তোমরা কি জানো না, খোদার সাথে তামাশা চলে না। তোমরা কোন স্বার্থে, কত কাল ইবলিসের সাথে তাল মিলিয়ে চলবে? বর্তমানে তোমাদের জীবনে কতোটা শান্তি স্বস্তি রয়েছে একটু ভেবে দেখ। কথায় বলে হারামে আরাম নেই।
খোদা অপেক্ষায় আছন গুনাহগার মন ফিরিয়ে খোদার কাছে ফিরে আসুক। পাপ অপরাধ যতই মারাত্মক হোক না কেন, মাবুদের পক্ষে তা শোধন করা অতি সহজ! পাপীর মরণে তার কোনো আনন্দ নেই বরং একজন গুনাহগার যখন মন ফিরিয়ে সত্য সুন্দর মসিহের ক্রোড়ে আশ্রয় নেয়, অমনি বেহেশতে আনন্দের ঢেউ বইতে শুরু করে।
ইবলিস হলো কালো শক্তি, রয়েছে তার মধ্যে মৃতের গন্ধ, আর মসিহ হলেন জীবনের ফল্গুধারা, শান্তি ও আনন্দের উৎস। চার দিনের মৃত লাসারকে মসিহ ডাক দিলেন, জীবন ফিরিয়ে দিলেন, যদিও তা ছিল দৈহিক প্রাণ, কিন্তু তিনি এসেছেন রুহানিভাবে মৃত ব্যক্তিদের রুহানি জীবন ফিরিয়ে দিতে, তিনি ঘোষণা দিলেন, “চোর কেবল চুরি, খুন ও নষ্ট করার জন্য আসে আর আমি এসেছি জীবনের সঞ্চালন ঘটাতে, উপচেপড়া জীবন যোগাতে (ইউহোন্না ১০ : ১০)।
আসুন, মৃতদেহে জীবনের নবজোয়ার ঘটাতে, মসিহের হাতে সুন্দরভাবে ব্যবহৃত হতে এগিয়ে যাই একাগ্রচিত্তে। ‘অন্ধকারপুরি আলোতে ঝলমল করবে কেবল মসিহের উপস্থিতিতে যা হলো চির সত্য’ (প্রকাশিত কালাম ২১ অধ্যায়)।


