পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগঠন জেএসএস ও ইউপিডিএফের মধ্যে দ্বন্দ্ব সংঘাতের কারণে নিরাপত্তা সংকটের মুখে গত রোববার (১১ অক্টোবর) সন্ধ্যায় সাজেক পর্যটন কেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে প্রশাসন। রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নাজমা আশরাফী এক জরুরি গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পর্যটনকেন্দ্র বন্ধের এ ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে ১৩ অক্টোবর বিকেল ৫টার মধ্যে পর্যটকদের সাজেক ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এর প্রেক্ষিতে নির্ধারিত তারিখের একদিন আগেই, অর্থাৎ ১২ অক্টোবর সকল পর্যটক সাজেক ছেড়ে চলে যান। এদিকে দুর্গাপূজার দীর্ঘ ছুটির আগে হঠাৎ পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধের ফলে পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বড় অংকের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, দুর্গাপূজার ছুটিতে ১৪ অক্টোবর হতে ২৭ অক্টোবর খাগড়াছড়ি ও সাজেকে প্রায় ৬০ হাজার পর্যটক ভ্রমণে আসার কথা।
এসময় সাজেক বন্ধের নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলে তাদের প্রায় ১৫ কোটি টাকার মতো ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। সাজেক কটেজ–রিসোর্ট অনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুপর্ণ দেববর্মন জানান, শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে ১৬ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত সরকারি ছুটি থাকায় ১৪ অক্টোবর হতে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত সাজেকের রিসোর্ট ও কটেজগুলোর সব কক্ষ আগাম বুকিং দেওয়া ছিল। এছাড়া পরিবহণও আগাম বুকিং ছিল। কিন্তু পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করায় কটেজ ও রিসোর্টের মালিকসহ সংশ্লিষ্ট সকলে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন। সাজেক বন্ধের নিষেধাজ্ঞাবহাল থাকলে ১৫ কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। ই–ট্যুরিজম এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশে সদস্য উজ্জ্বল দেব বলেন, ‘দুর্গাপূজার মৌসুমে বিগত ২–৩ বছর ধরে আমাদের কটেজ ও রিসোর্টের সব কক্ষ ফুল বুকিং হয়ে যায়।
আর এ সময়টায় আঞ্চলিক সংগঠনের রেশারেশির কারণে পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যায়। এতে আমরা ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়।’ তাছাড়া পর্যটন ব্যবসায়ীদের ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকার সাজেক পর্যটনকেন্দ্র দ্রুত সময়ের মধ্যে পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করার দাবি জানান এই ব্যবসায়ী নেতা। এদিকে, সোমবার খাগড়াছড়িতে অনুষ্ঠিত এক মত বিনিময় সভায় খাগড়াছড়ি রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কেএম ওবায়দুল হক বলেছেন অবৈধ অস্ত্রধারীদের অপতৎপরতায় পর্যটকদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সাজেক পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে।
এসব অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা করা হবে। জানা যায়, সাজেকে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গত প্রায় এক মাস ধরে সন্তু লারমার নিয়ন্ত্রণাধীন জেএসএস ও প্রসীত খীসার সমর্থিত ইউপিডিএফের অস্ত্রধারীদের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে। এ অবস্থায় সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন নামে দুটি সংগঠন ওই এলাকা থেকে জেএসএস’র (সন্তু) অস্ত্রধারীদের বিতাড়নের দাবিতে গত রোববার ভোর ৬টা থেকে সাজেক সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ডাক দেয়। এতে ভোগান্তিতের পড়েন পর্যটকরা। পরে এদিন বিকেল ৩টা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে অবরোধকারীদের দীর্ঘ আলোচনার পর দুইদিনের জন্য অবরোধ কর্মসূচি স্থগিত করা হয়।
পরে সাজেকে আটকা পড়া পর্যটকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় খাগড়াছড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়। এদিকে সাজেকে বেড়াতে আসা পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত ও সাজেকে পর্যটকদের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে খাগড়াছড়িতে মানববন্ধন ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না হলে খাগড়াছড়িতে টানা হরতাল–অবরোধের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। বুধবার সকালে খাগড়াছড়ির শাপলা চত্বরে পর্যটন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার ব্যানারে আয়োজিত মানববন্ধন থেকে এ ঘোষণা দেওয়া হয়।
পরে মিছিল নিয়ে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, দুই আঞ্চলিক সংগঠনের রেষারেষির বলি হচ্ছে সাধারণ মানুষ। তাদের আধিপত্য বিস্তারের জেরে সাজেক পর্যটন কেন্দ্র সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করায় ক্ষতির মুখে পাহাড়ের পর্যটন অর্থনীতি। শারদীয় দুর্গাপূজার টানা ছুটিতে সাজেকে রিসোর্ট কটেজে টানা বুকিং থাকলেও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে পর্যটকেরা সাজেকে আসতে না পারলে বড় ধরনের আর্থিক শঙ্কা রয়েছে।



