বাস্তবের জটিলতা থেকে কয়েক ঘণ্টার জন্য দর্শককে নিয়ে যাওয়া হয় অন্য এক জগতে, যেখানে কথা বলে প্রাণী, মানুষ রূপ বদলায়, মৃতেরা ফিরে আসে, রাজা–রানির রাজ্য, জাদু, দৈত্য, ভূত কিংবা অলৌকিক শক্তি গল্পের গতিপথ বদলে দেয়–সিনেমার এ জগতের নাম ফ্যান্টাসি। বিশ্ব সিনেমায় ফ্যান্টাসি আজ সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক ঘরানাগুলোর একটি। বাংলাদেশেও এর শিকড় বেশ গভীরে। একসময় ‘ফোক–ফ্যান্টাসি’ ছিল ঢালিউডের সবচেয়ে জনপ্রিয় বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম; কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ধারায় ভাটা পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ‘হাওয়া’র মতো সিনেমায় লোকবিশ্বাস, মিথ ও রহস্যের সাফল্য আবারও প্রশ্ন তুলেছে–বাংলাদেশি দর্শক কি আসলে ফ্যান্টাসি থেকে মুখ ফিরিয়েছে, নাকি বদলে গেছে ফ্যান্টাসির ভাষা?
* ফ্যান্টাসি সিনেমা আসলে কী
সহজ ভাষায়, যে সিনেমায় বাস্তব জগতের নিয়মের বাইরে কল্পনা, জাদু, অতিপ্রাকৃত শক্তি, পৌরাণিক চরিত্র, কাল্পনিক প্রাণী কিংবা অসম্ভব কোনো জগতকে গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসাবে ব্যবহার করা হয়, সেটিই ফ্যান্টাসি সিনেমা। তবে ফ্যান্টাসি মানেই শুধু রাজা–রানির গল্প বা জাদুর কাঠি নয়। লোককথা, পৌরাণিক কাহিনি, ভূত–প্রেত, অলৌকিক ঘটনা, রূপান্তর, বিকল্প জগৎ–সবই ফ্যান্টাসির উপাদান হতে পারে। ফ্যান্টাসির সঙ্গে সায়েন্স ফিকশনের পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ। সায়েন্স ফিকশনে অসম্ভব ঘটনাকে সাধারণত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সম্ভাবনা দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়; ফ্যান্টাসিতে তার ভিত্তি হতে পারে জাদু, মিথ, লোকবিশ্বাস কিংবা সম্পূর্ণ কল্পনা।
* সিনেমায় ফ্যান্টাসির জন্ম সেই শুরুতেই
ফ্যান্টাসি সিনেমার ইতিহাস চলচ্চিত্রের ইতিহাসের প্রায় সমবয়সি। ফরাসি জাদুকর ও সিনেমা নির্মাতা জর্জ মেলিয়েস ১৯০২ সালে নির্মাণ করেন ‘অ্যা ট্রিপ টু দ্য মুন’, যেখানে কামানের মাধ্যমে মানুষকে চাঁদে পাঠানোর কল্পনাপ্রসূত অভিযান দেখানো হয়। সিনেমাটিকে ফ্যান্টাসি ও সায়েন্স ফিকশনের প্রাথমিক মাইলফলক হিসাবে বিবেচনা করা হয়। মেলিয়েস স্টপ–মোশন, ডাবল এক্সপোজার ও মঞ্চের জাদুকৌশল ব্যবহার করে পর্দায় এমন সব দৃশ্য তৈরি করেছিলেন, যা দর্শকের কাছে তখন প্রায় জাদুর মতোই মনে হতো। এরপর ‘দ্য থিফ অব বাগদাদ’ (১৯২৪), ‘কিং কং’ (১৯৩৩), ‘দ্য উইজার্ড অব ওজেড’ (১৯৩৯), ‘শো হোয়াইট অ্যান্ড দ্য সেভেন ডবোর্ফস’ (১৯৩৭)-এর মতো সিনেমা ফ্যান্টাসির ভাষাকে আরও জনপ্রিয় করে। পরবর্তী সময়ে ‘জেসন অ্যান্ড দ্য আরগুনাটস’, ‘মেরি পপিনস’, ‘দ্য নেভারএন্ডিং স্টোরি’, ‘দ্য প্রিন্সেস ব্রাইড’, ‘লেভিরিন্থ’সহ নানা সিনেমা দর্শককে বাস্তবতার বাইরে নিয়ে যায়। তবে প্রযুক্তির অগ্রগতি ফ্যান্টাসি সিনেমার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটায় ১৯৮০–এর দশকের পর। উন্নত ভিজ্যুয়াল এফেক্ট, কম্পিউটার গ্রাফিক্স ও ডিজিটাল প্রযুক্তির কারণে বিশাল কাল্পনিক জগৎ পর্দায় নির্মাণ করা সম্ভব হয়।
* ফ্যান্টাসিরও আছে নানা রং
ফ্যান্টাসি সিনেমাকে একক কোনো ছাঁচে আটকে রাখা যায় না। এর রয়েছে বেশ কিছু উপধারা।
হাই ফ্যান্টাসি, সম্পূর্ণ কাল্পনিক জগৎ, রাজ্য, জাতি ও ইতিহাসকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়। ‘দ্য লর্ড অব দ্য রিংস’, ‘দ্য হোবিট’, ‘দ্য ক্রনিক্যালস অব নর্নিয়া’ এর উদাহরণ।
ডার্ক ফ্যান্টাসিতে ভয়, অন্ধকার ও অতিপ্রাকৃত শক্তির সঙ্গে ফ্যান্টাসি মিশে যায়। ‘প্যানস ল্যাভিরিন্থ’, ‘দ্য ডার্ক ক্রিস্টাল’ কিংবা অনেক ভৌতিক ফ্যান্টাসি এ ধারার।
ফোক বা লোকজ ফ্যান্টাসির ভিত্তি লোককথা, মিথ, কিংবদন্তি ও স্থানীয় বিশ্বাস। বাংলাদেশে এ ধারাটিই একসময় সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল।
এ ছাড়া পৌরাণিক ফ্যান্টাসি, ফ্যান্টাসি–অ্যাডভেঞ্চার, ফ্যান্টাসি–কমেডি, রোমান্টিক ফ্যান্টাসি, সুপারন্যাচারাল ফ্যান্টাসি এবং অ্যানিমেটেড ফ্যান্টাসিও বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়। ‘হ্যারি পটার’, ‘পাইরেটস অব দ্য ক্যারিবিয়ান’, ‘ফ্রোজেন’, ‘আলাদিন’, ‘বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্ট’, ‘মোয়ানা’, ‘অ্যাভাটার’ সবকটিই ভিন্ন ভিন্নভাবে ফ্যান্টাসির সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়েছে।
* বাংলাদেশে ফোক–ফ্যান্টাসির রাজত্ব
বাংলাদেশের মূলধারার সিনেমায় ফ্যান্টাসির সবচেয়ে জনপ্রিয় রূপ ছিল লোকজ বা ফোক–ফ্যান্টাসি। রূপকথা, রাজা–বাদশা, নাগ–নাগিনী, অলৌকিক শক্তি, দরিদ্র নায়ক, অত্যাচারী শাসক এবং অসম্ভব প্রেম–এসব গল্প একসময় হলভর্তি দর্শক টানত। সিনেমা গবেষণা ও বিভিন্ন আলোচনায় বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সিনেমার ইতিহাসে ফোক–ফ্যান্টাসির বড় ভূমিকার কথা উঠে এসেছে। এ ধারার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ ‘বেদের মেয়ে জোছনা’। তোজাম্মেল হক বকুল পরিচালিত ১৯৮৯ সালের এ সিনেমাটি শুধু জনপ্রিয়ই হয়নি, বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম বড় বাণিজ্যিক সাফল্যের উদাহরণ হয়ে আছে। লোককাহিনি, প্রেম, সামাজিক দ্বন্দ্ব ও ফ্যান্টাসির মিশেলে নির্মিত সিনেমাটি গ্রাম থেকে শহর, বিস্তৃত দর্শকশ্রেণিকে প্রেক্ষাগৃহে টেনেছিল। বাংলাদেশের ফোক–ফ্যান্টাসি সিনেমায় আলোচনায় এটিকে এখনো রেকর্ড ব্যবসাসফল সিনেমাগুলোর অন্যতম হিসাবে উল্লেখ করা হয়। এরপর ‘নাগ পূর্ণিমা’, ‘বিষে ভরা নাগিন’, ‘বিষাক্ত নাগিন’সহ নাগ–নাগিনীভিত্তিক অসংখ্য সিনেমা তৈরি হয়েছে। ২০০০ সালের ‘বিষাক্ত নাগিন’-এ শাকিব খান অভিনয় করেছিলেন; এটি বাংলা ফ্যান্টাসি হিসাবেও শ্রেণিবদ্ধ। অর্থাৎ ফ্যান্টাসি তখন কেবল শিল্পীসুলভ পরীক্ষা ছিল না, ছিল নিশ্চিত দর্শক টানার একটি বাণিজ্যিক কৌশল।
* কেন হারিয়ে গেল সেই ফ্যান্টাসি
২০০০–এর দশকে বাংলাদেশের সিনেমাশিল্প সামগ্রিকভাবেই সংকটে পড়ে। কম বাজেট, দুর্বল গল্প ও নিুমানের নির্মাণের কারণে দর্শক হলবিমুখ হতে থাকে। এর সঙ্গে বদলে যায় দর্শকের রুচিও। স্যাটেলাইট টেলিভিশন, ডিভিডি, পরে ইউটিউব ও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সিনেমা সহজলভ্য হয়। ফলে ‘হ্যারি পটার’, ‘দ্য লর্ড অব দ্য রিংস’, ‘দ্য ক্রনিক্যালস অব নর্নিয়া’, ‘পাইরেটস অব দ্য ক্যারিবিয়ান’, ‘অ্যাভাটার’, ‘ফ্রোজেন’ কিংবা মার্ভেলের ফ্যান্টাসি–সুপারহিরো জগতের সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠে বাংলাদেশের দর্শক। ফলে পুরোনো দিনের কৃত্রিম সেট, দুর্বল ভিজ্যুয়াল অ্যাফেক্ট ও একই ধরনের নাগ–নাগিনী বা রাজা–বাদশার গল্প দিয়ে দর্শক ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
* বিশ্ববাজারে ফ্যান্টাসি মানেই বড় ব্যবসা
ফ্যান্টাসি যে শুধু দর্শকের কল্পনাকে উসকে দেয় তা নয়, এটি বিশাল বাণিজ্যও তৈরি করে। ‘হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য ডেথলি হ্যালোস : পার্ট–২’ বিশ্বব্যাপী প্রায় ১.৩৪ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে। ‘দ্য লর্ড অব দ্য রিংস : দ্য রিটার্ন অব দ্য কিং’ আয় করেছে ১.১৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি। ‘ফ্রোজেন’, ‘ফ্রোজেন–২’, ‘বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্ট’, ‘আলাদিন’, ‘পাইরেটস অব দ্য ক্যারিবিয়ান’ ও ‘দ্য সুপার মারিও ব্রোস মুভি’-এর মতো ফ্যান্টাসিনির্ভর সিনেমাও বিলিয়ন ডলারের ক্লাবে জায়গা করে নিয়েছে। ২০২৫ সালে ‘নে ঝা–২’ ও ২.২ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করে সর্বোচ্চ আয়কারী ফ্যান্টাসি সিনেমার তালিকায় শীর্ষে উঠে আসে। এই সাফল্যের পেছনে শুধু গল্প নয়, বিশাল নির্মাণব্যয়, তারকা, ভিজ্যুয়াল অ্যাফেক্ট, ফ্র্যাঞ্চাইজি, পণ্য বিক্রি এবং বিশ্বজুড়ে বিপণনও গুরুত্বপূর্ণ।
* বাংলাদেশে কি আবার ফিরছে ফ্যান্টাসি?
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে ফ্যান্টাসি নতুন রূপে ফিরে আসার ইঙ্গিত মিলেছে। ২০২২ সালের ‘হাওয়া’ সরাসরি প্রচলিত ফ্যান্টাসি সিনেমা নয়; এটি রহস্য–নাট্য। কিন্তু লোকবিশ্বাস, মিথ, সমুদ্রের অজানা জগৎ এবং অতিপ্রাকৃত আবহের মিশ্রণ সিনেমাটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। মাত্র ২৪টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েও সিনেমাটি ব্যাপক সাড়া পায় এবং বিশ্বব্যাপী ১৬ কোটি টাকার বেশি আয় করে ২০২২ সালের সর্বোচ্চ আয়কারী বাংলাদেশি সিনেমায় পরিণত হয় বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ আছে। পরবর্তীতে অবশ্য আরও কিছু ফ্যান্টাসিনির্ভর সিনেমা নির্মিত হয়েছে, তবে সেগুলো সাফল্য পায়নি। সমস্যা অবশ্য দর্শকের অনাগ্রহে নয়; বরং প্রশ্নটি নির্মাণের মান ও গল্প বলার ধরনে। আজকের দর্শক ‘ফ্যান্টাসি’ দেখতে চায়, কিন্তু সেটি যেন বিশ্বাসযোগ্য জগৎ, শক্তিশালী গল্প ও আধুনিক নির্মাণভাষায় বলা হয়।
* ফিরে আসুক আমাদের নিজস্ব কল্পনার জগৎ
বাংলাদেশের ফ্যান্টাসির সবচেয়ে বড় সম্পদ বিদেশি জাদুর রাজ্য নয়, নিজস্ব লোককথা, মিথ, নদী, বন, বাউল–সংস্কৃতি, গ্রামীণ বিশ্বাস, মঙ্গলকাব্য, রূপকথা ও শত শত মুখে–মুখে–ফেরা গল্প। একসময় সেই উপাদান থেকেই তৈরি হয়েছিল জনপ্রিয় ফোক–ফ্যান্টাসি।
আজ প্রযুক্তি অনেক এগিয়েছে। গল্প বলার মাধ্যম বদলেছে। দর্শকের চোখও আগের চেয়ে অনেক বেশি অভিজ্ঞ। তাই পুরোনো ফর্মুলা ফিরিয়ে এনে নয়, বরং বাংলাদেশের নিজস্ব মিথ ও কল্পনাকে আধুনিক ভিজ্যুয়াল ভাষায় নতুন করে নির্মাণ করাই হতে পারে পথ।
ফ্যান্টাসি শেষ হয়ে যায়নি। বরং বাস্তবতার চাপে মানুষ যখন আরও বেশি করে অন্য এক জগতে আশ্রয় খোঁজে, তখন ফ্যান্টাসির প্রয়োজন হয়তো আরও বেড়েছে। দরকার শুধু এমন নির্মাতা, যিনি সেই দরজাটা আবার খুলে দিতে পারবেন, রূপকথার সেই দরজা, যেখান থেকে একদিন বাংলাদেশের দর্শক দল বেঁধে সিনেমাহলে ঢুকত।


