সূর্যের বহিঃস্থ বায়ুমণ্ডল (করোনা) কেন তার পৃষ্ঠদেশের চেয়ে বহুগুণ বেশি উত্তপ্ত এবং প্রতিনিয়ত বিপুল পরিমাণ শক্তি হারানোর পরও কীভাবে তা সেই উচ্চ তাপমাত্রা ধরে রাখে; বহু বছরের এই গভীর রহস্যের জট এবার খুলতে শুরু করেছে। ভারতের প্রথম মহাকাশভিত্তিক সৌর পর্যবেক্ষণ মিশন ‘আদিত্য–এল১’-এর সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করে ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এই রহস্যের গুরুত্বপূর্ণ সব সূত্র খুঁজে পেয়েছেন। স্বনামধন্য সাময়িকী ‘অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটার্স’-এ প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের বিশিষ্ট সৌর জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং এই গবেষণা দলের প্রধান অধ্যাপক আর রমেস জানিয়েছেন, সূর্যের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যকার তাপমাত্রার পার্থক্য পদার্থবিজ্ঞানের প্রচলিত নিয়মকে একপ্রকার চ্যালেঞ্জ জানায়। সূর্যের একদম কেন্দ্রে তাপমাত্রা প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু সেখান থেকে বাইরে এসে আমরা পৃথিবী থেকে যে পৃষ্ঠদেশ দেখি, তার তাপমাত্রা নেমে আসে মাত্র ৫,৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। আশ্চর্যজনকভাবে, এই পৃষ্ঠদেশ থেকে বহুদূরে অবস্থিত সূর্যের সর্ববহিঃস্থ স্তর করোনার তাপমাত্রা পুনরায় লাফিয়ে বেড়ে প্রায় ২০ লাখ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, যা ক্ষেত্রবিশেষে ৪ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত হতে পারে। অধ্যাপক রমেসের মতে, করোনার এই অঞ্চল থেকেই সৌরজ্বাল এবং করোনাল মাস ইজেকশনের (সিএমই) মতো চরম আবহাওয়াঘটিত ঘটনাগুলো ঘটে থাকে, যার মাধ্যমে সূর্য মহাকাশে বিপুল পরিমাণ শক্তি ছড়িয়ে দেয়।
এই সিএমইগুলোর কারণে একদিকে যেমন মনোরম মেরুপ্রভা তৈরি হয়, অন্যদিকে তীব্র ভূ–চৌম্বকীয় ঝড় সৃষ্টি হয়ে পৃথিবীর বিদ্যুৎ গ্রিড বিকল হতে পারে এবং যোগাযোগ ও আবহাওয়া উপগ্রহের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। সাধারণ বা কম সক্রিয়তার সময়ে সূর্য দিনে দুই থেকে তিনটি সিএমই উৎক্ষেপণ করে। তবে প্রতি ১১ বছর পর পর আসা সৌর সক্রিয়তার চরম পর্যায়ে দিনে ১০টি বা তারও বেশি সিএমই ঘটতে পারে। প্রতিটি সিএমই–র সাথে সূর্য যদি এভাবে বিপুল পরিমাণ শক্তি হারাতে থাকে এবং তা পুনরায় পূরণ না হয়, তবে সৌরজগতের প্রাণকেন্দ্র সূর্য তার সমস্ত শক্তি হারিয়ে ফেলবে এবং পৃথিবী চিরতরে জমে গিয়ে বরফে পরিণত হবে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটছে না, যার অর্থ হলো এমন একটি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে যার মাধ্যমে করোনা তার এই অবিশ্বাস্য উচ্চ তাপমাত্রা বজায় রাখতে সক্ষম হয়। বিজ্ঞানীরা এই শক্তি সরবরাহ ও নিয়ন্ত্রণের পেছনে দুটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন। প্রথমটি হলো, সূর্যের পৃষ্ঠদেশের উত্তাল বুদ্বুদ ও স্ফুটন গতি, যা ক্রমাগত তরঙ্গ সৃষ্টি করে ঢেউয়ের মতো বাইরের দিকে শক্তি বহন করে নিয়ে যায়। তবে দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণটি হলো, সূর্যের বায়ুমণ্ডলে পেঁচিয়ে থাকা চৌম্বক ক্ষেত্ররেখাগুলোর ক্রমাগত ছিঁড়ে যাওয়া এবং পুনরায় যুক্ত হওয়া। অধ্যাপক রমেস ব্যাখ্যা করেন যে, বেণীর মতো পেঁচানো এই রেখাগুলো যখন হঠাৎ ফেটে যায়, তখনই সিএমই ঘটে এবং মহাকাশে বিশাল চৌম্বকীয় প্লাজমা ও গ্যাসের মেঘ ছিটকে বেরিয়ে যায়।
এগুলো সাধারণত সৌরকলঙ্কের কাছাকাছি তৈরি হয়, যা শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রবিশিষ্ট তুলনামূলক শীতল ও অন্ধকার অঞ্চল। কিন্তু বিস্ফোরণের পর এই রেখাগুলো আবার দ্রুত একীভূত হয় এবং সূর্য মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার হারিয়ে যাওয়া শক্তি পুনরায় পূরণ করে নেয়। গবেষক দলটি নিশ্চিত করেছে, শক্তি জোগানোর ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ব্যবস্থাটিই সিংহভাগ ভূমিকা পালন করে। সূর্যের পৃষ্ঠের স্ফুটন গতির কারণে সৃষ্ট তরঙ্গ শক্তি পরিবহন করলেও তা করোনার মোট প্রয়োজনীয় শক্তির মাত্র ৭ শতাংশ সরবরাহ করে। আর বাকি ৯৩ শতাংশ শক্তিই আসে চৌম্বক ক্ষেত্ররেখাগুলোর পুনর্গঠন ও পুনঃসংযোগের মাধ্যমে।
এই হিসাব নিশ্চিত করতে বিজ্ঞানীরা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ঘটে যাওয়া একটি অত্যন্ত শক্তিশালী সিএমই পর্যবেক্ষণ করেন, যা আদিত্য–এল১–এর বিশেষ যন্ত্র ‘ভেল্ক‘ (ভিজিবল এমিশন লাইন করোনাগ্রাফ)-এ রেকর্ড করা হয়। তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সিএমই ঘটনার মাত্র ১০ ঘণ্টার মধ্যে প্যাঁচানো চৌম্বক রেখাগুলো আবার তাদের পূর্বের স্থানে ফিরে আসে, একে অপরের সাথে সংযুক্ত হয় এবং করোনার শক্তিকে পুনর্গঠিত করে। অধ্যাপক রমেস উল্লেখ করেছেন, এই গবেষণা সূর্যের বায়ুমণ্ডলে সম্ভাব্য শক্তি উৎপাদন প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ অনুসন্ধানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি প্রস্তুত করেছে, যা বিজ্ঞানের লজিক–সংক্রান্ত কিছু মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দিতে সহায়ক হবে।



