মার্কিন থিঙ্কট্যাংক ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ব্যবস্থা কার্যকর হলে ইরান বছরে প্রায় ১৩৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত নিট মুনাফা অর্জন করতে সক্ষম হবে। ইরানের জন্য সম্ভাব্য বিশাল অর্থনৈতিক সুযোগের দ্বার উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত ফি বা টোল আদায়ের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে দেশটি বিশ্বের অন্যতম লাভজনক জলপথের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ পেতে পারে। এই বিশাল অংকের রাজস্ব আয়ের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি বিশ্বের প্রযুক্তি জায়ান্টদের পেছনে ফেলে দিকতে পারে। পরিসংখ্যান বলছে, যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমা বিশ্বের বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বাৎসরিক মুনাফাকেও ছাড়িয়ে যাবে ইরানের এই সম্ভাব্য আয়।
এমনকি সৌদি আরবের তেল জায়ান্ট আরামকোর মুনাফাকেও পেছনে ফেলতে পারে তেহরানের এই নতুন অর্থনৈতিক উৎস। সাম্প্রতিক বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে মার্কিন সামরিক বাহিনীর দীর্ঘপাল্লার অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র ইন্টারসেপটর প্রায় ফুরিয়ে আসার খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী কোনো সংঘাতে জড়ানোর মতো সক্ষমতা বা জোরালো কৌশলগত অবস্থান এই মুহূর্তে ওয়াশিংটনের নেই। এমন বাস্তবতায় মার্কিন প্রশাসনের সাথে তেহরানের সম্ভাব্য যেকোনো সমঝোতা বা চুক্তি স্বাভাবিকভাবেই ইরানের অনুকূলে যাওয়ার জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত জুন মাসে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। ওই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, প্রাথমিক একটি নির্দিষ্ট সময় পর হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা ও সামুদ্রিক সেবার বিষয়ে ওমানসহ উপসাগরীয় অন্যান্য দেশের সাথে আলোচনা করার কথা রয়েছে।
এই ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে ইরান প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে সার্ভিস ফি বা টোল আদায়ের পথ প্রশস্ত করছে। হরমুজ বিশ্ব বাণিজ্যের অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ একটি রুট। বৈশ্বিক তেল ব্যবহারের প্রায় একপঞ্চমাংশ এবং সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের সিকিভাগ এই প্রণালী দিয়েই যাতায়াত করে। ফলে এখানে সামান্য নিয়ন্ত্রণ বা টোল আদায়ের সুযোগ পেলেই তা যেকোনো দেশের অর্থনীতিতে বিরাট পরিবর্তন আনতে পারে। আন্তর্জাতিক আইন বা জলসীমা সংক্রান্ত বিধানের প্রশ্ন থাকলেও, তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে অনেক দেশই এই ফি পরিশোধ করতে রাজি হচ্ছে বলে জানা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই টোল ব্যবস্থার কারণে তেলের দাম ও সামুদ্রিক বিমার খরচ আরও বেড়ে যেতে পারে। আর তেলের দাম বাড়লে কার্গোর মূল্য অনুপাতে ইরানের আদায় করা ৫ থেকে ৭ শতাংশ ফি–এর পরিমাণও আরও বৃদ্ধি পাবে। অর্থাৎ তেলের বর্ধিত মূল্যের সাথে সাথে তেহরানের রাজস্ব আয়ও দ্বিগুণ গতিতে বাড়তে থাকবে, যা দেশটির অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে। শুধু জলপথের টোল আদায়ই নয়, বরং জুনের ওই সমঝোতা স্মারকের আওতায় ইরানের জন্য আরও বড় আর্থিক সহায়তার সংস্থান রাখা হয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানের পুনর্গঠন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য আঞ্চলিক অংশীদারদের সাথে মিলে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোতে আটকে থাকা ইরানের অবরুদ্ধ তহবিলও পর্যায়ক্রমে উন্মুক্ত করার শর্ত রয়েছে।



