চলচ্চিত্র থেকে দীর্ঘদিন ধরে দূরেই আছেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী শাবনূর। ২০১৩ সালে পরিবারসহ অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে সেখানেই প্রবাস জীবনযাপন করছেন। মাঝেমধ্যে দেশে এলেও চলচ্চিত্রে আবার নিয়মিত হবেন এমন ইচ্ছা আর কখনই প্রকাশ করেননি। সম্প্রতি মুঠোফোনে সুদূর অস্ট্রেলিয়া থেকে বাংলাদেশ প্রতিদিনের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘আমার একমাত্র পুত্র আইজানকে যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতেই এখন পুরো সময়টা কাজে লাগাচ্ছি। তাই চলচ্চিত্র নিয়ে আপাতত আমার কোনো পরিকল্পনা নেই।’ শাবনূরের বলা কথা তুলে ধরেছেন –আলাউদ্দীন মাজিদ
অভিনয় থেকে দূরে আছেন, সময় কাটছে কীভাবে?
আসলে দেখুন, ১৯৯৩ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করি। টানা দেড় যুগ এ মাধ্যমে কাটিয়ে দিয়েছি। আমার দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের কথা ভেবে এই শিল্পকে সমৃদ্ধ করতে নিজের সুখশান্তির কথা কখনই তখন চিন্তা করিনি। রাতদিন শুধু অভিনয় আর অভিনয় করে গেছি। ওই টানা সময়ে একটু বিশ্রাম নেওয়ার সময় পর্যন্ত পাইনি। একটা সময় এসে মনে হলো আমিও তো একজন মানুষ, একদিন পৃথিবী ছেড়ে সবার মতো আমাকেও চলে যেতে হবে। তাই এবার নিজের জীবনের দিকে তাকানো দরকার। তা ছাড়া নতুনদের জন্যও পথটা ছেড়ে দেওয়া উচিত। সব মিলিয়ে একসময় সংসার–সন্তান নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। এখন আমার একমাত্র লক্ষ্য হলো, পুত্র আইজানকে যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। তাই তার পড়াশোনা, তাকে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো, মোটকথা তাকে নিয়েই এখন আমার সুন্দর সময় কেটে যাচ্ছে।
পুত্র আইজানকে চলচ্চিত্রে আনার কোনো চিন্তাভাবনা কি আছে?
না, আমি মোটেও তাকে নিয়ে এমন চিন্তা করি না। আমার ইচ্ছা ও ইঞ্জিনিয়ার হবে। সেভাবেই ওকে গাইড করছি। ছাত্র হিসেবে ও যথেষ্ট মেধাবী। তাই আমি চাই আইজান সত্যিকারের যোগ্য মানুষ হয়ে গড়ে উঠুক।
অনেক অভিনেতা–অভিনেত্রীই তো সন্তানদের নিজের পেশায় নিয়ে আসেন, আপনি কেন ভিন্ন চিন্তা করছেন?
দেখুন, এখন কি আগের মতো চলচ্চিত্রের প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ আছে। এখন বিনোদনের প্রচুর মাধ্যম হয়েছে। বলতে গেলে প্রযুক্তির উন্নয়নের কারণে বিশ্ব বিনোদন এখন মানুষের হাতের মুঠোয়। তাই আগের মতো অভিনয় করে এখন সচ্ছল হওয়ার অবস্থা আর দেখছি না। দ্বিতীয়ত, আমি যে পেশায় ছিলাম সে পেশায় আমার সন্তানও যে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে তা কিন্তু ভাবার সুযোগ নেই। দেশে বিদেশে অনেক শিল্পীই আছেন যারা তাদের সন্তানদের অন্য পেশায় নিয়ে গিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আমাদের দেশেও এমন উদাহরণ প্রচুর আছে, শাবানা কিংবা ববিতা ম্যাডামের বিষয়টি দেখুন। উনারা কি উনাদের সন্তানদের অভিনয়ে এনেছেন? না, আমার আদর্শ কিন্তু উনারা দুজনই। বিশেষ করে ববিতা ম্যাডামের জীবনের সঙ্গে আমার জীবনের অনেকটা মিল আছে। উনিও সিঙ্গেল মাদার, আমিও তাই। উনি তাঁর একমাত্র পুত্র অনীককে চলচ্চিত্র জগতে না এনে বিদেশে পড়াশোনা করিয়ে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে গড়ে তুলেছেন। উনি পুত্রের সুখের জন্য নিজের জীবনের তোয়াক্কা করেননি। স্বামীর মৃত্যুর পর শুধু পুত্রকে যোগ্য মানুষ করে গড়ে তুলতে অনেক সেক্রিফাইস করেছেন। আজ উনার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। আসলে উনার কাছ থেকে শেখার অনেক কিছু আছে। তাই আমিও ববিতা ম্যাডামের পথ ধরে সন্তানকে নিয়ে হাঁটছি এবং বাকি জীবনটাও তাঁকে অনুসরণ করেই হাঁটতে চাই।
তাহলে নতুন জীবন শুরু, মানে বিয়ের পিঁড়িতে আর বসছেন না?
দেখুন, বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে বনিবনা না হওয়া যেকোনো নারীর জন্য সুখকর অভিজ্ঞতা নয়। তাই স্বামীকে ডিভোর্স দিতে হয়েছে আমার। এরপর বিয়ে নিয়ে আমার আর আগ্রহ না থাকার পেছনে প্রধান কারণ আমার সন্তান। আইজানকে মানবিক মূল্যবোধের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাটাই আমার আপাতত স্বপ্ন, চিন্তা। ওর যোগ্য মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠার এ সময়টায় আমাকে ওর সবচেয়ে বেশি দরকার।
গত বছর একবার অল্প সময়ের জন্য দেশে এসেছিলেন, কথা ছিল চলতি বছরের জানুয়ারিতে আবার আসবেন, কিন্তু চলে গেলেন যুক্তরাষ্ট্রে, কেন?
আসলে, সত্যি কথা বলতে এ সিদ্ধান্তের পেছনে বড় ভূমিকা ছিল আইজান নেহানের। ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ও কোথায় যেতে চায়, সে বলল আমেরিকা। তা ছাড়া আমার দীর্ঘদিনের পরিচিত ঘনিষ্ঠজন এবং চলচ্চিত্রসঙ্গীদের অনেকেই এখন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বাস করছেন। সহকর্মীদের কয়েকজন দীর্ঘদিন ধরেই অনুরোধ জানাচ্ছিলেন, আমি যেন একবার আমেরিকায় বেড়াতে আসি। ছেলের আগ্রহ আর সহকর্মীদের টান, দুটি মিলেই যাওয়াতে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে না এসে আইজানকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রেই উড়াল দিই। হ্যাঁ, এই সফরের পেছনে আরেকটা কারণ ছিল, সেটি হলো অনেক দিন ধরে আমার ইচ্ছা ছিল স্নোফল দেখার। এবার সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। টানা কয়েক দিন দেখার সুযোগ হয়েছে।
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে নানা গুঞ্জনের মুখে পড়েছিলেন, তখন মনের অবস্থা কেমন ছিল?
না, আমি এসব কখনই পাত্তা দিইনি। যদি এসব নিয়ে মাথা ঘামাতাম তাহলে অভিনেত্রী শাবনূর হতে পারতাম না। আসলে, নায়ক–নায়িকার জনপ্রিয়তা মানে, তাঁকে নিয়ে আলোচনা হবে, সমালোচনা হবে। গুঞ্জন হবে। জনপ্রিয় তারকাকে ঘিরে গালগল্প শুনতেও ভক্ত এবং সাধারণ মানুষের ভালোই লাগে। আমি কোনো দিন গুঞ্জন নিয়ে বিচলিত ছিলাম না। আমি মনে করি, যে তারকার জনপ্রিয়তা যত বেশি, তাঁকে ঘিরেই সবচেয়ে বেশি আলোচনা–সমালোচনা থাকবেই। তাই আমার মনে এসবের কোনো প্রভাব পড়েনি।
সবশেষে আবারও জানতে চাইব, দেশে আসছেন কখন?
সেটা তো এখনই কনফার্ম করে বলতে পারব না, কারণ, আইজানের স্কুল খোলা, ওর পড়াশোনার ক্ষতি হোক সেটি আমি চাই না। ওর আর আমার জন্য সুন্দর সময় বের করে তারপরই কোনো একসময় দেশে আসব, বেশ কিছুদিন থাকব, চলচ্চিত্রজগৎ ও এর বাইরের আপনজনদের সঙ্গে মধুর সময় কাটাব।



