সম্পাদকীয় কলাম লিখতে বেশ চাপ বোধ করছি। সহ–সম্পাদকগণের দ্বারস্থ হওয়া যেতো। আসলে তাদেরও দায়িত্ব রয়েছে এ–কলমের ওপর, আর সে জন্যই তাদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে দামি দামি কলম। তবে কথায় বলে, গৃধিনী শকুন ছুঁয়ে না দিলে না–কি অন্যারা একে অপরের দেখাদেখি করতে থাকে।
সম্পাদকীয় বলতে যা–কিছু বোঝায় তা আগে বুঝতে হবে। সম্পাদকের দপ্তরে যা–কিছু ঘটে তা নিয়ে লিখলে কী সম্পাদকীয় হবে? অথবা দেশের বৃহত্তর সমাজে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি নিয়ে লেখা কি সম্পাদকীয় হবে? ক্ষুদে সম্পাদক হিসেবে আমার মনে হয়, গোটা সমাজকে নাড়া দেবার মতো ঘটনা নিয়ে রটনা, জল্পনা, কল্পনা এবং শিক্ষা, সংস্কার ও গঠনমূলক আলোচনা–সমালোচনা হবে প্রত্যেক সম্পাদকের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য।
সম্পাদকীয় নিয়ে ভাবছি, ইতোমধ্যে ‘গুডমর্নি’ সম্ভাষণ জানিয়ে দফতরে প্রবেশ করলেন পঁচাত্তরোর্ধ এক আমির। আমি বলছি এ–কারণে, তিনি সচরাচর দেশ–বিদেশে তবলিগ করে বেড়ান। তাঁর ধারণা, কোনো শব্দ সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে না জানলে ঐশী ফায়দা অর্জিত হতে পারে না। দৃষ্টান্ত হিসেবে তার মনোনীত শব্দচয়ন থেকে ২/১টি তুলে ধরা হলো : মাংস শব্দের পরিবর্তে ‘গোসত’ বলা না হলে বা জল শব্দের পরিবর্তে ‘পানি’ ব্যবহার না করা পর্যন্ত তিনি অন্নজল স্পর্শ করতে নারাজ।
আমরা মূল্যায়নে জীবন ও ভাষা যেন আধেয়, উপাদান এবং তা বহনকারী পাত্র। মানুষের জীবন টিকিয়েং রাখতে চাই নানা প্রকার উপাদান। পরমকরুণাময় আল্লাহপাক মানুষের কল্যাণে তা সৃষ্টি করে রেখেছেন মানব সৃষ্টির বহু পূর্বে। আধার দিয়ে আমরা জীবন ধারণ করি না, বরং আধেয় দিয়ে। আধেয় বা উপাদান স্থানান্তর জন্য অবশ্যই আঁধারের প্রয়োজন, আর ওই বিষয়ের আগাম খবর পৌঁছাতে অবশ্যই ভাষার প্রয়োজন পড়ে। কোনো ভাষা ‘সুসমাচার’ বা ‘এড়ড়ফ ঘব’িং’ নয়, বোধকরি তা সকলেই বুঝতে পারেন। ভাষা দিয়ে মানুষের দুর্গতি লাঘব হয় না। মানুষের চাই প্রয়োজনীয় উপাদান, যা একমাত্র আল্লাহপাকের হাতে গড়া। কোনো ক্ষুধার্ত ব্যক্তি ভাষা খেয়ে জীবনযাপন করে না, একইভাবে ভাষার ওপর দখল থাকার ফলে খোদার অতি কাছে পৌঁছা যাবে, তেমন ধারণাও সত্য নয়। খোদার সান্নিধ্য লাভ করতে, চাই একটি অনুতপ্ত হৃদয়। মানুষের মনের পরিবর্তন যাদ না–ই হলো তবে হাজারো ভাষায় ডক্টরেট নিয়ে কোনো পূজায় লাগানো যাবে?
জীবন ও জীবন্ত আশা–ভরসার কথা বলার জন্যই ভাষার প্রয়োজন আর ভাষা সৃষ্ট হয়েছে মানুষের হাতে, মানুষের প্রয়োজনে। পৃথিবীতে প্রচলিত ভাষার মধ্যে একটি ভাষাও খোদার মনোনীত বা পছন্দের ভাষা নয়। খোদার যা–কিছু পছন্দের তা হলো সরল অন্তকরণ, অনুতপ্ত হৃদয়। যে হৃদয়ে খাঁটি মহব্বত থাকে, খোদা তেমন স্বচ্ছ হৃদয়ে বাস করেন, কারণ খোদা নিজেই মহব্বত। প্রতিটি মানুষ মানুষের কাতারে যে–দিন দাঁড়াতে পারবে সে–দিন হবে সুসমাচার প্রচারের প্রকৃত সার্থকতা।
অধিক জনতার চাপে জনতা দিশেহারা, দেশ হয়ে পড়েছে ন্যুব্জ। বেকারত্বের অভিশাপে শিক্ষিত যুবসম্প্রদায় সিদ্ধান্তহীণতায় ভুগছে, বেছে নিচ্ছে অসামাজিক পেশা, ক্রমে ক্রমে জড়িয়ে পড়ছে সন্ত্রাসী কর্মাকাণ্ডে। সরকারি বেসরকারি দপ্তরগুলোতে বলতে গেলে কর্মখালি নেই, তার পরও ২/৪টা যা আছে তাও পেতে মোটা অঙ্কের সেলামি দিতে হয় কর্তাব্যক্তিদের। ভাব দেখে মনে হয় ব্যবসা–বাণিজ্যে মূলধন খাটানো হচ্ছে। তবে এ প্রভাবের কুফল হলো, যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে কাজে ঢোকে, নিয়োগের পর তার বহুগুণ আদায় করার ফন্দি ও সুযোগ খুঁজতে থাকে।
বর্তমান সমাজকে সামগ্রিকভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মানুষ মানুষকে বধ করছে, অপরাধে জীবনযাপন করছে, সমাজে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে চলছে। এ–অবস্থার পরিবর্তন সাধন করতে পারেল সমস্ত বাগ্মিতার সার্থকতা ঘটবে।
যুব সম্প্রদায়ের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস রেখে তারেদ দায়িত্বপূর্ণ কাজে নিয়োগ দানের জন্য যোগ্য শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা দিতে হবে। নর–নারী সমান মর্যাদা ও অধিকার পেলে আমাদের দেশের পুরো শক্তি কাজে লাগানো সম্ভব হবে। আর তা–ই হবে বেকারত্ব ও দারিদ্র বিমোচরণে উন্মুক্ত পথ।


