পাক–কালামে একটি অংশ রয়েছে যাকে খোদার প্রতিজ্ঞা বলে আখ্যায়িত করা হয়, আর তা হলো ২বংশাবলী ৭ : ১৩–১৪ “যখন আমি আকাশ বন্ধ করে দেব আর বৃষ্টি পড়বে না… অবস্থা ফিরিয়ে দেব।”
মাবুদ, যিনি আসমান জমিন জুড়ে রাখেন সর্বময় ক্ষমতা, তিনি এক বিশেষ সুমহান পরিকল্পনা নিয়ে আকাশ মন্ডল ও পৃথিবী নির্মাণ করেছেন, আর তা জনপূর্ণ ও প্রাণীকুলে পরিপূর্ণ করার জন্য সার্বিক প্রাণী সৃষ্টি করলেন; আর তাবৎ সৃষ্টির মধ্যে স্বীয় প্রতিনিধি অর্থাৎ অদৃশ্য খোদার দৃশ্যমান প্রতিভু হিসেবে সৃষ্টি করলেন মানবজাতি। মানুষের উপর তিনি তুলে দিলেন গোটা বিশ্বের সার্বিক দায়িত্ব, রক্ষাবেক্ষণ ও সুচারুরূপে পরিচালনা দান। খোদা হলেন করুনার পারাবার। নেই যার আহার নিদ্রা দিবানিশি সজাগ সচেতন, নেগাবান থাকেন আপন সৃষ্টির কল্যাণ সাধনে।
মানুষকে তিনি ঘোষণা দিলেন সৃষ্টির স্রেষ্ঠ জীব হিসেবে, তথাস্তু প্রজ্ঞা, ধার্মিকতা, পবিত্রতা প্রজননের ক্ষমতায় করলেন তাদের পরিপূর্ণ, অবশ্য তিনি সকল প্রাণীকুল আপন আপন সংখ্যা বৃদ্ধি দান করার ক্ষমতায় করলেন ক্ষমতাবান। ক্ষমতার সাথে মমতাও জুড়ে দিলেন যেন নিজ নিজ সন্তানের প্রতি রাখে স্নেহ যত্ন অসীম ধৈর্য। একটি নাবালক শিশুকে গড়ে তোলার জন্য, উপযুক্ত কর্মক্ষম করার জন্য চাই স্নেহ, মমতা, যত্ন, অনুশাসন। কচিপুলি দুই আগুল দিয়ে রোপন করা হয়, যথাযথ যত্ন আদরে এক সময় তা বিশাল মহীরূহে হয়ে ওঠে পরিণত। বিষয়টি সকলের কাছে থাকবে সুপরিজ্ঞাত! শৈশবকালে ঝড়ঝঞ্জার কবল থেকে বাঁচার তাগিদে যে সাপোর্ট দেয়া হয়ে থাকে, পরিপূর্ণ বয়সে উত্তীর্ণ হবার পর তাকে আর তেমন সহায়তা দেবার প্রয়োজন পড়ে না। উপরন্তু, উক্ত মহীরূহের তলে বিপন্নাবস্তায় সকলে এসে আশ্রয় নিতে পারে। খোদা পরম করুনাময়; তিনি বিধ্বংসী গোলাবারুদ নন। আপন সৃষ্টি কল্যাণ সাধনে থাকেন সদা তৎপর। তিনি চিরঞ্জিব চির জাগ্রত আশ্রয় ও বল। অবশ্য বিপন্ন অবস্থায় যারাই তাঁর পরিচয় লাভ করেছেন, তারাই দিতে পারে যথাযথ বর্ণনা; তাদের কলমের কালি যখন ফুরিয়ে যায়, তখনও তারা লিখে চলে, স্বীয় অশ্রুজলে। বিষয়টি কতইনা অদ্ভুত! ছোট্ট একটি গানের পংক্তি মনে ভেসে উঠলো, চোখের জলে যদি হয় ছোট্ট নদী; ভাসিয়ে দিতাম তারে তোমায় স্মরণ করে। কতইনা তৃপ্তিদায়ক উক্তি!
মানুষ ভুলের শিকার! প্রথম মানুষটি বা বলতে পারেন প্রথম জোড়া মানবদ্বয় চরমভাবে প্রতারিত হলো অভিশপ্ত ইবলিসের ফটকা যুক্তিতে ক্ষিপ্ত করে তুললো খোদাদ্রোহী এক অপশক্তিতে পরিণত করে ছাড়লো। যেক্ষেত্রে মানুষ হলো খোদার হাতে গড়া তারই গৌরবার্থে মনোনীত অবিকল প্রতিভু, তেমন ক্ষেত্রে তাদের ভুলিয়ে দিল আদি পরিচয়, স্বাধীকারের লোভ দেখালো, স্বনির্ভর হবার মানসে! বলুন সৃষ্ট কোনো কিছু স্রষ্টার অনুকুলে না গিয়ে কি করে বিপরীতে চলবে। আপনার রচিত বাগানে রয়েছে আপনার পূর্ণ অধিকার, আসলে এক বিশেষ পরিকল্পনা নিয়েই তবে রচনা করেছেন নয়নকাড়া মনোরম বাগানটি; শত্রু এসে তো যত্ন করতে পারে না, তার কাজ হলো চুরি, খুন ও নষ্ট করা। কালামপাকে তেমন আভাস দেখা যায়; চোর আসে চুরি, খুন ও নষ্ট করে দেবার জন্য।
বর্তমানকার ধর্মীয় কর্মকান্ডের দিকে দৃষ্টি দানের জন্য অনুরোধ করছি। কোনো কয়েদি যেমন সম্পূর্ণ ব্যর্থ নিজেকে অবমুক্ত করার জন্য, ঠিক একইভাবে পতীত আদমের সন্তানদের পক্ষেও স্বীয় কলুষতাপূর্ণ ক্ষুত বিশিষ্ট ধার্মিকতা দিয়ে খোদার রেজামন্দি লাভ করা সম্পূর্ণ অসম্ভব। খোদা পরিষ্কার দেখিয়ে দিয়েছেন, গুনাহগারদের ধার্মিকতা খোদার কাছে মলিন পুতিগন্ধময় নেকড়া সমতুল্য। তিনি বারবার নবী–রাসুল প্রেরণ করেছেন, তাপিদ দিয়েছেন পাপ থেকে মন ফিরাতে, তওবা করতে। অপব্যায়ীপুত্র যেমন তওবা করে ফিরে আসলো পিতার ক্রোড়ে, ঠিক একইভাবে আজ তাদের চুড়ান্তভাবে অনুতপ্ত হতে হবে। নবীদের মাধ্যমে তিনি বারবার প্রেরণা যুগিয়েছেন, মন ফিরাবার জন্য, ইবলিসকে পরিহার করার জন্য; নিজেদের ক্ষুদে শক্তির উপর নির্ভরতা পরিত্যাগ করে খোদার হাতে সমর্পিত হবার স্বপ্রনোদিত হবার জন্য। কিন্তু ইবলিসের শিক্ষা ও প্রেরণা হলো সম্পূর্ণ বিপরীত, সম্পূর্ণ উল্টো। যদিও মানুষের ধার্মিকতা সম্পূর্ণ উচ্ছন্নে যাওয়া, অকেজো বলে প্রমাণিত, বিশেষ করে দশ শরিয়তের আলোকে দেখা গেলে, মানুষে অবস্থান ঘৃণিত এক অপশক্তি, পরিষ্কার খোদাদ্রোহী। তারপরেও অনুতপ্ত না হয়ে স্বীয় প্রজ্ঞা ও শক্তির উপর তারা দাঁড়িয়ে আছে, প্রতিযোগীতা করে চলছে নিজেদের শক্তিতে নিজেদের পাকপবিত্র করার মানসে, পাপের সাগর থেকে পরিত্রাণ লাভ করার জন্য, আর তেমন প্রচেষ্টা নিরবধি চালাতে গিয়ে মুর্খের দল নিজেদের হাত রাঙ্গিয়ে নিচ্ছে ভ্রাতার রক্তে!
প্রবণতা দেখে বুঝতে বাকী থাকলো না, অদ্যাবধি তারা রয়েছে ইবলিসাশ্রিত, ইবলিসের কব্জা বন্দি। নিজেরা নিজেদের জন্য পাঁচ খুটি বিশিষ্ট গৃহ নির্মাণ করে সুরক্ষিত ভেবে প্রমাদ লাভ করছে। অথচ খোদা তাদের জন্য এক সুমহান গৃহ নির্মান করে রেখেছেন, যার মধ্যে প্রবেশাধীকার রয়েছে তাবৎ জনমানবের, নিয়ত ঘোষিত হচ্ছে উদাত্ত আহ্বান, সকল পরিশ্রান্ত ভারাক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি, সকল আদম সন্তানদের প্রতি দত্ত ঐশি উপহার, দাতব্য দান যার মধ্যে ডুবে যাবে বিশ্বের সকল প্রকার লোকজন। মাবুদ জানেন, মানুষের মধ্যে দুষ্ট সৃষ্ট বিভাগ কেবল পাপের কুফল। সর্পাঘাতে মুমুর্ষ ব্যক্তির শরীর থেকে বিষটুকু অপসারণ করা সম্ভব হলে উক্ত ব্যক্তি পুনরায় সুস্থ হবে; ফিরে পাবে হারানো শক্তি ও বল, যা কতইনা স্বাভাবিক। পাক–কালামে তাই দেখা যায়, “অতএব এখন, যারা মসিহ ঈসাতে আছে তাদের প্রতি কোন দন্ডাজ্ঞা নেই” (রোমীয় ৮ : ১)।
গুনাহগারদের কৃচ্ছ্রতা করতে দেখে পাগলের অপপ্রচেষ্টার কথা মনে পড়ে। অন্ধ ব্যক্তি স্বাভাবিক কাণে হাতড়ে বেড়ায়। তবে সে যখন স্বীয় দৃষ্টি শক্তি ফিরে পায় তারপর ইচ্ছেমত ছুটতে পারে, ছুটে থাকে। কালামপাকে অবশ্য এমন এক দৃষ্টান্ত রয়েছে, অন্ধ বরতীমুস যখন দৃষ্টি ফিরে পেল মসিহের পরশে, তখন তার অনন্দ তাকে উদ্বেলিত করে চললো, গানের সুরে শোনা যায়, “অন্ধ ছিলাম দেখিতে পেলাম, সুন্দর প্রভু মোর, তোমার পরশে চিনেছি তোমাকে মুছে দিলে আখিলোর”।
আমার মনে হয়, এক সময়, কোন না কোনো দিক দিয়ে, আমরা প্রত্যেকে অন্ধ ছিলাম, তবে প্রেমের পরাকাষ্টা আত্মত্যাগী মসিহের পরশে আমাদের অন্ধত্ব ও অহমিকা সম্পূর্ণ উবে গেল। বুঝতে পারলাম নিজেদের পাকপবিত্র করার সার্বিক অনুমোদিত বিধি বিধান পরামর্শ কেবল নিজেদের ঘাটতি প্রমান করা জন্যই কাজ করে থাকে; যেমন দশ আজ্ঞা: চুরি করো না, খুন করো না, জেনা করো না ইত্যাদি। তবে ইতোমধ্যে যে ব্যক্তি ঐসকল জঘন্য কাজে হয়ে উঠেছে পারদর্শী তার জন্য উপায় কি হবে? মৃত ব্যক্তির জন্য অবশ্যই একটি পথ খোলা আছে, আর তা হলো পুনরুত্থান! সকলে পাপ করেছে, সকলেই পাইকারীহারে খোদার পবিত্রতা হারিয়ে ফেলেছে; অসহায় নিরুপায়, অনন্ত অগ্নিশীখা যাদের জন্য হয়ে আছে প্রস্তুতকৃত, তাদের জন্য অপেক্ষমান খোদার পক্ষ থেকে এক বিশেষ রহমতের দুয়ার, যা কেবল পূতপবিত্র খোদার জীবন্ত কালাম ও পাকরূহের মানবরূপ প্রকাশ, কোরবানীকৃত ঐশি মেষ, খোদাবন্দ হযরত ঈসা মসিহ। তিনিই উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন সকল পরিশ্রান্ত আশাহত দুর্ভাগা জনগোষ্টিকে, তাঁর কাছে ছুটে আসার জন্য, তাঁর হাত থেকে দাতব্য মুক্তি গ্রহণ করার জন্য, পুনরায় মানুষের মত মানুষ হবার জন্য। যারাই তাঁকে আন্তরিকভাবে বিশ্বাসপূর্বক গ্রহণ করেছেন তাদের তিনি ফিরেয়ে দিয়েছেন সম্পূর্ণ বেগুনাহ আনন্দপূর্ণ জীবন। মসিহের পরশে সকলে পরিণত হয়েছে দুনিয়ায় নূরে, তারাই ব্যস্ত অন্ধকার দূর করার অভিযানে।
পবিত্রতা বা ধার্মিকতা কোনো ব্যক্তির নিজস্ব অর্জনের বিষয় হতে পারে না। সকলেই সমানভাবে পরাভুত। পবিত্রতা ও নতুন জীবন লাভ করা কেবল সাধিত হয়েছে খোদার হাতে, মসিহ বিশ্ববাসির জন্য নিজের প্রাণ করেছেন কোরবান; আদম সন্তানদের পাপের বোঝা তিনি স্বীয় স্কন্ধে বহন করে নিজে হলেন কোরবানি, যা উপলব্ধি করা আমাদের কোনো মেধায় ধরা পড়ার কথা নয়। ক্ষুদে স্বার্থান্ধ মানুষ আমরা, পান থেকে চুনটুকু খসে গেলে চেঁচিয়ে ওঠা মানুষ আমরা, লঙ্কাকান্ড বাধিয়ে বসি, স্বীয় যুক্তির বিপরীতে যুক্তি দাড় করতে দেখে শানিত তরবারি নিয়ে তেড়ে যাওয়া আমাদের স্বভাবে পরিণত। ব্যক্তি যদি নিজের অক্ষমতা ব্যর্থতা অনুধাবণ করতে না পারলো তবে তার জন্য তো সুপরামর্শ কার্যকর হবার নয়। নিজেদের ব্যর্থতা ঢেকে রাখার জন্য যারা শততঃ ব্যস্ত, স্বনির্বাচিত ধার্মিকাতার রোজনামচা চালিয়ে যেতে, নিজেরা নিজেদের খোড়া যুক্তি দিয়ে পেতে চায় পরিত্রাণ, তাদের জন্য কেবল অপেক্ষা করছে দোজখের অনির্বাণ অনল।
মসিহ তাই অভয়বাণী ঘোষণা করেছেন, মথি ৪ : ১৭, যোয়েল ২ : ১৩, লুক ১৫ : ৭, প্রেরিত ১৭ : ৩০, ২ : ৩৮


