পৃথিবীতে নারী নিয়ে যতোটা কলহ হয়েছে তার চেয়ে কোনো অংশে কম হয়নি ধর্ম নিয়ে। ধর্মের নামে অজস্র হানাহানি ঘটেছে এবং ঘটে চলছে। ধর্ম প্রচারের নামে একশ্রেণীর ফড়িয়ার দল চুটিয়ে ব্যবসা করে আসছে সেই আদিকাল থেকে। তাদের কাছে খোদা যেন একটি লাভজনক পণ্য।
আসলে ধর্ম যতোটা প্রচারের বিষয় তার চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রযত্ন ও পালন, আর তা শুরু হতে হবে প্রবক্তার নিজের জীবন দিয়ে। ব্যক্তিজীবনে যখন ধর্মের প্রতিফলন ঘটবে, দৃষ্ট হবে এর সুফল, তখন সামগ্রিক সমাজ তা অনুসরন করতে আগ্রহী হবে। প্রসঙ্গক্রমে দৃষ্টান্ত দেয়া যেতে পারে একটি ফুল বা ফলের বাগানের সাহায্যে। কোনো ব্যক্তি আপন জমিতে ফুল ও ফলের বাগান করার সিদ্ধান্ত নিলেন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করে চলছেন। তার এ–অদম্য উদ্যোগ দেখে প্রতিবেশীগণ কিছুটা আশা–হতাশা–অস্থিরতায় পড়ে গেল। প্রতিবেশীদের সমালোচনার কারণে ভদ্রলোকের আগ্রহে কোনো বিঘ্ন বা কর্মচ্ছেদ দেখা গেল না। তিনি খ্যাপার মতো বিরতিহীন সাধনা চালিয়ে যাচ্ছেন আপন ভূমি কন্টকের পরিবর্তে ফুলে–ফলে সুশোভিত করে তোলার জন্য, আর সে–লক্ষ্যে সর্বপ্রকার বাধা–অন্তরায় তুচ্ছ করে, সমালোচকদের বিষাক্ত বাক্যবাণ সহ্য করে সাফল্যের দুয়ারে এগিয়ে চলছেন। পরিশেষে প্রতিবেশীগণ দেখলেন, পাগল ব্যাটা সত্যিই সফলকাম হয়েছে। তার ওপর থেকে সর্বপ্রকার দুর্নাম তুলে নেয়া হলো। তারা এগিয়ে আসল নয়নকাড়া বাগানের দিকে। আবদার জানালো এর বীজ সংগ্রহ করার জন্য। তারা সিদ্ধান্ত নিলো নিজ নিজ জমিতে এমন সুন্দর বাগান করার।
প্রিয় বন্ধু, এটাই হলো ধর্মের বীজ, যা প্রথমে নিজের হৃদয়ে রোপণ করতে হয়, সযতেœ ধৈর্যসহ অঙ্কুরোদ্গমের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। প্রয়োজন পড়ে সার–পানি দেবার, প্রতিরক্ষা করার এবং আস্থাবান থাকতে হয় সেই শুভক্ষণের যখন পুরো বাগানটি ফুলে–ফলে পূর্ণ হবে, আকৃষ্ট করবে গোটা সমাজের শ্রদ্ধাবোধ ও শুভদৃষ্টি। এমন ধর্মের ধ্বজাধারীদের জীবনে কি দৃষ্ট হচ্ছে? বড়োই পরিতাপের বিষয়, ধর্মের নামে বা ধর্মকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে কিছু কুচক্রী অকালকুষ্মাণ্ড অতীত নগর–জনপদ কচুকাটা করেছে এবং বর্তমানেও তেমন কর্মে লিপ্ত আছে। ধর্মের নামে সম্পত্তি দখল, সে তো নেহাত মামুলি ব্যাপার। যদি কোনো মাতাল ডাকাতি দিয়ে তার সন্ত্রাসীকার্য শুরু করে, আর কেবল ধর্মের নাম ব্যবহারের দ্বারা লাভ করে সমাজের প্রতিষ্ঠা–পরাক্রম, তবে তেমন ক্ষেত্রে আপনি কি মন্তব্য করবেন? যেহেতু ধর্মের লেফাফা জুড়ে দেয়া হয়েছে তার অপকর্মে, তাই অন্ধের দল মহোল্লাসে, শ্রদ্ধাভরে কাঁধে তুলে নিলো তেমন মাতালটিকে।
ধর্ম নিয়ে রাজনীতির খেলা যে হচ্ছে না তা বলা যাবে না। দুষ্ট নেতাগণ ধর্মের দোহাই দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীদের কুপোকাত করে থাকে, এমন নজীর সমাজে দৃষ্ট হচ্ছে অজ¯্র। এই তো সেদিনকার কাহিনী, সহোদরদের খুন করা, যে পিতার ঔরষ জন্ম লাভ করেছে তেমন পিতাকে বন্দী করে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছে কেবল মসনদের কারণে, আর তারপর তেমন পিশাচ বনে গেল জেন্দাপীর। এমন ঘটনাও ইতিহাসের পাতায় পড়তে হয়। সন্ধি করে তা ভঙ্গ করা, স্বপক্ষ–বিপক্ষ পাইকারী হারে হত্যা করা, এমন নীতিগর্হিত কর্মও না–কি খোদার (?) সাধিত হয়ে থাকে। কথায় বলে, মাতালও নাকি দেখেশুনে পথ চলে। কিন্তু এবংবিধ মাতালরা পূত–পবিত্র করুণার পারাবার আল্লাহপাকের নামেও মাতলামি করতে দ্বিধাবোধ করছে না। অন্ধের কাছে সূর্যালোকের সপ্তবর্ণ মূল্যহীন বৈ–কি! একটা কুকুরের মালনতাবোধ থাকার কথা নয়। পুত্রবধূকে সুকৌশলে ভোগ করার মতো ঘটনা যদি কারো জীবনে ঘটতে দেখা যায়, তবে তেমন ক্ষেত্রে দু–একটা প্রশ্ন তোলা কি বড়োই বেমানান হবে? ভেবে দেখুন, কোনো মানুষ ততোক্ষন পর্যন্ত ধর্মপ্রচারক হতে পারে না যতোক্ষণ পর্যন্ত তার নিজের জীবনে ধর্মের সুফলগুলো ফুটে না ওঠে। পাকরুহের পরিচালনায় খোদাভক্ত ব্যক্তিদের জীবনে যে–সকল ঐশী ফল ফলে থাকে তার দু’চারটা এখানে তুলে ধরা হলো, ‘মহব্বত, আনন্দ, শান্তি, সহ্যগুণ, দয়ার স্বভাব, ভাল স্বভাব, বিশ্বস্ততা, নম্রতা ও নিজেকে দমন’ (গালাতীয় ৫ : ২২)।
আপনার নিজের ঘরে যা নেই তা অন্যের ঘরে কেমন করে বিলাবেন। ধর্মপ্রচারকদের কাছে জানতে চাওয়া যেতে পারে তাদের নিজেদের এলাকার খবর, নিজেদের জীবনের খবর। ব্যক্তিজীবন পরিবর্তিত না হলে সামাজিক জীবনে পরিবর্তনের হাওয়া কেমন করে বইবে? কোনোদিনই সমাজের পরিবর্তন লাভ করা সম্ভব নয় ব্যক্তিজীবনে পরিবর্তন না এনে। অনেক ডাক্তার ধূমপানের বিরুদ্ধে কথা বলে, অথচ হাতে থাকে প্রজ্জ্বলিত সিগারেট। ব্যাপারটা হাস্যকর নয় কি? বিষয়টা যেন হাতে রক্তাক্ত তরবারি আর মুখে শান্তির বুলি।
ভণ্ডদের হাত থেকে আপামর জনতা ঠিক তখনই মুক্তি পাবে যখন তারা নিজেরা নিজেদের মতো করে ধর্মের বাণী বা ধর্মীয় গ্রন্থ পড়তে ও বুঝতে পারবে। ধর্ম মানুষকে কচুকাটা করার জন্য প্রেরিত হয়নি, বরং পথভুলো বিশৃঙ্খল মানুগুলোকে সত্য–সুন্দর, ন্যায় ও শান্তির পথে পরিচালনার জন্র প্রদত্ত হয়েছে। হারিয়ে যাওয়া সন্তানদের পিতৃগৃহে ফিরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা হলো ধর্মের বিধান। বাতেনি আল্লাহপাকের বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা জন্মে ধর্মের বিধানে, আল্লাহপাকের কালামে। মানবরূপী কালাম অর্থাৎ কালেমাতুল্লার মাধ্যমে জগত প্রত্যক্ষ করতে পারে আল্লাহপারেক পরিপূর্ণ চিত্র, রহমত ও সত্য।
ধর্মের দাবি ব্যক্তিজীবন, সমাজকে নিয়ে লাঠালাঠির বিষয় নয়। ব্যক্তিজীবনে ধর্মের সুফল ফলতে শুরু করলে স্বাভাবিকভাবে সামাজিক জীবনেও তার প্রভাব দৃষ্ট হতে বাধ্য। কোনো এক লেখক তাঁর পুস্তকে লিখেছেন, ‘God doesn’t look for the salesman but the consumer of His Truth.’অর্থাৎ খোদা তাঁর সত্যের ভোক্তা চাচ্ছেন, বিক্রেতা নয়।


