প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় লালগালিচা সংবর্ধনা ও গার্ড অব অনার প্রদান করেছেন। দেশটির স্থানীয় সময় বিকাল সাড়ে ৪টায় বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপল–এ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এই সংবর্ধনা ও গার্ড অব অনারের মাধ্যমে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং। এদিন বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ও ২টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যা দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর চীন সফরের শেষ দিন আজ শুক্রবার দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন। স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব পিপলে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। গতকাল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে চীনা পানিসম্পদমন্ত্রীর বৈঠকে তিস্তাসহ বিভিন্ন নদীব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ও চীন ঐকমত্য হয়েছে। বিকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বেইজিংয়ের গ্রেট হলে (গ্রেট হল অব দ্যা পিপল) তিস্তাসহ বিভিন্ন নদীব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ–চীন ঐকমত্য : তিস্তাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন নদীর ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে বাংলাদেশ ও চীন। গতকাল দুপুরে বেইজিংয়ের রাষ্ট্রীয় দিয়াওইউতাই অতিথি ভবনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী লি গোওইংয়ের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং পানিসম্পদের যথাযথ ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে দেশে চলমান নদী খনন কর্মসূচির কথা উল্লেখ করেন এবং বাংলাদেশের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় চীন সরকারের সহযোগিতা চান। পাশাপাশি তিস্তা ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে চীন সরকারের কারিগরি সহায়তাও প্রত্যাশা করেন।
গ্রেট হলে প্রধানমন্ত্রীকে উষ্ণ অভ্যর্থনা : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বেইজিংয়ের গ্রেট হলে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছেন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং। গতকাল বিকালে তিনি রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন দিয়াওইউতাই থেকে মোটর শোভাযাত্রা সহকারে গ্রেট হলে এসে পৌঁছালে চীনের প্রধানমন্ত্রী তাঁকে স্বাগত জানান। শুভেচ্ছাবিনিময় এবং দুই দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পরিচয়পর্বের পরে প্রধানমন্ত্রীকে লালগালিচা দিয়ে অভিবাদন মঞ্চে নিয়ে যান লি কিয়াং। অভিবাদন মঞ্চে তারেক রহমান ও লি কিয়াংকে সশস্ত্র সালাম প্রদান করে চীনের সশস্ত্র বাহিনীর সুসজ্জিত একটি চৌকশ দল। গার্ড অব অনারের পর দুই দেশের জাতীয় সংগীত বাজানো হয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিবাদন জানিয়ে তোপধ্বনি দেওয়া হয়। পরে দুই প্রধানমন্ত্রী সশস্ত্র বাহিনীর প্যারেড পরিদর্শন করেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২১ জুন দুই দিনের সরকারি সফরে মালয়েশিয়ায় যান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকারপ্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার পর মালয়েশিয়ায় এটি ছিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম সরকারি সফর। বিস্ময় রচনায় অংশীদার হতে চীনা বিনিয়োগকারীদের প্রতি আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর : চীনা বিনিয়োগকারীদের পরবর্তী এশীয় অর্থনৈতিক বিস্ময় রচনায় অংশীদার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
গতকাল বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই হোটেলে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত ইনভেস্টমেন্ট ফোরামে ব্যবসায়ী নেতা, শিল্পপতি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এ আহ্বান জানান। সম্মেলনে ১২৫ জন চীনা ব্যবসায়িক প্রতিনিধি অংশ নেন। প্রধানমন্ত্রী চীনা কোম্পানিগুলোকে তাদের মূল্যশৃঙ্খল বাংলাদেশে সম্প্রসারণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘ক্রমবর্ধমান বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজারের সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি আমরা চীনা কোম্পানিগুলোকে বৈশ্বিক বাজারে আরও কার্যকরভাবে সেবা দিয়ে সহায়তা করতে পারি। বাংলাদেশ আপনাদের এশিয়ার পরবর্তী অর্থনৈতিক বিস্ময়ের অংশীদার হওয়ার আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। ইতোমধ্যে বহু চীনা বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। তাঁরা আমাদের জনগণের কর্মক্ষমতা, আমাদের সহনশীলতা এবং আমাদের বিপুল সম্ভাবনার কথা তুলে ধরতে পারেন। তাঁরা বলতে পারেন বাংলাদেশ সফল হতে পারে।’ তিনি বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করে বলেন, ‘বাংলাদেশ এক বিশাল অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আপনাদের বিনিয়োগ যথাযথ মূল্যায়ন পাবে। উদ্বেগ ও প্রত্যাশার বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হবে এবং আরও গতিশীল ও সংবেদনশীল বিনিয়োগ পরিবেশের মাধ্যমে তাদের প্রবৃদ্ধিকে সমর্থন করা হবে।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘চীনা কোম্পানিগুলো উন্নত উৎপাদনশিল্প, উচ্চমূল্যের অবকাঠামো এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করছে। চীন যখন শিল্প ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের আরও উচ্চ ধাপে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন উৎপাদনব্যবস্থার কিছু অংশ নতুন, প্রতিযোগিতামূলক ও নির্ভরযোগ্য গন্তব্যের সন্ধান করবে। বাংলাদেশ সেই সম্ভাবনাময় গন্তব্যগুলোর একটি হতে পারে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে ব্যাপক সংস্কার আনতে আমরা একটি কঠোর ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। এর মাধ্যমে স্বচ্ছতা, পূর্বাভাসযোগ্যতা এবং গতি বৃদ্ধির পাশাপাশি একাধিক নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়া হ্রাস এবং সরকারি পরিষেবাগুলোকে ডিজিটাইজ হবে।’ প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দেন, ‘শিগগিরই চীনে বাংলাদেশে প্রথম বিনিয়োগ কার্যালয় চালু করা হবে। ফলে চীনা বিনিয়োগকারীদের সহায়তা পাওয়ার জন্য বাংলাদেশে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না। আমরা আরও কাছে থাকতে, আরও নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে এবং বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও সহজের জন্যে আপনাদের সাহায্য করতে চাই।’ পার্টি–টু–পার্টি বৈঠক : প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে আজ বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই অতিথি ভবনে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইশিংয়ের পার্টি–টু–পার্টি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে তিনি বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সহযোগিতা, টেকসই প্রবৃদ্ধি ও পারস্পরিক সমৃদ্ধির লক্ষ্যে আরও ঘনিষ্ঠ অংশীদারত্ব গড়ে তোলার আহ্বান জানান। এ সময় চীনা পক্ষ দুই দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জনসম্পৃক্ততা আরও জোরদারের আগ্রহ প্রকাশ করে এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও উন্নয়নে চীনের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে। উভয় পক্ষই উন্নয়ন, বিনিয়োগ, জনগণের সংযোগ ও পার্টি–টু–পার্টি সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ–চীন সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে।
বৈঠকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সঙ্গে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক, ২ চুক্তি ও ১৩ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের বৈঠক শেষে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতাবিষয়ক দুটি চুক্তি ছাড়াও ১৩টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। গতকাল স্থানীয় সময় বিকাল ৫টায় বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব পিপলে ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে বিকালে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে বসার বিষয়টি নিশ্চিত করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন। বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব পিপলে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় ওই বৈঠকে বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অন্যদিকে চীনের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং। পরে বৈঠক শেষে দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতাবিষয়ক দুটি চুক্তি ছাড়াও ১৩টি সমঝোতা স্মারক সই হয়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ছাড়াও বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ হাসান আল মাহমুদ তিতুমীর, শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন প্রমুখ। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানান, চীনা প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে বেইজিংয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরের উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান, ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি, বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের প্রসার, জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক জোরদার করা এবং শিক্ষা, সংস্কৃতি, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসহ জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে আরও কার্যকর সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা করা। মালয়েশিয়া ও চীনে টানা ছয় দিনের এ সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী আজ ২৬ জুন রাতে প্রতিনিধিদলসহ দেশে ফিরবেন।



