গাছপালা, পার্ক ও খোলা জায়গার শহর হিসেবে পরিচিত রাজধানী ঢাকা দ্রুত কংক্রিটের শহরে পরিণত হচ্ছে। এই শহরে এখন সবুজের পরিমাণ ক্রমেই কমে যাচ্ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অবাধ নির্মাণ ও উন্নয়নের নামে গাছ কাটার কারণে পরিবেশ ও বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবুজ প্রকৃতি হারিয়ে কংক্রিটের জঞ্জালে পরিণত হওয়ার কারণে ঢাকা নগরীর তাপমাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং বৃক্ষনিধনের ফলে ঢাকা এখন বলা যায় ‘তাপদ্বীপে’ পরিণত হয়েছে, যেখানে কংক্রিটের আচ্ছাদন প্রায় ৮২ শতাংশ। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের–বিআইপি গবেষণা অনুযায়ী, গত ২৮ বছরে ঢাকায় সবুজ এলাকা কমেছে ৯ শতাংশের বেশি এবং বর্তমানে শহরের ৮২ শতাংশেরও বেশি অংশ কংক্রিটের আচ্ছাদনে ঢাকা। সবুজ ও জলাভূমি কমে যাওয়ার কারণে কংক্রিটময় এলাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে তাপমাত্রা ৩ থেকে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি অনুভূত হয়। গত চার দশকে ঢাকায় স্বাভাবিক তাপমাত্রা ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। এজন্য নগরায়ণের কারণে প্রায় ৪৭ শতাংশ ঘন সবুজ ধ্বংস হওয়া দায়ী। মাত্রাতিরিক্ত যানবাহন এবং ভবন থেকে বের হওয়া তাপ এই তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে আরো ত্বরান্বিত করছে। ঢাকা শহরে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, রাস্তা প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্পের নামে নির্বিচারে গাছ কাটা হয়। ঢাকায় প্রতি ২৮ জনের জন্য মাত্র ১টি গাছ রয়েছে, যেখানে স্বাস্থ্যকর পরিবেশের জন্য জনপ্রতি ৩টি পরিণত গাছের প্রয়োজন। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে এবং একটি সুনির্দিষ্ট ‘বৃক্ষনিধন পর্যবেক্ষণব্যবস্থা’ গড়ে তোলার জোর দাবি জানালেও সরকার এসব দাবির প্রতি সুদৃষ্টি দিচ্ছে না। রাস্তা সম্প্রসারণ এবং মেগা প্রকল্পের জন্য শহরের অনেক পুরোনো ও বড় গাছ কেটে ফেলা হয়েছে।
নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে ঢাকা শহরের তাপমাত্রা ও বায়ুদূষণ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। পরিবেশ রক্ষায় সরকার বন ও গাছ সংরক্ষণ অধ্যাদেশ–২০২৬ জারি করলেও তার কোনো বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না। পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, পরিবেশের বিপর্যয় ঠেকাতে অবিলম্বে নগর পরিকল্পনায় গাছ বাঁচানোর ওপর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া এবং যথাযথ আইন প্রয়োগ করা জরুরি। পাশাপাশি নতুন করে রাজধানীজুড়ে ব্যাপকভাবে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি শুরু করতে হবে। এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ বিশিষ্ট স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, অব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন ও দীর্ঘদিনের ভুল নীতির কারণে একটি দূষিত নগরী গড়ে উঠছে। নগরজীবনের অভিঘাত ও দূষণ এমন পর্যায়ে পেঁৗঁছেছে যে কাকে নিয়ে ভবিষ্যৎ দেখব, তা অনিশ্চিত হয়ে গেছে। আমরা বিকলাঙ্গ নগর তৈরি করছি। বর্তমান নগরদূষণ ও পরিবেশগত অভিঘাত শিশুর ভবিষ্যৎ বিপন্ন করছে। শিশুরা বড় হতে হতে শ্বাসকষ্ট, পেটের ব্যাধি, কান ও চোখের বড় সমস্যায় পড়ছে। এসব অসুস্থতা অনেকটা বেড়ে গেছে। পরিবেশ বিপর্যয় রোধ করে একটি পরিকল্পিত নগরী গড়তে হলে নগরজুড়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি শুরু করতে হবে। বর্তমান সরকার এ কর্যক্রম শুরু করেছে। এটি অব্যাহত রাখতে হবে। সেই সাথে শুধু গাছ লাগিয়ে কোটি কোটি টাকা খরচ করলেই হবে না, এগুলোকে যথাযথ পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে।
বৃক্ষরোপণের নামে অতীতের মতো শুধু লুটপাট হলে নগরবাসীর ভাগ্যে সুফল মিলবে না। ঢাকার পরিবেশগত ক্ষতি পুষিয়ে নিতে দুই সিটি করপোরেশনই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে মিয়াওয়াকি পদ্ধতিসহ বিভিন্ন আধুনিক উপায়ে নতুন করে কয়েক লাখ গাছ লাগানোর সরকারি পরিকল্পনা ও সামাজিক উদ্যোগ চলমান রয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন–ডিএনসিসি প্রগতি সরণিসহ বিভিন্ন এলাকায় কিছুটা হলেও সবুজ বিপ্লব ঘটিয়েছে। তবে দক্ষিণ সিটি তার উল্টো। দক্ষিণ সিটিতে গাছ লাগানোর পরিবর্তে পার্কসহ অনেক এলাকার গাছ নিধন করেছে। রাজধানী ঢাকার তাপমাত্রা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। প্রতি বছর গ্রীষ্মের প্রচ– রোদ, ভ্যাপসা গরমে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে নগরজীবন। তিন বছর আগে হিট অফিসার নিয়োগসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয় ডিএনসিসি। নগরে শীতল জায়গা বাড়াতে চার লাখ গাছ লাগানোর ঘোষণা দেয়। ওই কর্মসূচি অনুযায়ী নগরের ফুটপাত, সড়ক বিভাজক, লেক ও খাল পাড়ে হরেক রকম গাছ লাগিয়েছিল সংস্থাটি। এখন ঢাকা উত্তরের অধিকাংশ সড়ক বিভাজক–ফুটপাত ফল, ফুল, ঔষধি গাছে সবুজ বিপ্লব ঘটেছে। ডিএনসিসির এ উদ্যোগে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন নাগরিকরা। তারা জানান, নগরায়ণের ফলে ক্রমেই শহর থেকে সবুজ গাছ হারিয়ে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বদলে গেছে ঋতুচক্র। গ্রীষ্মের পাশাপাশি বর্ষা মৌসুমেও এখন বইছে তাপপ্রবাহ।
উন্নত বিশ্বের সব শহরে নির্দিষ্ট সংখ্যক গাছ আছে। তারা গাছের মর্যাদা দিতে জানে। ডিএনসিসিতে এখনো প্রয়োজনের তুলনায় কম থাকলেও এদিক দিয়ে বেশ কিছুটা এগিয়েছে। ডিএনসিসির পরিবেশ, জলবায়ু ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সার্কেল সূত্র জানায়, গত তিন বছরে নগরের বিভিন্ন এলাকায় চার লাখ ৩১ হাজার ৭৭৩টি গাছ রোপণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ফলদ, বনজ, ফুল, ঔষধি, কাঠজাতীয় এবং শোভাবর্ধনকারী গাছ রয়েছে। চলতি বছর আরো ৫৫ হাজার গাছ রোপণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। যার মধ্যে মিয়াওয়াকি পদ্ধতিতে বনায়নের মাধ্যমে ১৪ হাজার গাছ রোপণ করা হয়েছে এবং ৩৯ হাজার ৪০০ গাছ রোপণের কাজ চলমান। এছাড়া সড়ক বিভাজক ও ফুটপাতে সবুজায়ন কার্যক্রম চলছে। তবে পরিবেশ বিপর্যয় রোধে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে নজর নেই ঢাকা দক্ষিণ সিটির–ডিএসসিসি। ৭৫টি ওয়ার্ড নিয়ে ডিএসসিসি গঠিত। এর মধ্যে বড় একটি অংশ পুরান ঢাকা, যা ঢাকার মধ্যে সবচেয়ে ঘিঞ্জি এলাকা। এখানে নর্থসাউথ রোড, ইংলিশ রোড, জনসন রোড, ধোলাইখাল রোড ছাড়া চওড়া কোনো সড়ক নেই। ফলে পুরো পুরান ঢাকায় গলি সড়ক দিয়েই মানুষ চলাচল করেন। এসব গলিতে ফুটপাত নেই। এর বাইরে ঢাকা দক্ষিণের যেসব সড়ক রয়েছে, সেগুলোর সড়ক বিভাজকের মধ্যে বাগানবিলাসসহ কিছু গাছ শোভা পেয়েছে। কিন্তু কোথাও পথচারীদের ছায়া দেবে বা পথচারীদের চোখের প্রশান্তি দেবে, এমন কোনো গাছ সড়ক বিভাজক ও ফুটপাতে নেই। যদিও রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, বলধা গার্ডেন দক্ষিণ সিটিতে পড়েছে। তবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নানান কারণে বিভিন্ন সময়ে উজাড় করা হয়েছে অসংখ্য গাছ।
এছাড়া মেগাপ্রকল্পের নামে পান্থকুঞ্জ পার্কের বেশ বড় বড় কিছু গাছ কাটা পড়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম বলেন, ঢাকা শহরকে রক্ষা করার জন্য বৃক্ষরোপণের কোনো বিকল্প নেই। শুধু প্রধানমন্ত্রীর পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি হিসেবে নয় বরং নিজেদের বেঁচে থাকার জন্য গাছ লাগানো অত্যন্ত জরুরি। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, গত তিন দশকে ঢাকা তার অর্ধেকের বেশি সবুজ এলাকা হারিয়েছে। বর্তমানে শহরের মাত্র ৮ দশমিক ৫ শতাংশ এলাকা সবুজে আচ্ছাদিত। যেখানে একটি বাসযোগ্য শহরে অন্তত ২৫ শতাংশ গ্রিন স্পেস থাকা দরকার। এ কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বায়ুদূষণ এবং জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ছে। নগর পরিকল্পনায়ও সবুজের ঘাটতি স্পষ্ট। ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৭৫টি ওয়ার্ডে মাত্র ২৭টি এবং উত্তর সিটিতে ২৩টি পার্ক রয়েছে। পুরান ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সবুজের হার নেমে এসেছে প্রায় ২ শতাংশে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা জরুরি। নগর পরিকল্পনায় বাধ্যতামূলক গ্রিন স্পেস রাখা, প্রতিটি ওয়ার্ডে ছোট পার্ক ও খেলার মাঠ তৈরি এবং রাস্তার পাশে পরিকল্পিতভাবে গাছ লাগানোর মাধ্যমে ঢাকার সবুজ ফিরিয়ে আনা সম্ভব। সবুজ কমে যাওয়ায় সরাসরি প্রভাব পড়ছে শহরের তাপমাত্রা ও পরিবেশের ওপর। বিশেষজ্ঞদের মতে, গত ১০ বছরে ঢাকার তাপমাত্রা প্রায় ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। শহরের অধিকাংশ এলাকা কংক্রিটে ঢেকে যাওয়ায় তাপ শোষণ ও বিকিরণের মাত্রা বেড়েছে, জনস্বাস্থ্যও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।



