দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্রমবর্ধমান ঘাটতি নতুন শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহে ব্যাপক ঘাটতি, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন হ্রাস এবং নতুন উৎস থেকে প্রত্যাশিত গ্যাস না মেলায় প্রায় দুই হাজার শিল্প প্রতিষ্ঠানের গ্যাস সংযোগের আবেদন দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। বিদ্যমান শিল্প কারখানাগুলোই যখন প্রয়োজনীয় গ্যাসচাপ পাচ্ছে না, তখন নতুন সংযোগ দিতে চরম সতর্ক অবস্থানে রয়েছে সরকার। এতে নতুন বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যাচ্ছে, শিল্প সম্প্রসারণ থমকে পড়ছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে শিল্প খাতের এই অনিশ্চয়তা আরও গভীর হবে।
চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক কম : পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু সরবরাহ করা যাচ্ছে গড়ে ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ প্রতিদিনই ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস ঘাটতি থাকছে। দেশি গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়ায় এলএনজি আমদানির মাধ্যমে ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য ওঠানামা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে চাহিদা অনুযায়ী আমদানি করাও সহজ হচ্ছে না।
নতুন শিল্পের জন্য গ্যাস সংযোগ প্রায় স্থবির : গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে নতুন বিনিয়োগ ও শিল্প সম্প্রসারণে। দীর্ঘদিন ধরে নতুন গ্যাস সংযোগের অপেক্ষায় রয়েছে প্রায় দুই হাজার শিল্প প্রতিষ্ঠান। যার মধ্যে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির একাই রয়েছে এক হাজারের বেশি নতুন গ্যাস সংযোগের আবেদন। এ ছাড়া প্রতিনিয়ত নতুন নতুন আবেদন জমা পড়ছে। তবে সংযোগ না মেলায় হতাশ হয়ে পড়ছেন বিনিয়োগকারীরা। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেন, প্রায় দুই হাজার আবেদন জমা পড়ে আছে। বিভিন্ন শিল্প মালিক গ্যাস সংযোগের জন্য আবেদন করেছেন। অনেকেই নির্ধারিত অর্থও জমা দিয়ে রেখেছেন। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় চাইলেই নতুন সংযোগ দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি বলেন, আমরা ব্যবসায়ীদের নিজস্ব উদ্যোগে এলএনজি আমদানির প্রস্তাব দিয়েছিলাম। কিন্তু কেউ তাতে আগ্রহ দেখায়নি।
তার মতে, বিদ্যমান সরবরাহ পরিস্থিতিতে নতুন সংযোগ দেওয়া হলে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতের ওপর আরও চাপ তৈরি হবে। নতুন একটি এলএনজি র্টামিনাল দ্রুত নির্মাণের চেষ্টা করা হচ্ছে। এ ছাড়া জ¦ালানি সংকট কীভাবে সমাধান করা যায় সে বিষয়েও সরকার ভাবছে।
বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব : ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা বলছেন, বর্তমানে নতুন শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা হচ্ছে জ্বালানি সরবরাহ। অনেক বিনিয়োগকারী জমি, অর্থায়ন ও অন্যান্য প্রস্তুতি সম্পন্ন করেও গ্যাস সংযোগের নিশ্চয়তা না পাওয়ায় বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে নিবন্ধিত বিনিয়োগ প্রস্তাব আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ব্যবসায়ী নেতারা মনে করছেন, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার পাশাপাশি জ্বালানি সংকটও এর অন্যতম কারণ। এ ছাড়া গত ২০২৫–২৬ সালেও বিনিয়োগ রেকর্ড হতাশাজনক।
শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যাহত : বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শিল্প কারখানাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই গ্যাস সংকটে ভুগছে। তার ভাষায়, অনেক কারখানা প্রয়োজনীয় গ্যাসচাপ পাচ্ছে না। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, বিনিয়োগ বৃদ্ধির পূর্বশর্ত হচ্ছে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ। গ্যাসের নিশ্চয়তা ছাড়া বড় বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব নয়।
দেশি উৎপাদন কমছে, বাড়ছে আমদানিনির্ভরতা : ২০১৫ সালের দিকে দেশে দেশি গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দৈনিক ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস উৎপাদন হতো। বর্তমানে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানাসহ বেশ কয়েকটি বড় ক্ষেত্রেই উৎপাদন হ্রাসের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এই ঘাটতি পূরণে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। বর্তমানে দৈনিক সরবরাহ করা গ্যাসের একটি বড় অংশই আমদানিকৃত এলএনজি থেকে আসছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশীয় অনুসন্ধান ও উৎপাদন না বাড়লে আগামী বছরগুলোয় আমদানিনির্ভরতা আরও বাড়বে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ তেল গ্যাস খনিজসম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) পরিচালক (অপারেশন) প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, আজও (গতকাল) দেশি গ্যাসের উৎপাদন ১৬শ মিলিয়ন ঘনফুট।
তিনি বলেন, এর সঙ্গে এলএনজি থেকে যুক্ত হচ্ছে এক হাজার ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু দেশে প্রায় ৩৮শ মিলিয়ন থেকে চার হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা। ফলে বিদ্যমান শিল্প কারখানাই গ্যাসের সংকটে ভুগছে। সেখানে নতুন করে গ্যাস সংযোগ দেওয়া কঠিন বিষয়। তবে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে সংকট সমাধানে বিষয়ে কাজ করা হচ্ছে।
সরকারের পরিকল্পনা : এদিকে পেট্রোবাংলার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মান্নান আমাদের সময়কে বলেন, গ্যাস সংযোগ একেবারে বন্ধ রয়েছে এভাবে বলা যাবে না। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় সীমিত আকারে কিছু সংযোগ দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে আনার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। যদি বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ব্যবহার কমানো যায়, তাহলে সেই গ্যাস শিল্প কারখানার জন্য বরাদ্দ করা সম্ভব হবে। তবে পুরো বিষয়টি সময়সাপেক্ষ। পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, নতুন অনুসন্ধান কূপ খনন, পুরনো কূপের ওয়ার্কওভার এবং এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণের উদ্যোগও চলমান রয়েছে। পাশাপাশি নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের বিষয়েও কাজ এগোচ্ছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম. শামসুল আলম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি খাতে নীতিগত দুর্বলতা ও পরিকল্পনার ঘাটতির কারণে দেশি উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হয়নি। তার মতে, শুধু এলএনজি আমদানি করে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না।
অফশোর ও অনশোর গ্যাস অনুসন্ধান দ্রুত বাড়াতে হবে এবং বিকল্প জ্বালানি উৎস উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, জ্বালানি খাতের সংকট এখন আর কেবল একটি খাতের সমস্যা নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতি, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
সামনে যে চ্যালেঞ্জ : বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে গ্যাসের চাহিদা–সরবরাহ ব্যবধান কমানো; দেশি গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধি; অফশোর ব্লকগুলোয় দ্রুত কার্যক্রম শুরু করা; শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত; এলএনজি আমদানির জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়–সাশ্রয়ী ব্যবস্থা গ্রহণ; জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ ও সুশাসন জোরদার করা। তাদের মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ ছাড়া সেই সক্ষমতার পূর্ণ সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। ফলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শিল্পায়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত হয়েছে। গ্যাসের ক্রমবর্ধমান সংকট, নতুন সংযোগে স্থবিরতা, দেশি উৎপাদন হ্রাস এবং আমদানিনির্ভরতা বৃদ্ধির বাস্তবতায় বর্তমান সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় নীতিগত ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আশঙ্কার বিষয় হলো দেশি গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়ায় জ্বালানি খাতে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। দেশের অধিকাংশ বড় গ্যাসক্ষেত্র দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদনে থাকায় তাদের মজুদ হ্রাস পাচ্ছে, ফলে জাতীয় গ্রিডে দেশি গ্যাসের সরবরাহ কমে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার ও উত্তোলনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য না এলে ভবিষ্যতে শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার কারখানা এবং আবাসিক খাতে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হতে পারে। দেশীয় উৎপাদনের ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশকে ক্রমবর্ধমান হারে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির মূল্য বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এ অবস্থায় সরকার নতুন গ্যাস অনুসন্ধান, সমুদ্র এলাকায় তেল–গ্যাস ব্লকের কার্যক্রম জোরদার, পুরনো কূপ পুনঃখনন এবং জ্বালানি উৎসের বহুমুখীকরণের উদ্যোগ যদি কেবল পরিকল্পনায় থাকে তবে দেশ ভয়াবহ দুর্যোগের মধ্যে পড়বে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমতে থাকলে শুধু গ্যাস নয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতেও এর প্রভাব পড়বে। তাই দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশি অনুসন্ধান কার্যক্রম বাড়ানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বিকল্প জ্বালানি উৎস ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।



