বিস্ফোরণের শব্দে হাসপাতালের রোগীরা চিৎকার করে দিগ্বিদিক ছুটছেন। নবজাতক ওয়ার্ডে বসে তখন দিনের প্রতিবেদন লিখছিলেন নার্স (সেবিকা) নেদা সালিমি। তড়িঘড়ি করে কয়েক নবজাতককে কোলে নিয়ে তিনি ছোটেন নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে। ইরানের খাতাম আল–আম্বিয়া হাসপাতালের এই দৃশ্যটি গত ১ মার্চ সকালের। সেদিন তেহরানে বোমা হামলা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। সে সময় নবজাতকদের বাঁচাতে সালিমির প্রাণপণ চেষ্টার একটি সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়েছে। সালিমির সেদিনের অভিজ্ঞতা নিয়ে রোববার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ইরানি গণমাধ্যম প্রেসটিভি। ৩৬ বছর বয়সী সালিমি বলেন, ‘ভাবার মতো কোনো সময় ছিল না। ওই মুহূর্তে আমার মাথায় কেবল একটি চিন্তাই কাজ করছিল– যেকোনো উপায়ে শিশুদের নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যেতে হবে।’ সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, তিনটি নবজাতককে কোলে নিয়ে দ্রুত ওয়ার্ড থেকে বের হচ্ছেন সালিমি।
ওয়ার্ডের ভেতরকার সেই কয়েক সেকেন্ডের দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ হলেও বাইরের গল্প অনেকের অজানা। সালিমি জানান, করিডোরে গিয়ে অন্য সহকর্মীদের হাতে দুই শিশুকে তুলে দেন। তৃতীয় শিশুকে এক হাত দিয়ে বুকে চেপে ধরে আরেক হাত দিয়ে নিজের মাথা রক্ষার চেষ্টা করেন। এরপর হাসপাতালের পঞ্চম তলা থেকে দ্রুত ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে ছোটেন। প্রেসটিভিকে সালিমি বলেন, ‘আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থানের পুরোটা সময় আমরা শিশুদের কোলে রাখার চেষ্টা করেছিলাম, যাতে তাদের কোনো ক্ষতি না হয়।
সেখানে জড়ো হওয়া অন্যরা চরম আতঙ্কে ছিলেন। কেউ কেউ একে–অপরকে সাহায্য করছিলেন।’ সালিমি বলেন, ‘আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে আর মাত্র কয়েক মিনিট জীবন ভিক্ষা চেয়েছিলাম। শিশুগুলোকে যাতে তাদের মায়েদের কোলে ফিরিয়ে দিতে পারি– শুধু এটুকু সময় চেয়েছিলাম। মনে মনে প্রার্থনায় বলেছিলাম, শুধু এটুকু সময় ভিক্ষা দিন, এরপর চাইলে আমার প্রাণ নিয়ে নিন।’ ব্যক্তিগত জীবনে সালিমি নিজেও একজন মা। তাঁর ছয় বছর বয়সী এক ছেলে সন্তান আছে। কেরমানশাহ এলাকার এই বাসিন্দা ইরান ইউনিভার্সিটি অব মেডিকেল সায়েন্সেস থেকে নার্সিং বিষয়ে পিএইচডি করছেন। তিনি ১২ বছর ধরে পেডিয়াট্রিক (শিশু চিকিৎসা) ও নবজাতক সেবাদানের সঙ্গে জড়িত। যে তিন শিশুকে সালিমি উদ্ধার করেন– সবারই জন্ম হয়েছিল ১ মার্চের হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে। অস্ত্রোপচারের কারণে তাদের মায়েরা তখনো অন্য ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। কণ্ঠস্বর কিছুটা নরম করে সালিমি বলেন, ‘আশ্রয়কেন্দ্রের ভিড়ের মধ্যেই তিন শিশুর মায়েদের খুঁজে পাই। সেটি ছিল জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত। কিছুক্ষণের জন্য হলেও ভুলে গিয়েছিলাম, বাইরের পৃথিবীতে যুদ্ধ চলছে।’



