সরকারি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী গতকাল শুক্রবার থেকে উত্তরের বিভিন্ন জেলায় শুরু হয়েছে আম সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণ। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকাররা ছুটছেন উত্তরাঞ্চলের আমের মোকামগুলোতে। রাজশাহীতে গতকাল শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে আম পাড়া শুরু হয়েছে। এ অঞ্চলের বিভিন্ন বাজারে উঠেছে গুটি আম। সাতক্ষীরায় হিমসাগর আম বাজারে আসতে শুরু করেছে। প্রথম দিনেই জেলার সবচেয়ে বড় আমের মোকাম সুলতানপুর বড় বাজার ভরে গেছে এই আমে। উত্তরাঞ্চলের চতুর্থ বৃহৎ আম উৎপাদনকারী জেলা নাটোরেও শুরু হয়েছে আম সংগ্রহ। জেলার বিভিন্ন বাগানে গুটি ও বৈশাখী জাতের আম পাড়া শুরু হয়েছে।
রাজশাহীর আড়তে বেশি আচারের আম
জেলার সবচেয়ে বড় আমের বাজার পুঠিয়ার বানেশ্বর বাজারে প্রথম দিনে চারটি ভটভটিতে আম আসে। এর মধ্যে দুই গাড়িতে ছিল গাছে পাকা আম। অন্যগুলো আচারের কারখানার জন্য আনা হয়। প্রথম দিনে গাছপাকা গুটি আমের দাম ছিল ১ হাজার ৩২০ টাকা মণ। বানেশ্বর বাজারের আমের আড়তগুলো এখনও চালু হয়নি। অল্প কয়েকটিতে আম কেনাবেচা চলছে। তার মধ্যে আচার তৈরির কাঁচা আমই ছিল বেশি। নামাজ গ্রামের গোলাম মোস্তফা গুটি আম নিয়ে বাজারে এসেছিলেন। তিনি ১ হাজার ৩২০ টাকা মণে এই আম বিক্রি করেন। ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে আমের ক্রেটের ওপরে অর্ধেক কাটা একটি পাকা আম রাখেন তিনি। অনেকে সেই আমের স্বাদ নিয়ে দেখছেন। পুঠিয়ার ছত্রগাছা গ্রামের আরেক চাষি গুটি আম এনেছিলেন। আমগুলো রানিপসন্দ আমের গুটি। গাছে ১০ থেকে ১২টি পাকা আম দেখেছেন তিনি। আনোয়ার হোসেন নামের এক আড়তদার সেই আম ১ হাজার ৩২০ টাকা মণে কিনে নিলেন।
তিনি বলেন, এই আম তিনি ঢাকায় পাঠাবেন। পুঠিয়া উপজেলার জতরঘু গ্রামের সাগরের বাগানে গুটি আম পাড়া হয়েছে। তারাও সেই আম ঢাকায় পাঠাবেন। আর বাঘার আমচাষি ও ব্যবসায়ী আসাফুদ্দৌলা বলেন, তাদের চরুষা জাতের গুটি আম পাকতে শুরু করেছে। ঢাকার ব্যবসায়ীদের জন্য আজ তারা তিন ক্রেট আম পাঠাচ্ছেন। মগডাল থেকে বেছে বেছে আম পেড়েছেন। ঢাকায় তারা এই ভালো দাম পাবেন। এখনই তাদের চরুষা আম ১০০ টাকা কেজি দাম ধরে পাঠাচ্ছেন। এদিকে, জেলার চারঘাট উপজেলার হলিদাগাছি জায়গীরপাড়ার একটি বাগানে গুটি আম পাড়ার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন স্থানীয় (চারঘাট–বাঘা) সংসদ সদস্য আবু সাইদ চাঁদ। তিনি বলেন, কেউ যাতে অপরিপক্ব আম না পাড়েন, সে ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে তারা সবাইকে জানিয়ে দিয়েছেন। একই সঙ্গে বিদেশে রপ্তানিযোগ্য আম যাতে উৎপাদন করা যায়, সেজন্য তারা চেষ্টা করছেন। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, বানেশ্বর হাট এবার ৩ কোটি ৫৯ লাখ ৬০ হাজার টাকায় ডাক হয়েছে। এর মধ্যে আমের হাটও আছে। ইজারাদারের অংশীদার ওসমান আলী বলেন, তারা সরকারি ঘোষণা মোতাবেক মাইকিং করে জানিয়ে দিয়েছেন, আজ থেকে শুধু পাকা গুটি আম বাজারে আসবে। অপরিপক্ব অন্য আম বাজারে আনলে জরিমানা করা হবে। কিন্তু গুটি আমের বেশির ভাগই স্থানীয় লোকজন খায় না। এটা মূলত আচার ব্যবসায়ীরা কিনে নিয়ে যান। আজ প্রথম দিনে বাজারে আচারের আমই বেশি ছিল।
হিমসাগরে ভরে উঠেছে সাতক্ষীরার বড় বাজার
সাতক্ষীরার হিমসাগর আম বাজারে উঠতে শুরু করেছে। সরকারি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী গতকাল শুক্রবার জেলায় শুরু হয়েছে হিমসাগর আম সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণ। প্রথম দিনেই জেলার সবচেয়ে বড় আমের মোকাম সুলতানপুর বড় বাজার ভরে গেছে হিমসাগর আমে। সকাল ৮টার দিকে সুলতানপুর বাজারে গিয়ে দেখা যায়, শত শত ইঞ্জিনচালিত ভ্যানে আমভর্তি ক্রেট নিয়ে দীর্ঘ সারি। বাজারের ভেতরে ঢোকার জায়গা নেই। পাইকারি ক্রেতাদের পাশাপাশি স্থানীয় ক্রেতাদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। কেউ পরিবারের জন্য, কেউ দূরের আত্মীয়–স্বজনের কাছে পাঠানোর জন্য মৌসুমের প্রথম হিমসাগর কিনতে ব্যস্ত। সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চাষিদের সঙ্গে মতবিনিময় করে গত ২৬ এপ্রিল জেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ যৌথভাবে আম সংগ্রহের সময়সূচি নির্ধারণ করে। সেই ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ৫ মে গোপালভোগ, গোবিন্দভোগ, বোম্বাই, গোলাপখাসসহ দেশি জাতের আম সংগ্রহ শুরু হয়।
গতকাল শুরু হয় সবচেয়ে প্রতীক্ষিত হিমসাগর আম সংগ্রহ। গাজীপুর থেকে আসা পাইকার লুৎফর রহমান বলেন, সাতক্ষীরার হিমসাগর আমের আলাদা কদর আছে। রং, ঘ্রাণ আর স্বাদের জন্য ঢাকায় এই আমের চাহিদা অনেক বেশি। প্রথম দিনেই ভালো মানের আম পাওয়া যাচ্ছে, তাই বেশি করে কিনছি।’ তিনি জানান, আগে বাজারে আসা গোবিন্দভোগ, গোপালভোগ ও গোলাপখাস আম তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হয়েছে। তবে হিমসাগরের চাহিদা সব সময়ই বেশি। এবার প্রথম দিনেই বাজারে প্রচুর আম উঠেছে। প্রতি মণ হিমসাগর বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৪শ থেকে ৩ হাজার টাকায়। কয়েক দিনের মধ্যে দাম আরও কিছুটা কমতে পারে বলেও ধারণা তার। সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, এ বছর জেলায় ৪ হাজার ১৪০ হেক্টর জমিতে ৫ হাজার ২৯৯টি বাগানে প্রায় ৪৫ হাজার ৭৫০ জন কৃষক আম চাষ করেছেন। চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ৭০ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩৮ শতাংশই হিমসাগর। বিদেশে রপ্তানি হওয়া আমের বড় অংশও এই জাতের। চলতি মৌসুমে ১শ মেট্রিক টন আম রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার আম বিক্রি হতে পারে। অধিদপ্তরের উপ–পরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, আমের গুণগত মান ঠিক রাখতে এবং অপরিপক্ব আম বাজারে আসা ঠেকাতে ধাপে ধাপে আম সংগ্রহের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।
নাটোরে আমের বাম্পার ফলন
অনুকূল আবহাওয়া ও বাম্পার ফলনে এবার জেলায় ৪শ কোটি টাকার বেশি আম–বাণিজ্যের সম্ভাবনা দেখছে কৃষি বিভাগ ও বাগানমালিকরা। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) সূত্রে জানা যায়, এ বছর নাটোরে ৫ হাজার ৬৯৩ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬৮ হাজার ৩১৬ মেট্রিক টন। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ফলন হলে ৬০ টাকা গড় দরে এ বছর জেলায় ৪শ কোটি টাকার বেশি আম বাণিজ্য হবে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ–পরিচালক হাবিবুল ইসলাম খান জানান, গত মৌসুমে নাটোরে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার আম বাণিজ্য হয়েছিল। তবে, এ বছর ফলন ভালো হওয়ায় সেই পরিমাণ ৪শ কোটি টাকা অতিক্রম করতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। আম উৎপাদনে ধারাবাহিক সাফল্যের কারণে উত্তরাঞ্চলের চতুর্থ বৃহৎ আম উৎপাদনকারী জেলা হিসেবে নাটোরের পরিচিতি তৈরি হয়েছে বলেও জানান তিনি। সদর উপজেলার বাগানমালিক ইউসুফ আহমেদ বলেন, এ বছর আমার বাগানে বিভিন্ন জাতের প্রায় ৮০টি আম গাছ রয়েছে।
আজ থেকে গুটি ও বৈশাখী জাতের আম সংগ্রহ শুরু করেছি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন ভালো হয়েছে। এখন বাজারে দাম ভালো পেলে কৃষকরা লাভবান হবেন। আমচাষিরা জানান, সময়মতো বৃষ্টি ও অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এবার আমের গুটি কম ঝরেছে। গাছে আমের পরিমাণও তুলনামূলক বেশি। তবে, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাজারে ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে কিছুটা শঙ্কাও রয়েছে। নিরাপদ ও রাসায়নিকমুক্ত আম নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী আম সংগ্রহের নির্দেশনা দিয়েছে। নির্দেশনা মেনেই আম সংগ্রহ করছেন চাষিরা। নাটোরের জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন জানান, নির্ধারিত সময়সূচি মেনে আম সংগ্রহ করলে ভোক্তারা নিরাপদ ও পরিপক্ব আম পাবেন। একই সঙ্গে ফলের গুণগত মান নিশ্চিত করতে এবং বিপণন ও পরিবহনে যাতে কোনো বাধা না থাকে, সে বিষয়েও প্রশাসন কাজ করছে।



