চলছে সার্বক্ষণিক ভিডিও মনিটরিং। নিয়ম ভাঙ্গার অভিযোগে অভিযুক্ত গাড়ির বিরুদ্ধে দায়ের হচ্ছে নিয়মিত মামলা। আদায় করা হচ্ছে অর্থ জরিমানা। কিন্তু এরপরেও থেমে নেই অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর প্রবণতা। এ দৃশ্য দেশের প্রথম ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, এই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। সর্বশেষ গত মাসের মাঝামাঝিতেও একটি বড় দুর্ঘটনা ঘটে। এছাড়া গত বছরে বড় ধরনের অন্তত ১৫টি দুর্ঘটনা ঘটে। বড় লোকের বখাটে যাওয়া সন্তানরা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েকে রানওয়ে মনে করে রেস কার নিয়েও বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালায়। এতে করে দুর্ঘটনার শঙ্কার পাশাপাশি অন্যদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কর্তৃপক্ষ বলছে, ভায়োলেশনের অভিযোগে গড়ে প্রতিদিন ত্রিশ থেকে চল্লিশটির মতো গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে। প্রথমদিকে এ সংখ্যাটা ছিলো গড়ে ১২ থেকে ১৩শ’। বিশেষজ্ঞদের মতে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে নিচের সড়কের অব্যবস্থাপনা, হঠাৎ টোল প্লাজায় জট এবং চালকদের অসচেতনতা ও বেপরোয়া গতির কারণে এই দুর্ঘটনাগুলো ঘটছে। এছাড়া রয়েছে দ্রুতগতি, ট্রাফিক আইন অমান্য করা এবং চালকদের অসতর্কতা। তারা বলেন, শুধু মামলা কিংবা অর্থদ–ই সমাধান নয়, সবার আগে জরুরি জনসচেতনতা। গত ১৫ এপ্রিল সকালে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বহনকারী একটি বাস দুর্ঘটনার শিকার হয়। এতে আহত হন অন্তত ৬ শিক্ষার্থী। এক্সপ্রেসওয়ে থেকে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি)-সংলগ্ন সড়কে বাসটি নামার সময় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
ঘটনাস্থলের ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা ও প্রাথমিক তদন্ত শেষে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদুর রহমান জানিয়েছেন, এক্সপ্রেসওয়ে থেকে নামার সময় বাসটির গতি ছিলো তুলনামূলক অনেক বেশি। এতে করে চালক নিয়ন্ত্রণ হারান। আর তখনই বাসটির ধাক্কায় সামনে থাকা একাধিক ব্যক্তিগত গাড়ি, একটি মাইক্রোবাস ও একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গত বছরের ৬ আগস্ট ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে বাসের ধাক্কায় নিহত হয়েছেন মোটরসাইকেল আরোহী এক নারী। ওই নারী যাত্রীকে নিয়ে ভাড়ায়চালিত মোটরসাইকেলটি কাওলা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে ঢাকার ভেতরে প্রবেশ করছিল। আর তখনি বেপরোয়া গতির বাস তাদের মোটরসাইকেলটিকে ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে যায়। এতে ওই নারী নিহত এবং গুরুতর আহত হন মোটরসাইকেলের চালক। এর আগে ২৪ সালের নাখালপাড়া এলাকায় বেপরোয়া বাসের ধাক্কায় থেমে থাকা প্রাইভেটকারের চালক মিলন নিহত এবং মাহফুজ নামে আরেকজন আহত হন। বাসের চাপায় প্রাইভেটকারটি পুরো দুমড়ে–মুচড়ে যায়।
এক্সপ্রেসওয়ের ওপরে গাড়ি থামানো বা পার্কিং করা নিষিদ্ধ হলেও, চাকা পাংচার বা যান্ত্রিক ত্রুটির অজুহাতে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখার কারণে পেছন থেকে অন্য গাড়ি ধাক্কা দিচ্ছে। কিছু কিছু র্যাম্পে অব্যবস্থাপনা কিংবা অতিরিক্ত গতির বাহন নামার সময়েও দুর্ঘটনা ঘটছে। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের অপারেশন ও মেইনটেনেন্স কোম্পানি লিমিটেডের যানচলাচল, সুরক্ষা ও নিরাপত্তা বিভাগের পরিচালক ক্যাপ্টেন (অব.) হাসিব হাসান খান ইনকিলাবকে বলেন, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে চালু হয় ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে। তখন গাড়ির সর্বোচ্চ গতি ৬০ কিলো উল্লেখ ছিলো। ওই সময় এক্সপ্রেস ব্যবহারকারীরা এটিকে মনে করতো যেন একটি রানওয়ে। কারো কারো কাছে মনে হতো ৬০ ফিট সড়ক। রেস কার পর্যন্ত দাপিয়ে বেড়াতো অহরহ। দেড়শ’ থেকে দুইশ’ কিলোর গতি নিয়ে গাড়ি চলতো। এ কারণে প্রতিদিনই দুর্ঘটনা ঘটতো। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কোথাও কোথাও ৩০তলার সমপরিমাণ উঁচু রয়েছে। সেখান থেকে অতিরিক্ত গতির কোনো গাড়ি ছিটকে নিচে পড়লে পরিস্থিতি কি হতে পারে এ আশঙ্কা থেকে আমরা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে আলোচনায় বসি। এরপরে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ কিছুদিন স্প্রিড গান নিয়ে ডিউটি করে। কিন্তু হাই স্প্রিডের কারণে কোনো গাড়ি থামানো যেতো না। তখন সদ্যবিদায়ী ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার ট্রাফিকের দায়িত্বে ছিলেন। তার সাথে আলোচনায় ক্যামেরা বসানোর সিদ্ধান্ত হয়। কর্তৃপক্ষ ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ থেকে ভিডিও মনিটরিংয়ের মাধ্যমে মামলা ও তিনবার নিয়ম ভাঙলে গাড়ি নিষিদ্ধ করার কঠোর ব্যবস্থা শুরু হয়েছে। বর্তমানে মূল এক্সপ্রেসওয়েতে সর্বোচ্চ গতিসীমা ৮০ কিলো গতি নির্ধারণ করা হয়। হাসিব হাসান খান আরো বলেন, তখন গড়ে প্রতিদিন ১২শ’ থেকে ১৩শ’ গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা হতো। আমরাই প্রথম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে ভিডিও ক্যামেরার মাধ্যমে মনিটরিং এবং অটো মামলার প্রযুক্তি আবিষ্কার করি। এক্সপ্রেসওয়ের অনেক স্থানেই ‘আপনার ক্যামেরায় ভিডিও হচ্ছে’ সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি রয়েছে। কিন্তু এটাকে প্রথমে অনেকেই গুরুত্ব দেয়নি। যখন মামলার কাগজ বাসায় চলে গেছে এরপর থেকে এটা অনেকটাই কমে গেছে। এছাড়া প্রথমদিকে এক্সপ্রেসওয়েতে গাড়ির সংখ্যা ছিলো কম। যে কারণে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো হতো। এখন গাড়ির সংখ্যা বেড়েছে তাই গতিও মন্থর হয়েছে। এরপরেও শুধু গতি এবং অন্যান্য ভায়োলেশনের কারণে গড়ে ৩০–৪০টি মামলা হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, ঢাকা এক্সপ্রেসওয়ের ডিজাইন এবং কাঠামো অন্যন্ত যুগোপযোগী এবং আধুনিক। এ কারণে এখানে বড় ধরনের ঝুঁকির শঙ্কা নেই। তবে অতিরিক্ত গতিতে চালানো কারণে অনেক গাড়ির চাকা গরম হয়ে ফেটে যায়। অনেক গাড়ির যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এক্সপেসওয়েতে থেমে যায়। যে কারণে ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটছে। কিছু বাসের কন্ডিশন খারাপ। সেগুলোই দুর্ঘটনা ঘটায়। তবে এটা সত্য এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে নির্ধারিত গতি মানছে না অনেকেই।
তবে অতিরিক্ত গতির অভিযোগে সংক্রিয় ক্যামেরায় ছবি ওঠে। সেগুলো ট্রাফিক বিভাগ নিয়মিত নিয়ে যাচ্ছে এবং গতানুগতিক মামলা করা হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা সবার আগে চালকদের সচেতন হবে। আইন নিয়ে সব কিছু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটার পেছনে মূল কারণ হিসেবে বিশেষ করে এক্সপ্রেসওয়েতে গাড়ি দাঁড় করানো নিষিদ্ধ থাকলেও তা অমান্য করার কারণে বেশকিছু দুর্ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. আনিছুর রহমান ইনকিলাবকে বলেন, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে এক সময়ে দেখা গেছে সেখানে কন্ট্রোলরুম থাকলেও ছিলো না কার্যকারিতা। রাস্তায় দাঁড়িয়ে ট্রাফিক সদস্য স্প্রিড ক্যামেরাগুলো দিয়ে ছবি করলেও দ্রতগতির কারণে গাড়িগুলো থামানো যাচ্ছিল না। এছাড়া ভিডিও করা সদস্যেরও ঝুঁকি থাকতো। এছাড়া ভিডিও করা গেলেও এভিডেন্স নেয়া যেত না। এরপর থেকে এ আই ক্যামেরার মাধ্যমে ফুটেজ শুরু করে মামলা হলে ভায়োলেন্সের হার কমে আসে। কয়েকমাস আগে দৈনিক আড়াইশ’ তিনশ’ মামলা হতো এখন সেটা কমে ২৫–৩০–এর কোঠায় এসেছে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিরাপত্তায় ট্রাফিক বিভাগ আন্তরিকভাবে কাজ করছে। সড়কে আইন অমান্য করলেই অটো মামলা রেকর্ড হচ্ছে। জানতে চাইলে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হোসেন ইনকিলাবকে বলেন, ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারে এবং নিয়মিত মামলা ও অর্থ দ–ই থামাতে পারে দানবরুপি বাহনের অতিরিক্ত গতি। এজন্য প্রশাসনের সঠিক তদারকি এবং সকলের সচেতনতা জরুরি।



