কম্বাইণ্ড হারভেস্টার আসার পর কিশোরগঞ্জের হাওরে উত্তরবঙ্গ থেকে বোরো মৌসুমে শ্রমিকের আসা কমেছে। চলতি মৌসুমে যারা এসেছিলেন, তাদের বেশির ভাগ ফিরে গেছেন বৈরী আবহাওয়ার কারণে। ফলে পুরো হাওরাঞ্চল জুড়ে চলছে শ্রমিকের সংকট। যে শ্রমিকরা আছেন, তাদের দৈনিক মজুরি ৮০০ টাকা থেকে লাফিয়ে উঠেছে দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টাকায়। এই সুযোগে ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে হারভেস্টার সিন্ডিকেট। এতে জমিতে তলিয়ে যাওয়া ধান কাটায় বিপাকে পড়েছেন চাষিরা। শনিবার ইটনার বাদলা হাওরে দেখা গেছে, খোকন মিয়া নামে এক ব্যক্তি তাঁর হারভেস্টার দিয়ে কৃষকের জমির ধান কেটে দিচ্ছেন। এসব জমি একটু উঁচু জায়গায়, পানিও নেই। তাঁর ভাষ্য, এক একর জমির ধান কাটতে আট হাজার টাকা করে নিচ্ছেন। তবে স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, এটিও ডিজেলের বর্তমান দর অনুযায়ী অনেক বেশি। তারা জানান, কিছুদিন আগেও বৃষ্টির সময় হার্ভেস্টারে প্রতি একর জমির ধান কাটতে গুনতে হয়েছে ১৪ হাজার টাকা। এখনও কিছুটা পানিতে ধান কাটতে ১৪ হাজার টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। ঠাকুরগাঁও থেকে হারভেস্টার নিয়ে আসা রমজান আলীর দাবি, ডিজেলের দাম বেড়েছে। ফলে খরচও বেড়েছে। সেই অনুযায়ী ভাড়া না নিলে হারভেস্টার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।
পানিতে নেমে ধান কাটতে গেলে হার্ভেস্টারের কিছু ক্ষতিও হয়। তখন মেরামত করতে গিয়ে বাড়তি টাকা খরচ করতে হয়। চাষিরা বলেন, একদিকে শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৮০০ টাকা থেকে দেড়–দুই হাজার টাকায় উঠে গেছে। অন্যদিকে হারভেস্টার মালিকরা বাড়তি ভাড়া আদায় করছেন। তারা বাঁচবেন কী করে? আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হাওরাঞ্চলে হারভেস্টারসহ আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি কেনার ক্ষেত্রে সরকার ক্রেতাদের ৭০ ভাগ ভর্তুকি দিয়েছিল। গত তিন বছর ধরে সেই ভর্তুকি বন্ধ আছে বলে জানিয়েছেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান। তিনি জানিয়েছেন, কৃষি বিভাগ প্রতি একর জমির ধান কাটতে কৃষকের কাছ থেকে হারভেস্টার মালিকরা সর্বোচ্চ ছয় হাজার টাকা নিতে পারবেন বলে নির্ধারণ করে দিয়েছে।কৃষকদের জিম্মি করে হারভেস্টার ভাড়া আদায় করা হচ্ছে প্রায় আড়াই গুণ। কৃষকরা জানিয়েছেন, একরে ১৪ হাজার থেকে ১৬ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। নিকলীর ছাতিরচরের কৃষক জসিম উদ্দিন জানিয়েছেন, এক একর জমির ধান কাটতে হার্ভেস্টারে নিচ্ছে ১৪ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা।
ইটনার থানেশ্বরের কৃষক আবুল কাশেম জানিয়েছে, তাদের এলাকায়ও এক একর জমির ধান কাটতে ১৪ হাজার টাকা নিয়েছে। ইটনা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বিজয় কুমার হালদারের দেওয়া তথ্যমতে, স্বাভাবিক সময়ে হাওরে একটি হারভেস্টার দিয়ে এক একর জমির ধান কাটতে ১৫–১৬ লিটার ডিজেল খরচ হয়। তলিয়ে থাকা জমিতে খরচ হয় ১৭–১৯ লিটার ডিজেল। যখন প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ টাকা ছিল, তখন সামান্য কাদাপানি জমে থাকা জমির ধান কাটতে নেওয়া হতো ছয় হাজার টাকা। তখন ডিজেল বাবদ একরে খরচ হতো ১৫০০–১৬০০ টাকা। এখন লিটারে ১৫ টাকা ডিজেলের দাম বেড়েছে। সে হিসাবে প্রতি একরে ডিজেলের খরচ হচ্ছে ১৭২৫–১৮৪০ টাকা। এখন বাড়তি খরচ ২২৫–২৪০ টাকা। তবে একটু বেশি পানি জমে থাকায় এসব জমিতে বাড়তি ডিজেল খরচ হচ্ছে। এজন্য একরে বাড়তি খরচ হচ্ছে ৪৫৫–৫৮৫ টাকা। কৃষকের দাবি, কিছুটা শুকনো জমি হোক, আর পানি জমে থাকা জমি হোক– প্রতি একর জমির ধান কাটতে ছয় হাজার টাকার সঙ্গে ডিজেলের বাড়তি খরচ যোগ করে আদায় করা হোক।
সহস্রাধিক কৃষক সহায়তা পাবেন
আগাম বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কিশোরগঞ্জের হাওরের সহস্রাধিক কৃষককে কোটি টাকার বেশি জরুরি সহায়তা দেওয়া হবে। ‘এলার্ট বি৭২’ শীর্ষক ৪৫ দিনব্যাপী প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে যুক্তরাজ্য সরকার, স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা পপি ও এলার্ট ফান্ড বাংলাদেশ। কিশোরগঞ্জ জেলা পপির সমন্বয়ক মুহাম্মদ ফরিদুল আলম বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, ‘হাওর অঞ্চলে আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য জরুরি সহায়তা কার্যক্রম’ শীর্ষক এ প্রকল্পের আওতায় ইটনা ও অষ্টগ্রামের এক হাজার ২২৫ জন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে এক কোটি এক লাখ ২১ হাজার ৫২০ টাকা নগদ দেওয়া হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা করা হচ্ছে।
নাকাল ফুলবাড়ীর কৃষক
একইভাবে হারভেস্টার সিন্ডিকেটের কারণে ধান নিয়ে বিপাকে পড়েছেন দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর কৃষকরা। উপজেলার মহেশপুর গ্রামের আব্দুল মান্নানের জমির ধান পেকে গেছে। কিন্তু পানি বৃদ্ধির কারণে নিচু জমি তলিয়ে যাচ্ছে। শ্রমিক সংকটের কারণে ফসল ঘরে তুলতে পারছেন না। হারভেস্টার মেশিনে কাটার জন্য তাঁর কাছে একরপ্রতি বাড়তি পাঁচ–ছয় হাজার টাকা দাবি করা হয়েছে। বাসুদেবপুর গ্রামের বাদশা হোসেন, আমিনুল ইসলাম, মুক্তারপুরের আলম মাস্টার, কাজীহালের আবদুল আলিম, পৌর এলাকার হুসেন মিয়ার দেওয়া তথ্যমতে, কিছুদিন আগেই একরপ্রতি হারভেস্টার ভাড়া ছিল আট হাজার টাকা। এখন মালিকরা ১১–১২ হাজার টাকা নিচ্ছেন। জমি যদি সড়ক থেকে বেশি দূরে হয় ও পানিতে তলিয়ে থাকে– তবে আরও বেশি ভাড়া দাবি করা হয়।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফ আব্দুল্লাহ মোস্তাফিনের ভাষ্য, বৈরী আবহাওয়া ও নিচু জমি প্লাবিত হওয়াতে কৃষকের মধ্যে ধান কাটানোর প্রতিযোগিতা দেখা দিয়েছে। ফলে হারভেস্টার মেশিনের ভাড়াও বেড়ে গেছে।


