সবকিছু জেনেশুনেই টেক্সাসে আর্লিংটন ডালাস স্টেডিয়ামে ৭০ হাজার ৬৪৯ দর্শক হাজির। জর্ডানের বিপক্ষে ম্যাচের ৩১ মিনিটে আর্জেন্টিনা ২–০ তে এগিয়ে গেছে। সেলসোর গোলে ১–০, লাউতেরা মার্টিনেজ গোল করলেন পেনাল্টি থেকে। দুজনেরই বিশ্বকাপে প্রথম গোল। হেলাফেলা করে ৫৫ মিনিটে গোল হজম করে আর্জেন্টিনা। ফরোয়ার্ড মাউসো তামারি গোল করে জর্ডানের ফুটবলে ইতিহাস গড়লেন। তাতে কী আসে যায়, আসল চমক দেখার অপেক্ষায় দর্শক। বেঞ্চে মেসি বসে ছিলেন। বন্ধু দলের কোচ স্কালনি। ধারণা ছিল মেসি এবং স্কালনি পাশাপাশি বসবেন। কিন্তু হয়েছে তার উল্টো। দলের সবার মতোই ছিলেন মেসি। বেঞ্চের পেছনে বসেছেন। টিভি ক্যামেরা বার বার তাকে খুঁজে পেয়েছে। টিভির পর্দায় এলেই স্টেডিয়ামের দর্শকের উল্লাস। মেসিবিহীন প্রথম একাদশ নেমেছে। কখন মেসি নামবেন সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষা ফুরায় ম্যাচের ৬০ মিনিটে। ওতামেন্দি তার আর্মব্যান্ড খুলে মেসিকে দিয়ে গেলেন। মুহূর্তেই সব দৃশ্যপট ঘুরে গেল। আর্জেন্টিনা–জর্ডান ম্যাচের চিত্রনাট্যই বদলে গেল।
জর্ডানের হারানোর কিছু ছিল না, যদি সমীকরণ ১৮০ ডিগ্রি না ঘুরে যায়। আর্জেন্টিনাও আগেই ৩২–এ নকআউটে চলে গেছে, প্রতিপক্ষের নাম চমক দেখানো কেপ–ভার্দে, সেটিও জেনে গেছে দুনিয়া। তাই ম্যাচের সব রং ছিল মেসিকে ঘিরে। ফুটবলের মহানায়ক নামলেন, যেন এলেন দেখলেন জয় করলেন। ফাউলের শিকার হলেন মেসি। ৮০ মিনিটে গোল করলেন ফ্রি–কিক থেকে। চোখজুড়ানো ফ্রি–কিক। জর্ডানের ফুটবলাররা দেওয়াল দিলেন। তার পাশে মেসি তার দলের খেলোয়াড়দেরকে দাঁড় করিয়ে দিলেন। অপলক দৃষ্টি ফুটবল দুনিয়ার। কী কী জাদু দেখায় সেই অপেক্ষা। বাম পায়ের জাদুতে কী অসাধারণ ভঙ্গিতে বাঁক খেয়ে জর্ডানের জালে গেল বল। বদলি নেমে নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার গল্প লিখলেন। গোল করেই মেসি উড়লেন, শূন্যে ভাসলেন। শত শত ক্যামেরার লেন্স মেসিকে বন্দি করল ফুটবল আবেগে। এত সুন্দর ফ্রি–কিক আগেও দেখেছে ফুটবল দুনিয়া। কিন্তু কালকের দৃশ্য ছিল আরও বেশি সুন্দর।
ফুটবল যেন মেসির কথা মেনে চলে। গত ২২ জুন অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড (১৮ গোল) গড়লেন মেসি। গতকাল তৃতীয় ম্যাচে গোল করে টানা সাত ম্যাচে গোল করার রেকর্ড গড়লেন তিনি। গ্রুপ পর্বে মেসি দুই ম্যাচে ৫ গোল করলেন। সঙ্গে হ্যাটট্রিক। তার গোলসংখ্যা ৬। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস ও ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে একটি করে গোল করেছিলেন মেসি। লুসাইল স্টেডিয়ামে ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালে মেসি জোড়া গোল করলেন। এবার ২০২৬ বিশ্বকাপেও সেই মেসির ছুটে চলা দেখেছে ফুটবল বিশ্ব। প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক, দ্বিতীয় ম্যাচে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল। আর গতকাল রবিবার জর্ডানের বিপক্ষে ফের জাল কাঁপানো, ব্যাস। ছন্দে থাকা মেসি টানা সাত ম্যাচে গোলের রেকর্ড স্পর্শ করে ফেলেন। কে জানতে চায় আগের রেকর্ড কে কবে করেছেন। সবার আনন্দ–উল্লাস বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় তারকাকে ঘিরে। তবু উল্লেখ করতে হয়, এর আগে বিশ্বকাপে টানা ছয় ম্যাচে গোল করার এই রেকর্ড ছিল ব্রাজিল এবং ফ্রান্সের দুই কিংবদন্তির পকেটে। প্রথম রেকর্ডটি হয়েছিল ১৯৫৮ সুইডেন বিশ্বকাপে। টানা ছয় গোলের প্রথম রেকর্ড গড়েন ফরাসি ফুটবলার জুস ফঁতে।
১২ বছর পর মেক্সিকোতে ১৯৭০ বিশ্বকাপে টানা ছয় ম্যাচে গোল করার রেকর্ড গড়েন ব্রাজিলের জাইরজনিহোও। সেবার ব্রাজিল তৃতীয় বার বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হয়। এসব রেকর্ড ভেঙে দিলেন বিশ্বকাপ ফুটবলের সবচেয়ে বড় তারকা মেসি। ৪৮ দেশের ১২ গ্রুপের লড়াইয়ে আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স ও মেক্সিকো গ্রুপের সব ম্যাচ জিতেছে। ‘জে’ গ্রুপ থেকে নকআউট পর্বে মেসিরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। তাদের সঙ্গে নকআউটে গেছে অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়া।


