হাসপাতালের বিছানায় নিথর পড়ে ছিল সাড়ে পাঁচ বছর বয়সী আব্দুর রহমান। ডাকে সাড়া নেই, চোখে কোনো চেতনা নেই। পাশে বসে থাকা মা অসহায় কণ্ঠে বলছিলেন, ‘আগে ওজন ছিল ১২ কেজি, এখন মনে হয় ৮ কেজিও নেই। ডাকছি, কিছুই শুনছে না।’ এই মর্মান্তিক পরিণতির শুরু ছিল খুব সাধারণ একটি ঘটনা; বাড়িতে পালা বিড়ালের একটি আঁচড়। তখন কেউ গুরুত্ব দেয়নি। কয়েক সপ্তাহের লড়াই শেষে গত বৃহস্পতিবার মৃত্যু হয় শিশুটির। এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ট্র্যাজেডি নয়; বরং দেশে দ্রুত বাড়তে থাকা এক নীরব সংকটের প্রতিচ্ছবি- জলাতঙ্ক। এক সময় জলাতঙ্ক মানেই ছিল কুকুরের কামড়। কিন্তু সেই ধারণা এখন বদলে গেছে। মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্য বলছে, অ্যান্টি-রেবিস ভ্যাকসিন নিতে আসা রোগীদের প্রায় ৬০ শতাংশই বিড়ালের কামড় বা আঁচড়ে আক্রান্ত। কয়েক বছর আগেও এই হার ছিল মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ। হাসপাতালের এক নার্স জানান, ‘এখন যারা আসছেন, তাদের বড় অংশই বাসার পোষা বিড়ালের কারণে আক্রান্ত। অনেকেই শখ করে বিড়াল পালন করছেন, কিন্তু টিকা দেওয়ার বিষয়ে উদাসীন।’
গত ৩-৪ বছরে এই প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে জলাতঙ্কে আক্রান্ত হন ৯৪ হাজার ৩৮০ জন এবং মারা যান ৪২ জন। ২০২৪ সালে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ২২ হাজার ২৬৩ জন এবং মৃত্যু হয় ৫৮ জনের। ২০২৫ সালে আক্রান্ত হন ১ লাখ ৪৬ হাজার ২৪৩ জন, মৃত্যু হয় ৫৯ জনের। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ৩৬ হাজার ৭৫১ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ১৯ জনের। বর্তমানে প্রতিদিন নতুন করে ৭০০ থেকে ৮০০ রোগী হাসপাতালে আসছেন। পুরনো রোগীসহ দৈনিক সংখ্যা প্রায় দেড় হাজারে পৌঁছেছে। অনেকেই মনে করেন, ঘরের মধ্যে থাকা পোষা প্রাণীর মাধ্যমে জলাতঙ্ক ছড়ায় না। তবে চিকিৎসকরা এই ধারণাকে ভুল বলে উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, টিকাবিহীন যে কোনো প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ই ঝুঁকিপূর্ণ। ২৭ বছর বয়সী কবিতা আক্তার চার বছর ধরে বিড়াল পালন করলেও কখনও টিকা দেননি। তার যুক্তি ছিল, ‘বিড়াল তো বাইরে যায় না।’ এই ধারণাই এখন তাকে ঝুঁকিতে ফেলেছে।
নিজের পোষা বিড়ালের আঁচড়ে রক্ত বের হওয়ার পরই তিনি হাসপাতালে ছুটে আসেন। মিরপুরের বাসিন্দা শাহরিয়াও একই অভিজ্ঞতার কথা বলেন। প্রথমে গুরুত্ব না দিলেও পরে চিকিৎসকের পরামর্শে টিকা নিতে বাধ্য হন। কুড়িগ্রামের এক কিশোরীর ঘটনাও একই বার্তা দেয়। পরিবারের অবহেলার কারণে পোষা বিড়ালের আঁচড়ের পর দেরিতে চিকিৎসা নিতে আসে সে। ততক্ষণে অনেকটা দেরি হয়ে গেছে। জলাতঙ্ক একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা সাধারণত আক্রান্ত প্রাণীর লালার মাধ্যমে ছড়ায়। কামড় বা আঁচড়ের মাধ্যমে ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করে স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছে যায়। চিকিৎসকদের ভাষ্য, কামড়ের পর লক্ষণ প্রকাশ পেতে সাধারণত ২ থেকে ৩ মাস সময় লাগে। কখনও কখনও এক সপ্তাহ থেকে এক বছর পর্যন্তও লাগতে পারে। লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার পর রোগীকে বাঁচানো প্রায় অসম্ভব। তবে কামড় বা আঁচড়ের পরপরই ক্ষতস্থান সাবান-পানি দিয়ে ধুয়ে দ্রুত ভ্যাকসিন নিলে এই রোগ শতভাগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর প্রায় ৫৫ হাজার মানুষ জলাতঙ্কে মারা যান।
বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ৪০ থেকে ৫০ জনের মৃত্যু হয়। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, কুকুর ও বিড়ালের জন্য রেবিস ভ্যাকসিনের মজুদ গত বছরের এপ্রিলে শেষ হয়ে গেছে। ফলে টিকাদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। নতুন প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে, তবে মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম শুরু হতে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত লেগে যেতে পারে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তা জানান, ২০২৩ সাল থেকে তারা কোনো টিকা পাচ্ছেন না। ঢাকার বাইরেও একই চিত্র বিরাজ করছে। গাজীপুর জেলা ভেটেরিনারি হাসপাতালের সার্জন ডা. মো. মোকলেছুর রহমান জানান, গত ২০-২২ বছরে তাদের হাসপাতালে কুকুর ও বিড়ালের জন্য কোনো ভ্যাকসিন সরবরাহ করা হয়নি। কেবল মুরগি ও গরুর ভ্যাকসিনই পৌঁছায়। অথচ বাস্তবতা হলো, সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন কুকুর ও বিড়ালের ভ্যাকসিন, যা দীর্ঘদিন ধরেই উপেক্ষিত রয়ে গেছে। এদিকে মানুষের জন্য টিকার কেন্দ্র থাকলেও কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে টিকা সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
সারাদেশে ৪১৬টি কেন্দ্রে টিকা দেওয়া হলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় ভাণ্ডারে এখন কোনো টিকা নেই। কেন্দ্রগুলোকে নিজস্ব বাজেট থেকে টিকা কিনতে বলা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও সিটি করপোরেশনের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের জনস্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, রাজধানীতে ঠিক কতটি বেওয়ারিশ কুকুর রয়েছে বা কোন এলাকাগুলো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ- এ বিষয়ে তাদের কাছে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য বা ডাটাবেজ নেই। অন্যদিকে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার এক কর্মকর্তা জানান, নতুন পরিকল্পনায় শুধু মানুষের টিকাদানকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। কুকুর ও বিড়ালের টিকাদান এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আপাতত এই পরিকল্পনার বাইরে রাখা হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু মানুষকে টিকা দিয়ে জলাতঙ্ক নির্মূল করা সম্ভব নয়। প্রাণীর টিকাদান নিশ্চিত করাই এ রোগ প্রতিরোধের মূল উপায়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই কৌশলকে ‘ভুল পদ্ধতি’ বলছেন। তাদের বক্তব্য স্পষ্ট উৎসমুখ বন্ধ না করলে মানুষকে টিকা দিয়ে এই রোগ নির্মূল করা সম্ভব নয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, কোনো এলাকায় টানা তিন বছর ৭০ শতাংশ কুকুরকে টিকার আওতায় আনলে সেই অঞ্চলকে জলাতঙ্কমুক্ত করা সম্ভব। বাংলাদেশে এই হার এখন শূন্যের কোঠায়। জিগাতলার বাসিন্দা সারোয়ার জুয়েল বলেন, এলাকায় বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ফলে বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। তার ভাষ্য, আগে সিটি করপোরেশন থেকে নিয়মিত কুকুরদের টিকা দেওয়া হতো, কিন্তু গত কয়েক বছরে এমন কোনো কার্যক্রম চোখে পড়েনি। দ্রুত টিকাদান কর্মসূচি শুরু না হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। বিড়াল বা কুকুর পালন করলে নিয়মিত জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা দিতে হবে এবং প্রতিবছর বুস্টার ডোজ নিশ্চিত করতে হবে। একদিকে সরকারি টিকার ভাণ্ডারে টান, অন্যদিকে ঝাড়ফুঁক-কবিরাজির ওপর সাধারণ মানুষের নির্ভরতা এই দুইয়ের মাঝে জলাতঙ্ক আজ একটি গভীর জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে প্রতিদিন যে শত শত মানুষ ভিড় করছেন, তাদের বড় একটি অংশই শিশু।

