দেশে তেলের কোনো প্রকৃত সংকট না থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের ইরানযুদ্ধকে কেন্দ্র করে ছড়ানো গুজব এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধির খবরের প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের মনে। ফলে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরের পেট্রলপাম্পগুলোতে দেখা দিয়েছে অস্বাভাবিক ভিড়। গাড়ির দীর্ঘ সারি কখনও মহাখালী পর্যন্ত, কখনও আবার তেজগাঁও থেকে ধানমন্ডি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করে তেল তোলার জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী দেশে দুই সপ্তাহের তেলের মজুদ রয়েছে, কিন্তু আতঙ্কজনিত অতিরিক্ত ক্রয় এবং গুজবের কারণে পরিস্থিতি সাময়িকভাবে ততটা স্বাভাবিক নয়। ইরানযুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলে দাম বাড়ছে। সংকট তৈরি হয়েছে দেশে দেশে। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম ঘটনি। তেলের মুজদ অন্তত দুই সপ্তাহ থাকলেও মানুষ গুজবে বেশি করে তেল কিনে মজুদ করা শুরু করে। সরকারের পদক্ষেপের অংশ হিসেবে মোবাইল কোর্ট চালু থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন, ক্ষেত্রবিশেষে সেনাবাহিনী নিয়োগ দেয়। ফিলিং স্টেশনগুলোয় তেল বিক্রিতে পরিমাপ নির্ধারণ করে দিয়েছে।
এ অবস্থায় গাড়িতে তেল নিতে দীর্ঘ লাইন ধরতে হচ্ছে গ্রাহকদের। জ্বালানি তেল নিয়ে মানুষের মধ্যে যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে তা দ্রুতই শেষ হয়ে যাবে বলে মনে করছেন জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, ইতোমধ্যে ২৭ হাজার ২০৪ মেট্রিক টনের একটি ডিজেলের জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে এসে তেল খালাস করেছে। সেই তেল দেশের বিভিন্ন ডিপোয় পাঠানো শুরুর প্রক্রিয়া চলছে। আরও একটি ২৭ হাজার মেট্রিক টনের জাহাজ বন্দরে এসে নোঙর করবে। জ্বালানি বিভাগের দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, দেশে জ্বালানি তেলের তেমন কোনো সংকট নেই। মানুষ আতঙ্কিত হয়ে বেশি তেল কেনার কারণে সরকার তেল বিক্রিতে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। ফলে পেট্রলপাম্পগুলোতে মানুষের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। পাইপলাইনে থাকা জাহাজগুলো আসতে থাকলে সেই বিধিনিষেধও তুলে নেওয়া হবে। গতকালও দেশের অধিকাংশ পেট্রলপাম্পে দীর্ঘ গাড়ির লাইন দেখা যায়। তেজগাঁও এলাকায় একটি ফিলিং স্টেশনের দেখা যায় লম্বা লাইন মহাখালী পর্যন্ত চলে গেছে। একাধিক গাড়ির ড্রাইভারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তেল নিতে কয়েকঘণ্টা অপেক্ষা করছেন। নারায়ণগঞ্জের গোদনাইলের ডিপোগুলোয় রাজনৈতিক নেতাদের হস্তক্ষেপের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মেঘনা ডিপোর এক কর্মকর্তা বলেন, কোন গাড়িকে আগে তেল দেওয়া হবে সেটা ডিপোকেন্দ্রিক দুয়েকজন নেতা ঠিক করে দিচ্ছেন। আগে তেল দেওয়ার ব্যবস্থা হিসেবে প্রতি গাড়ি থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ, বাজারে স্বাভাবিকতা বজায় রাখা এবং অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে মনিটরিং ও কন্ট্রোল সেল গঠন করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের নির্দেশনায় বিপিসি এবং তাদের অধীনস্থ বিপণন কোম্পানিগুলোর সমন্বয়ে এই বিশেষ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। গতকাল সোমবার এ–সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি হয়েছে।
মজুদ ও বিক্রির তথ্য
নতুন ব্যবস্থার আওতায় আঞ্চলিক কন্ট্রোল সেলগুলো প্রতিদিন তাদের অধীনস্থ ডিপোগুলোর পেট্রোলিয়াম পণ্যের মজুদ, সরবরাহ ও বিক্রির তথ্য সংগ্রহ করবে। এতে ডিপোর স্থলভাগের সংরক্ষণ ট্যাংকে থাকা জ্বালানি এবং জাহাজে থাকা ভাসমান মজুদের তথ্যও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। পাশাপাশি প্রতিদিন কত পরিমাণ জ্বালানি ডিপো থেকে বিভিন্ন ডিলার ও এজেন্টের কাছে সরবরাহ করা হয়েছে এবং খুচরা পর্যায়ে বিক্রির পরিস্থিতি কী সেসব তথ্যও কেন্দ্রীয় সেলে পাঠানো হবে। কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেল এসব তথ্য সমন্বয় করে সার্বিক মজুদ ও সরবরাহ পরিস্থিতির প্রতিবেদন তৈরি করবে। পরে সেই প্রতিবেদন নিয়মিতভাবে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সরকারি সংস্থার কাছে পাঠানো হবে। এ বিষয়ে জানতে গতকাল সরকারের গঠিত কেন্দ্রীয় মনিটরিং ও কন্ট্রোল সেল–১ এর কর্মকর্তা জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব এ কে এম ফজলুল হকের কাছে জানতে চাইলে তিনি ব্যস্ততা দেখিয়ে ফোন রেখে দেন। তবে বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশন) মনিটরিং ও কন্ট্রোল সেলের মুখ্য সমন্বয়কারী মুহাম্মদ মোর্শেদ হোসাইন আজাদ আমাদের সময়কে বলেন, তেল নিয়ে প্রকৃত অর্থে কোনো টেনশন নেই। ইতোমধ্যে ২৭ হাজার ২০৪ মেট্রিক টন ডিজেলের জাহাজ এসে পৌঁছেছে। সেটা খালাস করা হয়েছে। আগামীকাল আরেকটি আসছে। এ ছাড়া ভারত থেকে ৫ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল পাইপলাইনে নুমালীগড় থেকে পাম্পিং শুরু হয়েছে। সেটা এসে পৌঁছাবে। তিনি আরও বলেন, এ ছাড়া ১০ মার্চ থেকে ২৭ মার্চ পর্যন্ত আরও অন্তত ৮টি জাহাজে দুই লাখ ১৭ হাজার মেট্রিক টনের জ্বালানি তেল আসার কথা। বিপিসির পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হচ্ছে। আশা করছি এগুলো এসে পৌঁছাবে।
কৃষি সেচ মৌসুমে বিশেষ নজর
এদিকে চলমান কৃষি সেচ মৌসুমে ডিজেলের চাহিদা বাড়ে। এ সময় কৃষকদের জ্বালানি সরবরাহে যাতে কোনো বিঘ্ন না ঘটে, সে বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী, ডিপো থেকে ডিলার ও এজেন্টদের কাছে কত পরিমাণ জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়েছে এবং সেগুলোর বিক্রির তথ্য আঞ্চলিক কন্ট্রোল সেল থেকে সংশ্লিষ্ট জেলার জেলা প্রশাসকদের কাছেও নিয়মিত পাঠানো হবে। পাচার ও ভেজাল ঠেকাতে নজরদারি জ্বালানি তেলের মজুদ, বিতরণ, পাচার কিংবা ভেজাল–সংক্রান্ত কোনো তথ্য পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে কন্ট্রোল সেলকে জানানো যাবে। প্রাপ্ত তথ্য যাচাই করে প্রয়োজন অনুযায়ী আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে বিপিসি।
চট্টগ্রামে কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেল
বিপিসির কেন্দ্রীয় মনিটরিং ও কন্ট্রোল সেল চট্টগ্রামের সল্টগোলা রোডে অবস্থিত বিপিসির বিএসসি ভবনে স্থাপন করা হয়েছে। এ সেলের মুখ্য সমন্বয়কারীর দায়িত্বে রয়েছেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব এ কে এম ফজলুল হক। তার সঙ্গে বিপিসির বণ্টন ও বিপণন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া বিপিসির নিজস্ব মনিটরিং সেলেও বণ্টন ও বিপণন বিভাগের মহাব্যবস্থাপক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করছেন।
পাঁচ অঞ্চলে আঞ্চলিক কন্ট্রোল সেল
কেন্দ্রীয় সেলের পাশাপাশি দেশের পাঁচটি অঞ্চলে পৃথক আঞ্চলিক কন্ট্রোল সেল গঠন করা হয়েছে। এগুলো হলোÑ ঢাকা, বগুড়া, খুলনা, সিলেট ও বরিশাল। ঢাকা অঞ্চলের কন্ট্রোল সেল মতিঝিলে অবস্থিত মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের আঞ্চলিক কার্যালয়ে স্থাপন করা হয়েছে। এখানে বিভিন্ন বিপণন কোম্পানির সহকারী মহাব্যবস্থাপক ও ব্যবস্থাপক পর্যায়ের কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করছেন। একইভাবে বগুড়া অঞ্চলের কন্ট্রোল সেল উপশহরে অবস্থিত মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের আঞ্চলিক কার্যালয়ে, খুলনা অঞ্চলের সেল খালিশপুরে, সিলেট অঞ্চলের সেল শাহজালাল উপশহরে এবং বরিশাল অঞ্চলের সেল বান্দরোডে স্থাপন করা হয়েছে।
সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন এই মনিটরিং ব্যবস্থা চালু হলে জ্বালানি তেলের মজুদ ও সরবরাহ পরিস্থিতি সম্পর্কে সরকারের কাছে প্রতিদিনের হালনাগাদ তথ্য থাকবে। এর ফলে বাজারে গুজব, কৃত্রিম সংকট বা মজুদদারির মতো পরিস্থিতি দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে। তাদের মতে, কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে সমন্বিত এই তদারকি ব্যবস্থা জ্বালানি তেল সরবরাহ ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করবে এবং দেশের বাজারে স্বাভাবিকতা বজায় রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
অকটেন সংকটে সন্দ্বীপ নৌ–রুটে স্পিডবোট চলাচল বন্ধ
সন্দ্বীপ (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম নৌ–পথ। সন্দ্বীপের (কুমিরা–গুপ্তছড়া) নৌ–রুটে প্রতিদিন যাত্রী ও মাল পরিবহনে স্পিডবোট, কাঠের বোট ও মালবাহী নৌযান চলাচল করে। অকটেন সংকটের কারণে গতকাল সোমবার থেকে এ নৌ–রুটে যাত্রীবাহী স্পিডবোট চলাচল বন্ধ করে সামাজিক মাধ্যমে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তবে স্পিডবোট চলাচল বন্ধ থাকলেও সরকারি সংস্থা বিআইডব্লিউটিসি পরিচালিত শিপ মালঞ্চ এবং ফেরি কপোতাক্ষ যথানিয়মে চলাচল করেছে (বাঁশবাড়িয়া–গুপ্তছড়া) নৌ–রুটে। এর বাইরে পণ্যবাহী কাঠের বোট চলছে। এসব বোট দিয়েও লোকজন যাতায়াত করছেন। সীতাকুণ্ড থেকে সন্দ্বীপে দ্রুত যাতায়াতের জন্য স্পিডবোট ব্যবহার করা হয়। শিপ বা কাঠের বোটে করে এ রুটের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত যেতে এক ঘণ্টার বেশি সময় লাগলেও স্পিডবোটে যেতে লাগে মাত্র ২০ মিনিট। স্পিডবোট মালিক কর্তৃপক্ষ মের্সাস আর.কে এন্টারপ্রাইজের পরিচালক জগলুল হোসেন নয়ন বলেন, গত বৃহস্পতিবার আমরা তেল এনেছিলাম। গতকাল আবার তেল সংগ্রহের জন্য পে–অর্ডার নিয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু সেটি ফেরত দেওয়া হয়েছে। শহরের বিভিন্ন পেট্রলপাম্পে আগে যেখানে ১০ ভাউচারে তেল দেওয়া হতো, এখন দেওয়া হচ্ছে অর্ধেক ভাউচার, প্রায় ৪৫০০ লিটার। আবার হাইওয়ে এলাকার পাম্পগুলোতে কোনো অকটেনই দেওয়া হচ্ছে না।
জ্বালানি তেলে অনিয়ম রোধে ডিসিদের ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার নির্দেশ
জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদ ও অতিরিক্ত দামে বিক্রি রোধে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। গতকাল এ নির্দেশনা দিয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে দেশের সব জেলা প্রশাসকের কাছে চিঠি পাঠানো হয়। এর আগে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে চিঠি দেয় জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ। ডিসিদের কাছে পাঠানো মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের চিঠিতে বলা হয়, জ্বালানি তেলের বাজারে শৃঙ্খলা বজায় রাখা ও কৃত্রিম সংকট প্রতিরোধের লক্ষ্যে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদ, নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত মূল্যে বিক্রি, খোলাবাজারে বিক্রি বন্ধ ও পাচাররোধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ থেকে অনুরোধ জানানো হলো।


