তিন দিন আগে ২৭০–২৮০ টাকা কেজি দরে কেনা মাল্টার দাম গতকাল ৩০০ টাকা শুনে দোকানির সঙ্গে এক রকম বাগ্বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন বেসরকারি চাকরিজীবী মো. মোস্তাক আহমেদ। শেষমেশ মাল্টা না কিনেই বাড়ির পথ ধরেন তিনি। কথা হলে বাসাবো এলাকার এ বাসিন্দা বলেন, গত বৃহস্পতিবার মাল্টা কিনেছি ২৭০ টাকা কেজি দরে। আজ (রবিবার) সেই মাল্টার দাম ৩০ টাকা বেড়ে ৩০০ টাকা হয়ে গেছে। কিচ্ছু না, স্রেফ রোজার মাস শুরু হওয়ায় দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এটা রীতিতে পরিণত হয়েছে, আক্ষেপের সঙ্গে বলেন তিনি।
ইফতারে ফলের আয়োজন রাখতে গতকাল বাজারে গিয়ে দাম শুনে মোস্তাকের মতো অনেকেই হতাশ। আগে থেকেই ফলের বাজার ছিল চড়া। আপেল, মাল্টা, কমলা, আঙুর, আনারের মতো ফল বিলাসী পণ্যে পরিণত হয়েছে। এর পরও গতকাল প্রথম রোজার ইফতারে অল্প করে হলেও ফল রাখতে বাজারে ভিড় করেন অনেকেই। কিন্তু রোজাকে কেন্দ্র করে চড়া ফলের বাজারে রীতিমতো আগুন লেগেছে। গতকাল বেশ কয়েকটি দোকান ঘুরে দেখা গেছে, ক্রেতাদের অনেকেই দাম শুনে ফিরে যাচ্ছেন। কেউ আবার দোকানির সঙ্গে তর্কে জড়াচ্ছেন। কেউবা ক্ষুব্ধ হয়ে আর ফল খাবেন না বলে পণ করছেন। কদমতলী এলাকার বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী কৌশিক আহমেদ বলেন, রোজা শুরু হতে না হতেই ২৭০–২৮০ টাকার মাল্টা ৩০০–৩২০ টাকা হয়ে গেছে, কমলার কেজি ২৫০ থেকে বেড়ে ২৮০ টাকা হয়ে গেছে। গেলাম দেশি ফলের বাজারে। ডাবের দাম এক লাফে ২০–৩০ টাকা বেড়েছে। এক পিস বেলের দামও চাইছে ১৫০ টাকা। সামান্য কলার দামেও আগুন। রোজা শুরু হয়েছে বলে এভাবে দাম বাড়বে? সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আর ফলই খাব না।
রাজধানীর মালিবাগ, পল্টন, কারওয়ানবাজারসহ বিভিন্ন বাজারে খোঁজ নিয়ে এবং খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাত্র দুদিনের ব্যবধানে বিদেশি তো বটেই, দেশি ফলের দামও বেড়েছে। গতকালের খুচরা বাজারে আপেলের কেজি প্রকারভেদে (ফুজি, গ্রিন ও গালা) ৩২০ থেকে ৪৫০ টাকা, মাল্টা ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা, কমলা ২৮০ টাকা, চায়না কমলা ৩০০ টাকা, কালো আঙুরের কেজি ৪৬০ টাকা এবং সবুজ আঙুরের কেজি ৩৪০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। কারওয়ানবাজারের ফল বিক্রেতা মো. হারুনুর রশিদ বলেন, এতদিন বাজার একটা জায়গায় স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু গত শুক্রবার থেকে দাম বাড়তে শুরু করে। মাত্র দুদিনে আপেল, মাল্টা থেকে শুরু করে বিদেশি সব ফলের কেজিতে ২০ থেকে সর্বোচ্চ ৫০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। দুই দিন আগেও আপেলের কেজি প্রকারভেদে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা বিক্রি হয়েছিল এবং মাল্টা ২৭০ থেকে ২৮০ টাকা। এ ছাড়া কমলা ২৫০, কালো আঙুর ৪০০ টাকা এবং সবুজ আঙুর ৩০০ টাকার আশপাশে বিক্রি হয়েছিল।
দাম কেন বেড়েছে? এ প্রশ্নের যৌক্তিক কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারলেন না এই বিক্রেতা। শুধু বললেন, পাইকারিতে দাম বেড়ে যাওয়ায় খুচরায় তাদেরও বাড়াতে হয়েছে। হঠাৎ দাম বাড়ার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মো. জুদান আহমেদ ও কামরুজ্জামানসহ বাদামতলীর পাইকারি বিক্রেতারা জানান, এখন আপেলের মৌসুম না। অপরদিকে মাল্টার সরবরাহ থাকলেও শুল্কের কারণে দাম বাড়তি পড়ছে। এ ছাড়া রোজা উপলক্ষে অনেক খুচরা বিক্রেতার মাঝে বাড়তি দামে বিক্রির প্রবণতা রয়েছে। তবে শিগগিরই শুল্ক কমে আসবে। তখন দাম কমে আসবে।
কথা হলে বাংলাদেশ ফ্রেস ফ্রুট ইম্পোর্টারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, সম্প্রতি বন্দরে জাহাজ আটকে যাওয়ায় রমজানের কিছু ফল খালাস হতে বিলম্ব হয়েছে। এতে বাজারে আমদানিকৃত ফলের দাম কিছুটা বেড়েছে। তবে এখন সব কিছু স্বাভাবিক রয়েছে। পাইকারিতে আজ (রবিবার) থেকেই দাম কিছুটা কমেছে। অপরদিকে শুল্ক কমানো হলেও এখনও তা কার্যকর হয়নি। এটি কয়েক দিনের মধ্যে কার্যকর হবে, তখন আমদানিতে খরচ কম পড়বে। দামও কেজিপ্রতি ৩০–৪০ টাকা কমে আসবে।
এবার রোজায় পর্যাপ্ত আমদানি রয়েছে, ঘাটতি নেই বলে জানান সিরাজুল ইসলাম। বলেন, মিশর থেকে মাল্টা, ভারত থেকে কমলা, আঙুর ও আনার, চীন থেকে আপেল আনা হচ্ছে। আপেল ও কমলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখন আপেলের মৌসুম না। চীন থেকে কিছু আপেল আসছে, পরিমাণে কম। সামনে সাউথ আফ্রিকা থেকেও আপেল আসছে। অন্যান্য উৎস দেশ থেকে বিভিন্ন ফল আসছে। এগুলো পনেরো রোজা নাগাদ বাজারে ঢুকবে। তখন দাম কমে আসবে।
এদিকে রোজা শুরু হতেই বিদেশি ফলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে দেশি ফলের দাম। খুচরা বাজারে প্রতি পিস ডাবে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেড়েছে। ছোট আকারের এক পিস ডাব কিনতে ১২০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে। আর বড় আকারের ডাবের দাম আরও বেশি হাঁকা হচ্ছে। কিছু দিন আগে ৮০–৯০ টাকায় বিক্রি হওয়া সাগরকলার ডজন এখন ১২০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না। পেয়ারা কেজিও শতক ছুঁয়েছে। বেড়েছে পেঁপে ও আনারসের দামও। অপরদিকে রোজায় শরবতে ব্যবহৃত ফল পাকা বেলের দাম আকারভেদে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত রাখা হচ্ছে। দেশি ফলের বিক্রেতা কদমতলীর মো. নূর আলম বলেন, প্রথম রোজা। তাই পাইকারি থেকে শুরু করে খুচরা সবখানেই দাম একটু বাড়তি। কয়েক দিন গেলেই দাম কমে আসবে। কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, রোজা এলেই এক শ্রেণির অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ী অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়িয়ে দেন। এটাকে ব্যবসা বলে না। বাজার মনিটরিংয়ের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তারা এগুলো করছে। এতে ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বাজারে মনিটরিং জোরদার করতে হবে। সেই সঙ্গে ব্যবসায়ীদেরও নৈতিকভাবে ব্যবসা করতে হবে।


