আলোর মেঘলা যেমন আঁধারমুক্ত থাকে, অবশ্যই তা অন্ধকার মুক্ত রাখতে হবে, তেমনই সুসমাচার প্রচারমূলক প্রতিষ্ঠান বা প্রচেষ্টা অবশ্যই রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক কর্মকান্ডের প্রভাব ও আওতামুক্ত রাখতে হবে, আর তা করতে হবে তেমন প্রতিষ্ঠান বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে।
সূদীর্ঘ ৫০ বৎসরের আন্দোলনে আমার যে ক্ষুদে অভিজ্ঞতা ঘটেছে, তার আলোকে উক্ত সিন্ধান্তটি টানার সাহস পেলাম। একটি কচি ডাব যখন ঝুনো হয়ে যায়, তখন তার পক্ষে ডাবের জল পরিবেশন করা আর সম্ভব নয়, অবশ্য ঝুনো নারকেলে জল থাকে, তবে উক্ত জলের স্বাদ আর কচি ডাবের জলের স্বাদ এক হবার নয়।
ঈসাই জীবনে যাত্রারম্ভে কোনা এক পরিবার অতি প্রতে্যুষে আরাধনামূলক ভক্তি সংগীত দিয়ে দিন শুরু করতো, কালে কালে তেমন পরিবার অর্থ-বিত্তের দাপটে আজ ধরাকে সরা ভেবে বসে আছে, যে দৃশ্যপট বিবেকবান ব্যক্তিকে বেসামাল আগ্নেয়গীরিতে পরিণত করে তুলছে। জীবন্ত ছানা ডিমের খোলসের মধ্যে বেড়ে ওঠে বটে, তবে উক্ত বাচ্চার জীবন যদি চলমান থাকে, তবে এক সময় বন্দি শিবির চৌচির হয়ে পড়বে, প্রবৃদ্ধির বহির্মূখী চাঁপে, যা খোলসের পক্ষে ধরে রাখা সম্ভব নয়।
জীবন মানে প্রাণ, আর প্রাণ হলো খোদা, যিনি অতীতে ছিলেন, বর্তমানে আছেন আর অনন্তকাল ধরে থাকবেন। মৃত্যু যেন আঁধারপুরী, অবাধ্যতা, গোয়ার্তুমি, সত্য মেনে নিতে দেখি চরম আপত্তি, যা হলো অভিশপ্ত ইবলিসের কারসাজি। আলো ও অন্ধকার যেমন একত্রে অবস্থান করতে পারে না, একের আগমন অন্যের বিয়োগ, একইভাবে সত্য ও মিথ্যা এক ঘরে বাসবাস করতে পারে না। হয় সত্য থাকবে, মিথ্যার হবে বিলোপ, নতুবা মিথ্যার হবে জয়, সত্য হবে কবরপ্রাপ্ত। সত্য-মিথ্যা একসূত্রে কেউ গাঁথতে পারে নি এবং তেমন প্রচেষ্টা কেবল বোকামি ও ব্যার্থ প্রয়াস।
সত্যের প্রকৃত সৈনিক হলেন খোদাবন্দ হযরত ঈসা মসিহ! তিনি কি পেরেছিলেন সত্যের দ্যূতি মিথ্যাচারের খোলসে আবৃত করে রাখতে; যদি তেমন কিছু করা সম্ভব হতো, তবে হয়তো মর্মবিদারক সলিবে তাঁকে প্রাণ দিতে হতো না। মাত্র ৩৩ বৎসর বয়সের এক যুবক জনমনে সত্য প্রতিষ্ঠা ও প্রচারের জন্য তদানীন্তন সমাজ ব্যবস্থা যা কেবল ডুবে ছিল অন্যায়, অত্যাচার, জোর-জুলুমের ধারক-বাহক রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্প্রদায়ের হাতে, তেমন গুনাহগারদের হাতে প্রাণ দিতে হলো! মিথ্যার সাথে তিনি সমঝোতা করেন নি, যতই ত্রিশঙ্কু অবস্থা আসুক না কেন বা যতই মূল্য দিতে হোক না কেন। সত্য চিরস্থায়ী, সত্য নিত্যস্থায়ী, সত্য অবিনশ^র, মিথ্যা কেবল ঠুনকো মরিচীকা, বায়ু ভর্তি ফানুস মাত্র। যারা খোদার নির্ভরযোগ্য কালামের উপর থাকে নির্ভরশীল, মিথ্যার সাথে আতাত গড়ার কোনো প্রয়োজন থাকে না তাদের। সত্য বরাবর স্বীয় পথে একাই চলে, যেথা মিথ্যার থাকে না প্রবেশাধিকার।
বতর্মান বিশ্বটা একটা মিথ্যার প্লাটফর্ম। যার শুরু হয়েছে অবাধ্যতা, মিথ্যাচার, ছলচাতুরী, প্রতারণার মাধ্যমে, পথিমধ্যে তা যতই অপরূপা হোক না কেন, পরিণতি অবশ্যই কুৎসিত কদাকার হতে বাধ্য। সত্যের সেনানী তেমন পরিণতির দিকে নির্বিবাদে, নিরবে, নিস্ক্রিয় অবস্থায় এগোতে পারে না। হাত-পা বেঁধে সাগরে ফেলে দেয়া এক কথা, আর অপরাধের রাজ্যে হৃষ্টচিত্তে কুটিলদের দরবারে নর্তনকুর্দন করা, মতিভ্রম ছাড়া আর কিছুই নয়।
ধর্ম শব্দের প্রকৃত অর্থ যদি কারো জানা থাকে তবে তেমন ক্ষেত্রে স্বপক্ষে বিপক্ষে একটা প্রতিক্রিয়া অবশ্যই থাকবে। সবুজ কলা যদি ভিতর থেকে পাঁকতে শুরু করে তবে একটু একটু করে তার বাহিরের বর্ণ-পরিবর্তন অবশ্যই হবে, পরিবর্তন ঠেকাবার কৌশল আমার জানা নেই।
বলতে চাই না, আজ আমি জীবন যুদ্ধে পর্যুদস্থ। তবে যুদ্ধ করার জন্য অত্যাবশ্যকীয় সমরাস্র শক্ত হাতে ধরে রেখেছি। আমাদের এ যুদ্ধ কোনো রক্ত মাংসের বিরুদ্ধে আহুত নয়। আমাদের যুদ্ধ ইবলিসের সকল চাতুরির বিরুদ্ধে। ইবলিসের ছুড়ে দেয়া মিসাইল এন্টিমিসাইল ছুড়ে দিয়ে অন্তহীন আকাশে ধ্বংস করে দেয়া হবে আমাদের দায়িত্ব।
নাম সর্বস্ব ধর্মগুলো আজ মানবজাতিকে বন্দি করে রেখেছে। মানুষ হয়ে পড়েছে, কেবল পার্থিব সম্পদ মোহ ও সম্মান আহরণ ও রক্ষণাবেক্ষণের হাতিয়ার বা পন্ন মাত্র। মানুষ যে খোদার প্রতিনিধি সে খবর আজ কতজনের জানা আছে বলুন! ইবলিসের খাস প্রতিনিধি বলে অভিধা দেয়ার কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। কালামে তাই কথাটা রয়েছে, ‘বৃক্ষ ফলে পরিচিত হয়!’ কাবিল থেকে শুরু করে ইদানিংকার বার্মার রাষ্ট্রপ্রধানদের অমানবীয় কর্মকান্ডগুলো পরিষ্কার জানান দেয়, এমন অমানুষদের সাথে কোনো সমঝোতা করার অবকাশ থাকতে পারে না।
তবে একটি প্রেরণা খুঁজে পাই খোদাবন্দ হযরত ঈসা মসিহের জীবন ও কর্মের মাধ্যমে। গোটা বিশ^ যখন পাপ, হিংসা, খুন রাহাজানিতে ডুবে গেল, ঠিক তেমন ত্রিশঙ্কু অবস্থায়, প্রেম ও ত্যাগের উদীয়মান ঝান্ডা নিয়ে পতিত ধরাপৃষ্টে হাজির হলেন, প্রেমের পরাকাষ্টা, স্বীয় প্রাণের দামে বিশে^র পাপের মূল্যে করলেন পরিশোধ! প্রেমের একক দৃষ্টান্ত ও প্রকৃত জীবনধর্মী ছবক এর অধিক আর কি হতে পারে?
মসিহ যখন শিক্ষা দিতেন তখন তাঁর শিক্ষা ছিল জীবনধর্মী শিক্ষা, মুখে যাকিছু বলতেন বাস্তবে তাই করতেন। নিজের পূতপবিত্র রক্ত ঝরালেনা রাজ্যের কলুষতা দূরীকরণের জন্য। তাঁর প্রেম, ত্যাগ ও পবিত্রতার বিষয়ে জগতের সকলেরই স্বল্প বিস্তর জানা আছে। তবে অনেকে জেনেই না জানার ভাণ করে বসে থাকে। যেমন মেছুয়ার দল! ওরা কি জানে না, নদীর মাছ একই পানিতে বেঁচে থাকে, প্রবৃদ্ধি লাভ করে, তবে জাল দিয়ে অবাধ চলাচল বন্ধ করে দেয়ার অর্থ কী হতে পারে? অবশ্যই বাণিজ্য।
মানুষ আজ নানা জাতীয় জালে বন্দি হয়ে আছে! মানুষ তো মানুষ, সকলের মাত্র একটিই পরিচয়। ‘সবার উপর মানুষ সত্য’! দেশের নামানুসারে মানুষের নাম রাখা কতই না বেমানান! তাছাড়া মানুষ তো এমনিতেই শতধা বিভক্ত হয়ে আছে, যা হলো মহান মাবুদের সুন্দর পরিকল্পনার বিপরীত ক্রিয়া। ধর্মীয় মতবাদ হলো খোদার পরিকল্পনা বাস্তবায়নকল্পে অনুপ্রাণীত, মানুষে মানুষে ভ্রাতৃপ্রেমে চলতে সাহায্য করা, তা না করে ধর্মের নামে বিভক্ত মানুষগুলো অধিক বিভক্ত করে ছাড়াছে! মানুষের ক্ষতি তো ইবলিসের মন্ত্রণাপুষ্ট।
আজ মানুষ হয়ে পড়েছে শ্রেফ পণ্য, আর তা ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক ও বাণিজ্যি ফড়িয়াদের হাতে। জাতিসংঘ হলো এমন একটি প্রতিষ্ঠান, মানবতাবোধ যে কতোটা অবশিষ্ট রয়েছে তেমন নেতাদের হৃদয়ে তা সন্দেহের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, রোহিঙ্গাদের মানবেতর জীবন দেখে। দেশ ছাড়া করলো, আহত-নিহত, ধর্ষণ-খতম করার পরে অবশিষ্টদের দেশ ছাড়া হতে বাধ্য করলো, জাতিসংঘ কি পারে না দ্রæত পদক্ষেপ নিতে, এমন ‘মগের মুল্লুক’ সঠিক শিক্ষা দিয়ে নিয়ন্ত্রন করার জন্য, তা না করে সমাজদেহে সৃষ্ট ক্ষতস্থান অধিক বিগড়ে যাবার অপেক্ষা করছে! কথায় বলে জাষ্টিস ডিলে মিন জাষ্টিজ ডিনাই অর্থাৎ ন্যায় বিচার করতে বিলম্ব করার অর্থ অন্যাকে প্রশ্রয় দেয়া। মানবতার এহেন বিপর্যয় যারা ঘটিয়েছে, আজ তাদের গণআদালতে অবশ্যই দাঁড় করাতে হবে, তবে তৎপূর্বে সর্পাঘাতে মূমূর্ষূ রোগিটিকে বিষমুক্ত করা হবে আশু পদক্ষেপ।
বাংলাদেশ সরকারের মানবতাদরদী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওয়াজেদ গোটা বিশে^র চোখের সামনে এমন এক নজীর স্থাপন করেছেন, ধনকুবদের পক্ষেও তেমন সাহস ও মমতা প্রদর্শন করা অভাবিত। কথায় বলে ‘বাপের বেটি’। আমাদের হৃদয় আছে, তবে অর্থ সামর্থের রয়েছে যথেষ্ট ঘাটতি। ধনকুবের সম্প্রদায় যদি আমাদের প্রতি সাহায্য সহযোগীতার নিঃশর্ত হাত বাড়ায়, তবে হয়তো প্রবল শক্তিতে মানবতার কল্যাণের নিমিত্তে, গোটা বিশ্ববাসিকে সাথে নিয়ে সুমুখপানে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। ঐক্যের মধ্যে নিহিত রয়েছে বিজয় মাল্য।
আমরা গোটা বিশ্ববাসি; সকলে ভাই-বোন, স্বজন-প্রিয়জন, একই পিতার ঔরষজাত সন্তান। মানুষের সাথে মানুষের রয়েছে বেজায় মিল; ক্ষুৎপিপাসা, প্রজনন প্রকৃয়া সবকিছুই অভিন্ন। অবশ্য আমাদের মধ্যে ‘ভাষাভেদ’ আমাদের এগিয়ে আসতে বেশ অন্তরায় সৃষ্টি করে রেখেছে। আমি বাংলা ভাষাভাষী একজন মানুষ, আমাকে যদি হিব্রু ভাষাভাষী লোকের পাশে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন দুজন বেশ মিলে মিশে চলতে পারবো নিশ্চিতে; তবে শর্ত থাকবে, একজন দোভাষির প্রয়োজন থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণ পারষ্পরিক ভাষা পুরোপুরি বুঝে না ওঠা ও বলতে না পারা পর্যন্ত। উভয়ের শারিরীক গঠনের ক্ষেত্রে দোভাষির কোনো প্রয়োজনই পড়ে না। মহান স্রষ্টা সে ক্ষেত্রে সবকিছু ঠিকঠাক করে রেখেছেন। শারীরিক গঠনের বিষয়ে অধিক কিছু বলার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। স্বল্পবিস্তর কতিপয় দেশ ঘুরে এসেছি ইতোমধ্যে।
‘ভাগ করো ও শাসন করো’ এমন নীতি একদিকে যেমন ক্ষতিকারক, আবার ‘ডিভিশন অব লেবার’ অন্যদিকে উৎপাদনে সহায়কও বটে। কালামপাকে তাই একটা বিশ্লেষণ রয়েছে, শরীরের মধ্যে স্থাপিত অনেকগুলো অংগ-প্রত্যঙ্গ রয়েছে, যারা সকলে সকল কাজ করে না। তবে এদের মধ্যে থাকতে হবে নিবীড় সমন্বয়, শরীর কেননা মাত্র একটি। তেমনি মাত্র একটি বিশ^। এ বিশ^টিকে তুলে দেয়া হয়েছে মানুষের হাতে, মানুষের কল্যাণে, মানুষের ব্যবহারের নিমিত্তে। সকল মানুষ একমাত্র আদমের ঔরষজতা সন্তান, অন্ততঃ ঐশি কালাম তা একবাক্যে মেনে নিয়েছে।
বলতে পারেন, বালামের কথা বালামে থাক, বাস্তবতা সামাল দিতে আজ আমাদের জগা-খিচুরি খেতে হচ্ছে। ধর্ম ও অধর্মের মধ্যে, অন্ততঃ ভাষাগত বেজায় পার্থক্য দেখি না। নোটিশের ‘কমা’ পরিবর্তন করার মতো, কে যেন স্বতপ্রণোদিত হয়ে ধর্মটাকে অধিক অর্থবহ করার জন্য একটা ‘অ’ লাগিয়ে দিয়েছে শব্দটির আদিতে। ধর্ম মাত্র একটিই, আর তা হলো মানবতার ধর্ম। যে ব্যক্তি দেখা ভাইকে মহব্বত করতে ব্যার্থ তার হৃদয়ে খোদা-প্রেম কেবল ফালতু কথা। চার পাশের আর্তপীড়িত দুস্থদের অবহেলা করে তীর্থে গমনকারী কেবল ধর্মান্ধতা তা বোধ করি সকলেই বুঝতে পারে। কোনো তীর্থস্থান ধর্মের আড়ত নিয়ে বসে নেই। হয়তো কোনো একসময় তীর্থের কাক খেতে পেত না, তাই সহমতবাদীদের কাছে অনুরোধ জানালো, বছরে অন্ততঃ একবার হলেও কিছু দানাপানির যোগান দিতে, তাই ধিরে ধিরে প্রথায় পরিণত হলো এবং কালে কালে অবশ্যকরণীয় হয়ে দাঁড়াল।
পরিশেষে বলতে চাই, অনুরোধ জানাই, আলোকিত ব্যক্তিবর্গ মশাল উন্নিত করে এগিয়ে যাই কালের আঁধারপুরিতে, যেথা আমাদের ভাই-বোন মানবরূপী দানবদের হাতে হচ্ছে নিষ্পেষিত, পথ খুঁজে পাচ্ছে না ন্যায় সত্য-সুন্দরের পথে অবমুক্ত হবার জন্য। আলোকিত সন্তান অগ্রণী ভূমিকা রাখিবে যা হলো স্বাভাবিক নিয়ম!
সূদীর্ঘ ৫০ বৎসরের আন্দোলনে আমার যে ক্ষুদে অভিজ্ঞতা ঘটেছে, তার আলোকে উক্ত সিন্ধান্তটি টানার সাহস পেলাম। একটি কচি ডাব যখন ঝুনো হয়ে যায়, তখন তার পক্ষে ডাবের জল পরিবেশন করা আর সম্ভব নয়, অবশ্য ঝুনো নারকেলে জল থাকে, তবে উক্ত জলের স্বাদ আর কচি ডাবের জলের স্বাদ এক হবার নয়।
ঈসাই জীবনে যাত্রারম্ভে কোনা এক পরিবার অতি প্রতে্যুষে আরাধনামূলক ভক্তি সংগীত দিয়ে দিন শুরু করতো, কালে কালে তেমন পরিবার অর্থ-বিত্তের দাপটে আজ ধরাকে সরা ভেবে বসে আছে, যে দৃশ্যপট বিবেকবান ব্যক্তিকে বেসামাল আগ্নেয়গীরিতে পরিণত করে তুলছে। জীবন্ত ছানা ডিমের খোলসের মধ্যে বেড়ে ওঠে বটে, তবে উক্ত বাচ্চার জীবন যদি চলমান থাকে, তবে এক সময় বন্দি শিবির চৌচির হয়ে পড়বে, প্রবৃদ্ধির বহির্মূখী চাঁপে, যা খোলসের পক্ষে ধরে রাখা সম্ভব নয়।
জীবন মানে প্রাণ, আর প্রাণ হলো খোদা, যিনি অতীতে ছিলেন, বর্তমানে আছেন আর অনন্তকাল ধরে থাকবেন। মৃত্যু যেন আঁধারপুরী, অবাধ্যতা, গোয়ার্তুমি, সত্য মেনে নিতে দেখি চরম আপত্তি, যা হলো অভিশপ্ত ইবলিসের কারসাজি। আলো ও অন্ধকার যেমন একত্রে অবস্থান করতে পারে না, একের আগমন অন্যের বিয়োগ, একইভাবে সত্য ও মিথ্যা এক ঘরে বাসবাস করতে পারে না। হয় সত্য থাকবে, মিথ্যার হবে বিলোপ, নতুবা মিথ্যার হবে জয়, সত্য হবে কবরপ্রাপ্ত। সত্য-মিথ্যা একসূত্রে কেউ গাঁথতে পারে নি এবং তেমন প্রচেষ্টা কেবল বোকামি ও ব্যার্থ প্রয়াস।
সত্যের প্রকৃত সৈনিক হলেন খোদাবন্দ হযরত ঈসা মসিহ! তিনি কি পেরেছিলেন সত্যের দ্যূতি মিথ্যাচারের খোলসে আবৃত করে রাখতে; যদি তেমন কিছু করা সম্ভব হতো, তবে হয়তো মর্মবিদারক সলিবে তাঁকে প্রাণ দিতে হতো না। মাত্র ৩৩ বৎসর বয়সের এক যুবক জনমনে সত্য প্রতিষ্ঠা ও প্রচারের জন্য তদানীন্তন সমাজ ব্যবস্থা যা কেবল ডুবে ছিল অন্যায়, অত্যাচার, জোর-জুলুমের ধারক-বাহক রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্প্রদায়ের হাতে, তেমন গুনাহগারদের হাতে প্রাণ দিতে হলো! মিথ্যার সাথে তিনি সমঝোতা করেন নি, যতই ত্রিশঙ্কু অবস্থা আসুক না কেন বা যতই মূল্য দিতে হোক না কেন। সত্য চিরস্থায়ী, সত্য নিত্যস্থায়ী, সত্য অবিনশ^র, মিথ্যা কেবল ঠুনকো মরিচীকা, বায়ু ভর্তি ফানুস মাত্র। যারা খোদার নির্ভরযোগ্য কালামের উপর থাকে নির্ভরশীল, মিথ্যার সাথে আতাত গড়ার কোনো প্রয়োজন থাকে না তাদের। সত্য বরাবর স্বীয় পথে একাই চলে, যেথা মিথ্যার থাকে না প্রবেশাধিকার।
বতর্মান বিশ্বটা একটা মিথ্যার প্লাটফর্ম। যার শুরু হয়েছে অবাধ্যতা, মিথ্যাচার, ছলচাতুরী, প্রতারণার মাধ্যমে, পথিমধ্যে তা যতই অপরূপা হোক না কেন, পরিণতি অবশ্যই কুৎসিত কদাকার হতে বাধ্য। সত্যের সেনানী তেমন পরিণতির দিকে নির্বিবাদে, নিরবে, নিস্ক্রিয় অবস্থায় এগোতে পারে না। হাত-পা বেঁধে সাগরে ফেলে দেয়া এক কথা, আর অপরাধের রাজ্যে হৃষ্টচিত্তে কুটিলদের দরবারে নর্তনকুর্দন করা, মতিভ্রম ছাড়া আর কিছুই নয়।
ধর্ম শব্দের প্রকৃত অর্থ যদি কারো জানা থাকে তবে তেমন ক্ষেত্রে স্বপক্ষে বিপক্ষে একটা প্রতিক্রিয়া অবশ্যই থাকবে। সবুজ কলা যদি ভিতর থেকে পাঁকতে শুরু করে তবে একটু একটু করে তার বাহিরের বর্ণ-পরিবর্তন অবশ্যই হবে, পরিবর্তন ঠেকাবার কৌশল আমার জানা নেই।
বলতে চাই না, আজ আমি জীবন যুদ্ধে পর্যুদস্থ। তবে যুদ্ধ করার জন্য অত্যাবশ্যকীয় সমরাস্র শক্ত হাতে ধরে রেখেছি। আমাদের এ যুদ্ধ কোনো রক্ত মাংসের বিরুদ্ধে আহুত নয়। আমাদের যুদ্ধ ইবলিসের সকল চাতুরির বিরুদ্ধে। ইবলিসের ছুড়ে দেয়া মিসাইল এন্টিমিসাইল ছুড়ে দিয়ে অন্তহীন আকাশে ধ্বংস করে দেয়া হবে আমাদের দায়িত্ব।
নাম সর্বস্ব ধর্মগুলো আজ মানবজাতিকে বন্দি করে রেখেছে। মানুষ হয়ে পড়েছে, কেবল পার্থিব সম্পদ মোহ ও সম্মান আহরণ ও রক্ষণাবেক্ষণের হাতিয়ার বা পন্ন মাত্র। মানুষ যে খোদার প্রতিনিধি সে খবর আজ কতজনের জানা আছে বলুন! ইবলিসের খাস প্রতিনিধি বলে অভিধা দেয়ার কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। কালামে তাই কথাটা রয়েছে, ‘বৃক্ষ ফলে পরিচিত হয়!’ কাবিল থেকে শুরু করে ইদানিংকার বার্মার রাষ্ট্রপ্রধানদের অমানবীয় কর্মকান্ডগুলো পরিষ্কার জানান দেয়, এমন অমানুষদের সাথে কোনো সমঝোতা করার অবকাশ থাকতে পারে না।
তবে একটি প্রেরণা খুঁজে পাই খোদাবন্দ হযরত ঈসা মসিহের জীবন ও কর্মের মাধ্যমে। গোটা বিশ^ যখন পাপ, হিংসা, খুন রাহাজানিতে ডুবে গেল, ঠিক তেমন ত্রিশঙ্কু অবস্থায়, প্রেম ও ত্যাগের উদীয়মান ঝান্ডা নিয়ে পতিত ধরাপৃষ্টে হাজির হলেন, প্রেমের পরাকাষ্টা, স্বীয় প্রাণের দামে বিশে^র পাপের মূল্যে করলেন পরিশোধ! প্রেমের একক দৃষ্টান্ত ও প্রকৃত জীবনধর্মী ছবক এর অধিক আর কি হতে পারে?
মসিহ যখন শিক্ষা দিতেন তখন তাঁর শিক্ষা ছিল জীবনধর্মী শিক্ষা, মুখে যাকিছু বলতেন বাস্তবে তাই করতেন। নিজের পূতপবিত্র রক্ত ঝরালেনা রাজ্যের কলুষতা দূরীকরণের জন্য। তাঁর প্রেম, ত্যাগ ও পবিত্রতার বিষয়ে জগতের সকলেরই স্বল্প বিস্তর জানা আছে। তবে অনেকে জেনেই না জানার ভাণ করে বসে থাকে। যেমন মেছুয়ার দল! ওরা কি জানে না, নদীর মাছ একই পানিতে বেঁচে থাকে, প্রবৃদ্ধি লাভ করে, তবে জাল দিয়ে অবাধ চলাচল বন্ধ করে দেয়ার অর্থ কী হতে পারে? অবশ্যই বাণিজ্য।
মানুষ আজ নানা জাতীয় জালে বন্দি হয়ে আছে! মানুষ তো মানুষ, সকলের মাত্র একটিই পরিচয়। ‘সবার উপর মানুষ সত্য’! দেশের নামানুসারে মানুষের নাম রাখা কতই না বেমানান! তাছাড়া মানুষ তো এমনিতেই শতধা বিভক্ত হয়ে আছে, যা হলো মহান মাবুদের সুন্দর পরিকল্পনার বিপরীত ক্রিয়া। ধর্মীয় মতবাদ হলো খোদার পরিকল্পনা বাস্তবায়নকল্পে অনুপ্রাণীত, মানুষে মানুষে ভ্রাতৃপ্রেমে চলতে সাহায্য করা, তা না করে ধর্মের নামে বিভক্ত মানুষগুলো অধিক বিভক্ত করে ছাড়াছে! মানুষের ক্ষতি তো ইবলিসের মন্ত্রণাপুষ্ট।
আজ মানুষ হয়ে পড়েছে শ্রেফ পণ্য, আর তা ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক ও বাণিজ্যি ফড়িয়াদের হাতে। জাতিসংঘ হলো এমন একটি প্রতিষ্ঠান, মানবতাবোধ যে কতোটা অবশিষ্ট রয়েছে তেমন নেতাদের হৃদয়ে তা সন্দেহের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, রোহিঙ্গাদের মানবেতর জীবন দেখে। দেশ ছাড়া করলো, আহত-নিহত, ধর্ষণ-খতম করার পরে অবশিষ্টদের দেশ ছাড়া হতে বাধ্য করলো, জাতিসংঘ কি পারে না দ্রæত পদক্ষেপ নিতে, এমন ‘মগের মুল্লুক’ সঠিক শিক্ষা দিয়ে নিয়ন্ত্রন করার জন্য, তা না করে সমাজদেহে সৃষ্ট ক্ষতস্থান অধিক বিগড়ে যাবার অপেক্ষা করছে! কথায় বলে জাষ্টিস ডিলে মিন জাষ্টিজ ডিনাই অর্থাৎ ন্যায় বিচার করতে বিলম্ব করার অর্থ অন্যাকে প্রশ্রয় দেয়া। মানবতার এহেন বিপর্যয় যারা ঘটিয়েছে, আজ তাদের গণআদালতে অবশ্যই দাঁড় করাতে হবে, তবে তৎপূর্বে সর্পাঘাতে মূমূর্ষূ রোগিটিকে বিষমুক্ত করা হবে আশু পদক্ষেপ।
বাংলাদেশ সরকারের মানবতাদরদী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওয়াজেদ গোটা বিশে^র চোখের সামনে এমন এক নজীর স্থাপন করেছেন, ধনকুবদের পক্ষেও তেমন সাহস ও মমতা প্রদর্শন করা অভাবিত। কথায় বলে ‘বাপের বেটি’। আমাদের হৃদয় আছে, তবে অর্থ সামর্থের রয়েছে যথেষ্ট ঘাটতি। ধনকুবের সম্প্রদায় যদি আমাদের প্রতি সাহায্য সহযোগীতার নিঃশর্ত হাত বাড়ায়, তবে হয়তো প্রবল শক্তিতে মানবতার কল্যাণের নিমিত্তে, গোটা বিশ্ববাসিকে সাথে নিয়ে সুমুখপানে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। ঐক্যের মধ্যে নিহিত রয়েছে বিজয় মাল্য।
আমরা গোটা বিশ্ববাসি; সকলে ভাই-বোন, স্বজন-প্রিয়জন, একই পিতার ঔরষজাত সন্তান। মানুষের সাথে মানুষের রয়েছে বেজায় মিল; ক্ষুৎপিপাসা, প্রজনন প্রকৃয়া সবকিছুই অভিন্ন। অবশ্য আমাদের মধ্যে ‘ভাষাভেদ’ আমাদের এগিয়ে আসতে বেশ অন্তরায় সৃষ্টি করে রেখেছে। আমি বাংলা ভাষাভাষী একজন মানুষ, আমাকে যদি হিব্রু ভাষাভাষী লোকের পাশে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন দুজন বেশ মিলে মিশে চলতে পারবো নিশ্চিতে; তবে শর্ত থাকবে, একজন দোভাষির প্রয়োজন থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণ পারষ্পরিক ভাষা পুরোপুরি বুঝে না ওঠা ও বলতে না পারা পর্যন্ত। উভয়ের শারিরীক গঠনের ক্ষেত্রে দোভাষির কোনো প্রয়োজনই পড়ে না। মহান স্রষ্টা সে ক্ষেত্রে সবকিছু ঠিকঠাক করে রেখেছেন। শারীরিক গঠনের বিষয়ে অধিক কিছু বলার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। স্বল্পবিস্তর কতিপয় দেশ ঘুরে এসেছি ইতোমধ্যে।
‘ভাগ করো ও শাসন করো’ এমন নীতি একদিকে যেমন ক্ষতিকারক, আবার ‘ডিভিশন অব লেবার’ অন্যদিকে উৎপাদনে সহায়কও বটে। কালামপাকে তাই একটা বিশ্লেষণ রয়েছে, শরীরের মধ্যে স্থাপিত অনেকগুলো অংগ-প্রত্যঙ্গ রয়েছে, যারা সকলে সকল কাজ করে না। তবে এদের মধ্যে থাকতে হবে নিবীড় সমন্বয়, শরীর কেননা মাত্র একটি। তেমনি মাত্র একটি বিশ^। এ বিশ^টিকে তুলে দেয়া হয়েছে মানুষের হাতে, মানুষের কল্যাণে, মানুষের ব্যবহারের নিমিত্তে। সকল মানুষ একমাত্র আদমের ঔরষজতা সন্তান, অন্ততঃ ঐশি কালাম তা একবাক্যে মেনে নিয়েছে।
বলতে পারেন, বালামের কথা বালামে থাক, বাস্তবতা সামাল দিতে আজ আমাদের জগা-খিচুরি খেতে হচ্ছে। ধর্ম ও অধর্মের মধ্যে, অন্ততঃ ভাষাগত বেজায় পার্থক্য দেখি না। নোটিশের ‘কমা’ পরিবর্তন করার মতো, কে যেন স্বতপ্রণোদিত হয়ে ধর্মটাকে অধিক অর্থবহ করার জন্য একটা ‘অ’ লাগিয়ে দিয়েছে শব্দটির আদিতে। ধর্ম মাত্র একটিই, আর তা হলো মানবতার ধর্ম। যে ব্যক্তি দেখা ভাইকে মহব্বত করতে ব্যার্থ তার হৃদয়ে খোদা-প্রেম কেবল ফালতু কথা। চার পাশের আর্তপীড়িত দুস্থদের অবহেলা করে তীর্থে গমনকারী কেবল ধর্মান্ধতা তা বোধ করি সকলেই বুঝতে পারে। কোনো তীর্থস্থান ধর্মের আড়ত নিয়ে বসে নেই। হয়তো কোনো একসময় তীর্থের কাক খেতে পেত না, তাই সহমতবাদীদের কাছে অনুরোধ জানালো, বছরে অন্ততঃ একবার হলেও কিছু দানাপানির যোগান দিতে, তাই ধিরে ধিরে প্রথায় পরিণত হলো এবং কালে কালে অবশ্যকরণীয় হয়ে দাঁড়াল।
পরিশেষে বলতে চাই, অনুরোধ জানাই, আলোকিত ব্যক্তিবর্গ মশাল উন্নিত করে এগিয়ে যাই কালের আঁধারপুরিতে, যেথা আমাদের ভাই-বোন মানবরূপী দানবদের হাতে হচ্ছে নিষ্পেষিত, পথ খুঁজে পাচ্ছে না ন্যায় সত্য-সুন্দরের পথে অবমুক্ত হবার জন্য। আলোকিত সন্তান অগ্রণী ভূমিকা রাখিবে যা হলো স্বাভাবিক নিয়ম!