রাজশাহী, নাটোর, নওগা জেলাগুলো আম বাগানের জন্য প্রসিদ্ধ। বিশাল বাগান, তাকালে চোখ জুড়িয়ে যায়। তাই বলে ওখানকার কোনো লোক যদি দাবি করে বসে, তাদের এলাকায় কেবল আম গাছ ভিন্ন অন্য কোনো গাছপালা খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়, কথাটা হবে অবোধের প্রলাপ মাত্র! বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আসুন, যে দেশটি দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা সংগ্রাম আন্দোলনের ফসল, পরিশেষে নরঘাতক মানবরূপী দানবের বিপক্ষে যুদ্ধ করে মুক্ত করতে হয়েছে, মাশুল দিতে হয়েছে এক চরম মুল্যে। তথাপি স্বাধীন দেশের উষালগ্নে কতকগুলো বিপথগামী সৈন্যের হাতে প্রাণ দিতে হলো জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের। তিনি ছিলেন প্রথম প্রেসিডেন্ট গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের। মিলিটারি কুডেটার মাধ্যমে অর্থাৎ জবরদস্তিমূলকভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে নিল বঙ্গবন্ধুকে পুরো পরিবার স্বজন-প্রিয়জনসহ। তারপর দেশটি ঘুরে গেল সাবেক মতবাদের আবর্তে, ভন্ডুল হয়ে গেল শতাধিক কালের আন্দোলন, ত্যাগ-তিতীক্ষা, নিষ্পেষণকারীদের কালো হাত ভেঙ্গে দেবার প্রচেষ্টা। মানুষের স্বাভাবিক চাহিদা কেউ বন্ধ করে দিতে পারে না, যেমন, মানুষ যখন প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দেয়, তখন সে ডাক্তার কবিরাজের ফতোয়ার ধার ধারে না। কতবার শ্বাস-প্রশ্বাস নিবেন তা যেমন আপনার দেহের বাহির থেকে কেউ প্রেসক্রাইব করার অধিকার রাখে না, একইভাবে সচেতন মানুষকে কেউ বলে দেয় না তার ন্যাজ্য দাবি দাওয়ার বিষয়ে। বেঁচে থাকার তাগিদে যাকিছু তার প্রয়োজন তা সে প্রকাশ করবেই, তা সংগ্রহ করার ক্ষমতা তার থাক বা না থাক। আর এ আত্মপোলদ্ধি ভিতর থেকে ব্যক্তিকে প্রেরণা যোগাতে থাকে প্রতিটি মূহুর্তে, শয়নে স্বপনে উপবেশনে সদা-সর্বদা। বহুক্ষেত্রে আমরা নিরব হয়ে যাই অপরাধ করা অথবা ভুল পদক্ষেপ বাস্তবায়নের অপচেষ্টা জনগণের উপর চাপিয়ে দিতে দেখে। প্রতিবাদ করা উচিৎ, আবার শংকাও জাগে, হয়তো হিতে বিপরীত ঘটে না বসে। সাত পাঁচ ভেবে আমাদের চলতে হয়। কালামে তাই একটি উপদেশ রয়েছে, ‘সর্পের মতো চতুর আর কপোতের মতো অমায়িক হবার প্রসঙ্গে। অন্যত্র রয়েছে ব্যক্তিকে শিশুর মত নতুন জন্ম নিতে না পারলে কেউই খোদার রাজ্যে প্রবেশ করতে পারবে না।
তা আমরা আম বাগান পিছনে ফেলে অনেক দূর চলে এসেছি। যদিও আমরা উক্ত এলাকা আম বাগান বলে পরিচয় করিয়ে দেই, তবুও আম গাছের ফাঁকে ফাঁকে প্রচুর লতাগুল্ম, আগাছা নিয়ত জন্ম লাভ ও বৃদ্ধি পেয়ে চলছে। কোনো বাগানই একক বৃক্ষের জন্য একচেটিয়া হতে পারে না। ১জুলাই ঘটে যাওয়া গুলশান ট্রাজেটি নতুন করে প্রমাণ করে দিল, দেশ প্রেমিক জনতার আর কালঘুমে কাল কাটানো সম্ভব হবে না; অতন্দ্র প্রহরীবৎ থাকতে হবে সদাজাগ্রত, থাকতে হবে হুশিয়ার সাবধান। গর্জনকারী শিংহের মতো কখন কোথায় খাপ পেতে আছে দেশের শত্রু শ্রেণি তার কোনো ক্ষণলগ্নের পূর্বাভাস দেয়া সম্ভব নয়।
গোটাবিশ্ব আজ মাত্র দুটি ভাগে হয়ে আছে বিভক্ত; একটি অংশ সত্যসুন্দর খোদার পথে রয়েছে পরিচালিত, যারা মানুষের কল্যাণ কর্মে থাকে সদাই ব্যস্ত, আর একটি দল হলো ইবলিসের কবলে পতিত বিভ্রান্ত জনতা।
গুলশান ট্রাজেডি নিয়ে বক্তব্য তোলা হলে দেখা যায় কতিপয় ব্যক্তি আনন্দ ফুর্তিতে আটখান হয়ে পড়ে, যেন সমাজে কোনো অঘটন ঘটানোর মত প্রয়োজনীয় পরিমান সংখক দুবৃত্তের বাস থাকতে পারে না, বিশেষ করে স্নাতশুভ্র সোনার বাংলার চত্তরে। ধারনাটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা যা গুলশান ট্রাজেডি প্রমান করে দিল।
আজকে আমাদের হ্যাপিদেশ করা ছাড়া আর কিইবা অবশিষ্ট থাকতে পারে। যাদের সুদূর প্রশারি দৃষ্টি নেই তাদের অবশ্যই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হয়, যা তারা করেছে। সবকিছু খুটিনাটি সবিশেষ খবরাখবর যাত্রার পূর্বেই সকলের জেনে নেয়া প্রয়োজন, অনাগত ভবিষ্যতের পথে সাফল্যের লক্ষবিন্দুতে পৌছে যাবার অভিপ্রায়ে। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীচক্র হলো গুপ্তঘাতক, যারা যেকোনো দেশে আক্রমণ চালিয়ে থাকে অতর্কিতে। যে দেশেই তারা ঢুকবে বা আক্রমন করবে, পঙ্গু করে দিবে প্রশাসনের অবকাঠামো জবর দখল করার নিমিত্তে তা উক্ত দেশের কাউকেই জানতে দিতে পারে না, কারণ তারা হলো দুর্বৃত্য কালো শক্তি যা যুগ যুগ ধরে আলোর পাশে পাশে অবস্থান করে চলছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রনালয় অথবা পররাষ্ট্রমন্ত্রনালয় যদি ভেবে থাকে, উক্ত সন্ত্রাসীদের তরফ থেকে যেহেতু কোনো আগমনি বার্তা প্রেরণ করে নি তাই সহজেই বলা চলে, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীদের সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না। তা বাপু এবার বুঝ, ঠেলা সামলাও, বিশেষ জ্ঞান লাভের জন্য গুলশান ট্রাজেডি যথেস্ট নয় কি? কথিত আছে কাকের বাসায় কোকিল এসে ডিম পেড়ে যায় যা কাক ঘুণাক্ষরেও টের পায় না। তবে কোকিল নিজ ডিম পাড়ার পূর্বে কাকের ডিম খেয়ে ফেলে, চিহ্ন মুছে দেয় যেন কাকের কোনো প্রকার সন্দেহ না জাগে। বোকা কাক তা নিজের ডিম ভেবে আনন্দে আনন্দে উক্ত কোকিলের ডিমে তা দিতে থাকে খোলস ভেধ করে বাচ্চার আবির্ভাব ঘটা না পর্যন্ত। যখন কাক তার ভুল বুঝতে পারে তখন আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না প্রতিকার করার মতো।
চোর ঢোকে চুপিসারে সকলের চোখের আড়ালে, তাই চোর ধরতে হলে প্রহরীদের অতন্দ্র থাকতে হবে অবশ্যই চোখের আড়ালে। কোনো শরীরে রোগ জীবানু ঢুকতে পারে না প্রতিবন্ধকতার কারণে, আর এ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রাখে শরীরের নিজস্ব প্রতিশেধক শক্তি যা দেশ প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাথে তুল্য। আর যদি একবার ঢুকেই পড়ে তবে তো বিশেষ কমান্ডো বাহীতি রয়েছে নিশ্চিহ্ন করে দেবার জন্য, তবে তাতে বেজায় অগণিত ব্যয় হয়ে যায় সরকারের খাজান্ধি থেকে।
আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী বাহিনীর পক্ষ থেকে লেটার অব ক্রেডেন্সিয়াল প্রত্যাশা করার মত মনমানসিকতা অবশ্যই ত্যাগ করতে হবে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের জন্য। তা যদি সম্ভব না হয় তবে অতুটুকু ক্ষুদে মেধা নিয়ে দেশ রক্ষার মতো গূঢ়দায়িত্ব হাতে তুলে নেয়া বোধ করি উচিৎ হবে না। এখন প্রশ্ন জাগতে পারে, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী দলের বিস্তার লাভ কি করে হয়, যেমন শরীরের রোগ জীবাণু যেভাবে ছীড়য়ে পরে, একইভাবে। শরীরটা একটু একটু করে নেতিয়ে পড়ে। অচল হতে থাকে, কোথাও কোথাও ব্যাথার সৃষ্টি এবং নানাপ্রকার দর্শনীয় চিহ্ন ফুটে ওঠে, তখন দ্রুত চিকিৎসকের দারস্থ হতে হয় প্রতিকারের জন্য। গুলশান ট্রাজেডি তেমন একটি বিস্ফোরন। বুঝতে হবে শরীরে বহুপূর্বেই রোগ জীবানু বাসা বেধে ছিল অপেক্ষারত; চাই তাদের সুযোগ, তা যদি ধর্মের ব্যানারের আবডালে চালানো সম্ভব হয়, তাতে আপত্তি থাকার কি থাকতে পারে!
অখন্ড মানবতা খন্ড খন্ড করার গুঢ় মন্ত্রে যারা দীক্ষাপ্রাপ্ত তারাই ধর্মের আড়ালে কলায় কলায় বেড়ে উঠছে কাকের বাসায় কোকিলের ডিমের মতো, যা বোকা কাকের টের পাবার কথা নয়। অবোধ কাক, তুমি তা দিতে থাকো, সময় হলে পর টের পাবে, এতদিন কি কি করে আসছো। অজান্তে করে থাকলে করবে আফসোস আর জেনেশুনে করলে পাবে চিত্তে সুখ। যারা শিশুদের জ্ঞান চক্ষু খোলার পূর্বেই ভেধ নীতি শিক্ষা দিয়ে তাদের মগজ ধোলাই করে ছাড়ে তেমন ওস্তাদদের সমাজ থেকে উৎপাটন করতে হবে, করতে হবে নিয়ন্ত্রন।
যেসকল গ্রন্থে সংকলিত রয়েছে ভেধ নীতি তাও সংস্কার করতে হবে। কথায় বলে শত বৎসর পর পর সবকিছু সংস্কার করে নিতে পারলে সুস্থ্য থাকা সম্ভব হয়। মানব সমাজ একটি অখন্ড সমাজ যা হলো খোদার সুরতে তাঁর স্বীয় প্রতিনিধি হিসেবে হয়েছে সৃষ্ট। মানুষ ও খোদার দুষমন হলো অভিশপ্ত ইবলিস, যে কিনা যাত্রারম্ভে মানবজাতিকে বিভ্রান্ত ও দ্রোহী করে ছাড়লো, খোদার মনোনিত আবাসস্থল এদন কানন থেকে করলো বিতাড়িত। মানবজাতির দুর্দশার সীমাপরিসীমার অন্ত আর বাকী র’ল না। আমরা উক্ত কালো শক্তির হাতে আজ পর্যন্ত হয়ে আছি কব্জাগত। সমাজে সংস্কার আন্দোলন পরিচালনা করার জন্য চাই একদল সংস্কারমুক্ত প্রাজ্ঞ ধার্মিক, জনকল্যাণে উদ্ভুদ্ধ সেনাবাহিনী, যারা থাকবে প্রতিটি মুহুর্তে সজাগ সচেতন। যেক্ষেত্রেই ভেধনীতি হবে প্রচারিত সেক্ষেত্রেই তাদের মুখ বন্ধ করে দিতে হবে, আর তেমন বিষাক্ত শিক্ষকদের নিয়ে আসতে হবে শোধনাগারে, সুচিকিৎসার প্রদানকল্পে, ভালো মানুষে পরিণত করার তাগিদে। সংস্কার প্রকৃয়া দুই একদিনের কোর্স হতে পারে না, তা চালাতে হবে যতদিন বেঁচে থাকবো ততদিন। সমাজ থেকে ভ্রান্ত শিক্ষামালা নির্মূল করতে হবে। কখনো কখনো ক্যাপসূওলের মাধ্যমে তেমন বিষাক্ত শিক্ষা সমাজে প্রবেশ করানো হয়, যেহেতু উক্ত বিষ থাকে বিশেষ আবরণের অন্তরালে তাই তা করো চোখে সহজে ধরা পড়ার কথা নয়। অন্ততঃ প্রত্যেকটি জাতের ক্যাপস্যুলের একবার ল্যাবরেটরী পরিক্ষা করে তবে ছাড় দিতে হবে। বাগানে কোনো একটি চারা গাছ নিজে নিজে বহিসন্ত্র“র আক্রমন থেকে আত্মরক্ষা করতে পারে না, তাই বেড়ে উঠার সময় তার প্রবৃদ্ধির কারণে প্রতিরক্ষা বেড়া দিতে হবে, ওটি যখন কলায় কলায় বেড়ে ওঠে, পরিণত হয় এক বিশাল মহিরুহে, তখন তাকে কেউ সহজে আঘাত দিতে সাহস করে না প্রতিঘাতের ভয়ে। বনের সিংহ (যদিও তার শিং নেই) চীনাজাতিকে আফিং খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিল বহুকালাবধি, মাত্র পঞ্চশ বৎসরের সচেতন আন্দোলনের ফলে আজ গোটা বাগানের সত্যিকারের শিংহ রূপে পরিণত হয়ে উঠেছে, সকলে তাকে ভয় পায় শ্রদ্ধা জানায়, স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে খাতির জমায় নিজেদের সুবিধা লাভের জন্য।
যাহোক, আমাদের বাগান একক আমের বাগান হোক অথবা পাঁচমিশালি বৃক্ষলতাগুল্মের বাগান হোক, বাগান বাঁচাতে নিয়মিত পরিচর্যা দিতে হবে, অটুট রাখতে হবে তদারকির ব্যবস্থা এবং তা হবে বাগানের স্বার্থ রক্ষার খাতিরে।