সোনারগাঁওয়ে মদনগঞ্জ–নরসিংদী রেল সড়কের জমি প্রভাবশালীদের কবজায় চলে যাচ্ছে। ঐ সড়কে রেলওয়ের প্রায় ২০০ কোটি টাকার জমি বেদখল হয়ে আছে। মদনপুর থেকে প্রভাকরদী পর্যন্ত প্রায় ছয় কিলোমিটার এলাকায় সড়কের দুই পাশের জমি স্থানীয় প্রভাবশালী, শিল্পমালিক ও সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা প্রভাব খাটিয়ে দখল করে রেখেছেন। এর মধ্যে বিএনপিকর্মী মুজিবুর রহমানও ছয় কিলোমিটারের মধ্যে দুই কিলোমিটার তার কবজায় ধরে রেখেছেন। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জমি দখল মুক্ত করার জন্য কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় তা বেহাত হয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, রেলওয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যোগসাজশে এসব জমি বেদখল হয়ে যাচ্ছে। লিজ দেওয়া না হলেও তাদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের কারণে বেহাত জমি উদ্ধারের কোনো তৎপরতা নেই।
জানা যায়, বাংলাদেশ রেলওয়ের জমি রেললাইন থেকে দুই পাশে ১২০ ফুট চওড়া। কোথাও কোথাও তা ৪০০ ফুট পর্যন্ত রয়েছে। তবে রেল স্টেশন এলাকায় ২ হাজার ফুট এলাকা জুড়ে জমি রয়েছে। রেলওয়ে একসময় শুধু কৃষিভিত্তিক জমি লিজ দেয়। বাণিজ্যিক লিজ অনেক আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে কৃষি লিজও বন্ধ রয়েছে। কৃষি লিজ নিয়ে শুধু কৃষি আবাদ করার কথা। শ্রেণি পরিবর্তন করে কেউ রাস্তা, বিপণি বিতান, পাকা কোনো স্থাপনা, মার্কেট নির্মাণ বা দেওয়াল দিয়ে দখলে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এমন কাজ কেউ করে থাকলে লিজ গ্রহীতা অবৈধ দখলদার হিসেবে গণ্য হবেন। বর্তমানে মদনগঞ্জ থেকে নরসিংদী সড়কে সব দখলদারই অবৈধ। তবে কোনো শিল্পমালিক জমির শ্রেণি পরিবর্তন করতে হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নেওয়ার কথা। এ সড়কে কোনো শিল্পমালিক শ্রেণি পরিবর্তনের কোনো প্রকার অনুমতি নেননি। ফলে সব শিল্পমালিক অবৈধ দখলদার হয়ে রাস্তা নির্মাণ করেছেন। তাদের বিষয়ে শিগগিরই ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
সরেজমিনে জানা যায়, তালতলা এলাকায় বিএনপি–কর্মী মুজিবুর রহমান, জামপুর ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক সামসুল আলম, প্রভাবশালী তুহিনুর রহমান, আওয়ামী লীগ নেতা ফিরোজ মিয়া, বৈরাবরটেক এলাকায় পিপিএল কোম্পানি লিমিটেড, বস্তল এলাকায় অ্যাম্পায়ার স্টিল মিল, তালতলা সুপার মার্কেট, মহিউদ্দিন পেপার মিলস লিমিটেড, সৃজন আবাসন প্রকল্প, রক্সি পেইন্ট, গ্যাস্টন ব্যাটারি কারখানা, কাঠারাবো এলাকায় দেশপ্যাক কোম্পানি লিমিটেডের দখলে রেলওয়ের জমি রয়েছে। বস্তল এলাকায় শাহজাহান ফার্নিচার, শেজাদ পারভেজ স্পিনিং মিলস, রহমান স্পিনিং, মরিচটেক এলাকায় বিআর স্পিনিং মিলস লিমিটেড, নয়াপুর এলাকায় অবৈধ দলখদার বাচ্চু মেম্বার ও আবু সিদ্দিক মিয়া রেলওয়ের সম্পত্তি বিক্রি করে দেওয়ার পর সিন্ডিকেটের মাধ্যমে রেলওয়ের জমি দখল করে রেখেছেন।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, তালতলা এলাকার রেলওয়ের বিশাল জায়গা জুড়ে মাছ, মাংস ও সবজির বাজার দিয়ে দোকানপ্রতি প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা আদায় করে থাকেন বিএনপি–কর্মী মজিবুর রহমান। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও পুলিশকে ম্যানেজ করে এসব অপকর্ম করে যাচ্ছেন। তার এসব অপকর্মে বাধা দিলে হয়রানির জন্য চাঁদাবাজির মামলা দিয়ে থাকেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, মজিবুর রহমান সরকারি জায়গা থেকে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা অবৈধভাবে আয় করে থাকেন। মালিপাড়া থেকে বস্তল পর্যন্ত দুই কিলোমিটার এলাকায় মিলকারখানা, দোকানপাট স্থাপন করতে হলে তার অনুমতি নিতে হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সবজি বিক্রেতা জানান, মজিবুর রহমান প্রতিদিন প্রতি দোকান থেকে তার নাতি নাইমের মাধ্যমে টাকা আদায় করেন। অন্য পাশে সামসুল আলম নামে আরেক ব্যক্তি রেলওয়ের জায়গায় মার্কেট নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছেন।
মালিপাড়া গ্রামের ফজলুল হক নামের এক প্রবাসী জানান, তালতলা এলাকায় মজিবুর রহমান রেলওয়ের পাশে তার ৭ শতাংশ জমি দখল করেছেন। এতে প্রতিবাদ করায় তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা দায়ের করেন। ভুক্তভোগী উত্তর কাজীপাড়া গ্রামের আব্দুল বাতেন জানিয়েছেন, রেলওয়ে থেকে তিনি জমি লিজ নিয়ে ভোগদখল করছেন। মুজিবুর রহমান জোরপূর্বক একটি কোম্পানির পক্ষে তার জমি দখল করে দিয়েছেন। অভিযুক্ত মজিবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘লিজ নিয়ে সম্পত্তি ভোগদখলে আছি। এখানে শুধু আমিই না অনেকেই জমি দখলে রেখেছেন।’
জামপুর ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক সামসুল আলম বলেন, রেলওয়ের কাছ থেকে তিনি লিজ নিয়েই দোকানপাট নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছেন। তার দখলে কোনো অবৈধ জমি নেই। বাংলাদেশ রেলওয়ের ডিভিশনাল এস্টেট অফিসার সাউদ সুমন শফিউল্লাহ বলেন, মদনগঞ্জ–নরসিংদী সড়কটি রেলওয়ের পরিত্যক্ত থাকায় প্রভাবশালীরা দখল করেছে। তবে রেলওয়ের কেউ আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে জড়িত থাকলে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অবৈধ দখলদারদের শিগগিরই উচ্ছেদ করা হবে।