দেশের উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া সীমান্তের বুক চিরে প্রবাহিত মহানন্দা নদী। এ নদীতে জীবিকার তাগিদে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ডুবে ডুবে পাথর তুলছেন হাজার হাজার শ্রমিক। দিনভর পাথর তুলে সন্ধ্যায় মহাজনের কাছে বিক্রি করে মৌলিক চাহিদা মিটে পরিবার–পরিজনদের।
তেঁতুলিয়ার জনসংখ্যা দেড় লাখ। তাদের মধ্যে ৫০ হাজারই পাথর শ্রমের সঙ্গে জড়িত। মহানন্দা যেন হাজার হাজার মানুষের জীবিকার বিশাল ভাণ্ডার। ভাগ্যদেবতাও মনে করেন অনেকে। প্রতিদিন লাখ লাখ সিএফটি নুড়ি পাথর উঠে নদী থেকে। ভোরে শ্রমিকরা দল বেঁধে হাওয়ায় ফুলানো গাড়ির টিউব, লোহার জাকলা, চালুনি ও লোহার রড নিয়ে নেমে পড়ছে নদীতে। দিনভর চলে পাথর উত্তোলন। নদীর কিনারে এনে স্তূপ করা হয় সে পাথর। দিনশেষে মহাজনের কাছে বিক্রি করে মজুরি হিসেবে মিলে ৫০০–৭০০ টাকা।
সম্প্রতি কথা হয় শফিউর রহমান, নুর ইসলাম ও আব্দুল করিমের সঙ্গে। তারা জানান, কদিন ধরে পাথর তুলতে নদীতে নামতে দিচ্ছে না। তাই খুব কষ্টে আছি। বাইরে কাজও নেই। পাথরশ্রমিক আসির উদ্দিন জানান, এই মহানন্দা নদীই আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। আমার এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। এ পাথর তুলেই সবকিছু।
অপর পাথরশ্রমিক কামরুল ইসলাম জানান, ঘরে স্ত্রীসহ চার ছেলেমেয়ে। সন্তানের ভরণ–পোষণ চলে এই পাথর জীবিকার ওপর। দিনভর দলের সঙ্গে পাথর তুলে সন্ধ্যায় পারিশ্রমিক নিয়ে পরিবারের অন্ন বস্ত্র শিক্ষাসহ যাবতীয় মৌলিক চাহিদা পূরণ করার চেষ্টা চলে। তারা আরও জানান, অনেক সময় সীমান্তে বাধার সম্মুখীন হতে হয় তাদের। কখনো কখনো বন্ধ হয়ে যায় পাথর উত্তোলনের কাজ। কদিন ধরে পাথর তুলতে নিষেধ করা হয়েছে। নদীতে নামতে দিচ্ছে না। এতে কমেছে রুজি–রোজগার।
মহানন্দার পাথর ঘিরে শত শত নারীশ্রমিকের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। তারা নদীর তীরে পাথর নেটিং, শোটিং ও ক্রাশিংয়ের কাজ করছে। খুব ভোরে ঘরের গৃহস্থালি কাজ সেরে হিম–কুয়াশার ভিতরেই ঘর থেকে ঐ নারীরা বের হন কাজের উদ্দেশ্যে। পেটের কাছে ঝড়–বৃষ্টি আর শীতের প্রচণ্ড ঠাণ্ডাও হার মানে এসব কর্মজীবী মানুষদের কাছে। অটোভ্যান, অটোরিকশা ও কেউ সাইকেল চালিয়ে যোগ দেয় কাজে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একটানা পানির মধ্যে জীবিকার সন্ধান চলে।
ক্রাশিং মেশিনে পাথর ভাঙা কাজে নিয়োজিত জরিনা খাতুন জানান, ফজরের আজান শুনে ঘুম থেকে উঠতে হয়। তারপর তাড়াহুড়ো করে নিজের ও দুই সন্তানের জন্য রান্না করতে হয়। সন্তানদের কোনো দিন খাইয়ে, কোনো দিন না খাইয়ে বেরিয়ে পড়তে হয় তাকে। দেরি করে কাজে পৌঁছালে মহাজনের বকাঝকা শুনতে হয়। কোনো কোনো দিন দেরি করার কারণে কাজেই নেওয়া হয় না। চোখের পানি ফেলে মাগুরা গ্রামের শেফালি আক্তার জানান, বছর ছয়েক আগে স্বামী ছেড়ে আরেকটি বিয়ে করেছে। ঘরে দুই মেয়ে। ওদের তো বড় করতে হবে, লেখাপড়া ও বিয়ে দিতে হবে। তাই পাথর ভাঙা মেশিনে কাজ করে সংসার চালাচ্ছি। এরকম গল্প আমেনা, রহিমা, জরিনার মতো শত শত নারীশ্রমিকের।
উপজেলা চেয়ারম্যান কাজী মাহমুদুর রহমান ডাবলু জানান, তেঁতুলিয়ার সিংহভাগ মানুষ পাথরশ্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত। হাজার হাজার শ্রমিক মহানন্দা নদীতে পাথর তুলে জীবিকা নির্বাহ করছেন। আমরা সব সময় চেষ্টা করি, যাতে পাথর তুলে শ্রমিকরা তাদের পরিবার নিয়ে ভালো থাকে।