এক একটা ব্যক্তি এক একটা ওয়ালের সাথে তুল্য, ওয়ালকে বলতে পারেন ক্যানভাস, আর ক্যানভাসটি তখনই মূল্যবান হয় যখন তার মধ্যে কিছু একটা দাগ কাটা থাকে! গানের সুরে বলা হয় খালী আকাশটার কি আর মূল্য থাকতো যদি দু’চারটে মেঘ ভেসে না থাকতো।
মানুষের গোটা জীবন তেমন নানা প্রকার দাগে ভরপুর। তবে তেমন দাগগুলী জ্ঞানত” তারই মনের কথা প্রকাশ করে থাকে। আর দাগ বা চিহ্ন তো কালীর আচড়, কেবল কালী ছিটানোই নয়, যতটুকু কালী হেথা ব্যবহার করুন না কেন, তা তুলি মেখে ক্যানভাসে নিপুণ হাতে টেনে যান দেখবেন, আপনার হৃদয়ের লুকানো খবরটুকু জনসমুক্ষে হয়ে গেল প্রতিভাত।
ভিন্নভাবে বলা চলে, একটি দেয়াল আর একটি দেয়াল থেকে রাখা হয়েছে খানিকটা ভিন্ন আকারে। কোথাও না কোথাও থাকে কিছুটা বেশুরো। তবে শান্তি-শৃঙ্খলার স্বার্থে পরষ্পরকে মানিয়ে নিতে হবে, নতুবা অতীব প্রয়োজনীয় হওয়া সত্ত্বেও হাড়ি সরার ব্যবহারের কালে একটু ঠুনকো শব্দ হবে। মজার বিষয় হলো, ঢাকনা ছাড়া হবে না আপনার রান্না। যদি ঢাকনার ব্যবহার জানা থাকে তবে আপনাকে অতীব যত্নবান হতে হবে ওটাকে যথাস্থানে সন্নিবেশ করার জন্য।
মানুষ প্রত্যেকে যেন এক একটা জীবন্ত পাঁচিল তবে তার উপর ভেসে থাকে নানা অভিধা, সবটা আপনার পক্ষে বুঝে ওঠা সম্ভব নাও হতে পারে। ক্ষতি নেই, হাড়ির মধ্যে যতটুকু সম্ভার থাক না কেন, সবটুকু আপনি একা একা উপভোগ করার ক্ষমতা রাখেন না। যা পারেন তা হলো হাড়িটাকে অনাহুত আগলে রাখা। কোনো কোনো হাড়িতে দশ, বিশ, শত শত ভোক্তার রান্না করা হয়ে থাকে; সকলেই তেমন হাড়ির খাবার খেয়ে অতীব তৃপ্ত হয়। একই দেয়ালে বহুজন লিখে রাখে, যা কেবল দেয়ালের নিজস্ব সম্পদ ভেবে নিজেকে ধন্য বরেণ্য মনে করে।
দেয়ালের মালিক নিজে যা কিছু লিখে চলেন তা স্বীয় প্রয়োজনে লিখে চলেন। পাঠক দর্শক তা পাঠ করে মুগ্ধ তৃপ্ত হয়ে থাকে। বর্তমান বিশ্বে বলতে পারেন সাতশত চলমান ক্যানভাস রয়েছে অস্তিত্বমান যা নানা রংগে থাকে রঞ্জিত। আকারে বা মতবাদের ভিন্নতার দিকে নজর না দিয়ে অভিন্ন যা কিছু আছে, সে দিকে গুরুত্বরোপ করা হবে অন্বয় বা সমন্বয় সৃষ্টির উপায়। আপনার হৃদয়ের মধ্যে যা কিছু শুপ্তাবস্থায় রয়েছে তা আপনারই নিজস্ব সম্পদ। কেউ যদি তার উপর অবয়ব দিতে পারে তবে তা অবশ্যই বহন করবে বিশেষ মূল্য। আর যদি রং কালি দিয়ে অনর্থের কারণ ঘটিয়ে বসে তবে হয়ে গেল আপনার ভয়ানক ক্ষতি। কখনো কখনো গোটা জীবন লেগে যেতে পারে অনর্থটুকু অর্থবহ করার জন্য। তেমন ক্লান্তিকর প্রচেষ্টাকে আমরা যা সংশোধন প্রক্রিয়া বলতে পারি। দেয়ালের মালিক চাইবে না তার দেয়ালে কোনো বাজে কথা লিপিবদ্ধ থাক। নিয়ত ডাষ্টার দিয়ে তা মুছে ফেলতে থাকে সচেষ্ট। আর এমন প্রচেষ্টা নিয়ত করার কারণে দেয়ালের আভা ক্রমেই অপরূপ, ভিন্ন রূপ ধারণ করে চলে, যা কখনো পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। আমরা মানুষ, নিয়ত অনুসরণ করি কতকগুলো বস্তাপঁচা কালের মন্ত্রনা। কখন খাবে, কখন নাবে (গোছল) কখন প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দিবে, যেগুলো কেবল একান্ত ব্যক্তিগত, তাও বাহির থেকে ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হয় বোঝার মতো। আর আগপিছ না ভেবে আমরা সহজেই বাধ্য হয়ে যাই তেমন অনর্থক অপ্রয়োজনীয় নিয়মাচার বহন করে করে জীবন সায়াহ্নে শেস নিঃশ্বাস ত্যাগ করি।
আমরা মুক-বধির আর কতকাল থাকবো? ভিতরের চরম বেদনা কতকাল আর লুকিয়ে রাখবো? আমাদের অবশ্যই মুখর হতে হবে, হোকনা লেবার ওয়ার্ডের যন্ত্রণা, হোকনা প্রথম মিলনের মৃত্যুসম হৃদয়ফাটা কান্না, তা কাদতে দিতে হবে, মুখ চেপে ধরা চলবে না। আমরা মানুষ, অবশ্য মানবীয় আচরণ প্রকাশ পাবে আমাদের নিজস্ব ক্যানভাসে; যদি কারো ভালো লাগে তবে সে কাছে কিনারায় ছুটে আসবে, রহস্য চানতে চাইবে অনুপ্রানীত হবে অনুসরণ করার জন্য যা কষ্মিনকালেও চাঁপিয়ে দেবার প্রয়োজন পরবে না। একটি সুন্দর ফুল, যার মধ্যে থাকে হৃদয়হারী সৌরভ, উক্ত ফুলের কাছে মৌমাছি ছুটে যায় প্রথমত সৌরভের আহŸানে, তারপর কাছে এসে তার বিশেষ সম্পদ ‘মধু’ আহরণে মনোনিবেশ করে, ব্যস্ত হয়ে পড়ে, যা হলো আমন্ত্রনের তাৎপর্য।
যিনি বাগান সাজিয়েছেন তিনি তো প্রজ্ঞা ও করুনানিধি; তাঁর হৃদয়ে সদা ভরা থাকে সৃষ্টির কল্যানকর পরিকল্পনা। স্বীয় হাতে সৃষ্টি করে কোনো পাগল কি তা ছুড়ে মারে আস্তাকুড়ে? ও কাজটি কেবল মালিকের আজন্ম শত্রুর কাজ, মালিকের বন্ধু তেমন কাজ করতে পারে না।
আপনি যদি মহান মাবুদের বন্ধু বলে দাবি করেন, তবে প্রশ্ন করি, মাবুদের সাঁজানো, রূপে রংগে বাধানো, নয়নকাড়া বাগাটিকে বুলডোজার দিয়ে লন্ডভন্ড করে দিলেন কেন। আসলে আপনার পরিচয় আপনার কর্মকান্ড বহন করে চলছে। কোনো মতেই আপনি মালিকের স্বজনপ্রিয়জন নন, আপনি হলেন তাঁর আজন্ম দুষমন। জঘন্য খুনি, নিজ হাত দিয়ে মানব বাগান লন্ডভন্ড করে ছেড়েছেন। কোথায় লুকিয়েছেন আপনার কৃত অপকীর্তি সে নোংড়া দিনলীপি? কাকের অভ্যাস নিজের চোখ বন্ধ করে খাবার লুকায়, মনে মনে ভাবে, জগতের কেউ আর তা দেখছে না। হায়রে বোকা কাক! প্রত্যেকটি কর্মকান্ড পিছনে একটি দাগ কেটে রেখে যা যা দেখে দর্শকবৃন্ধ বুঝে নিতে পারে, কথায় কাজে রয়েছে কতোটা গড়মিল।
অবশ্য, জীবন থেকে পলে পলে যে সময়টুকু চলে যায় তা কোনোভাবেই আর ফিরিয়ে আনার উপায় নেই, তবে জীবদ্ধশায় সুযোগ থাকে সংশোধন করার। যেমন কালামপাকে বর্ণিত রযেছে, “তখন আমার লোকেরা, যাদের আমার বান্দা বলে ডাকা হয় তারা যদি নম্র হয়ে মুনাজাত করে ও আমার রহমত চায় এবং খারাপ পথ থেকে ফেরে, তবে বেহেশত থেকে তা শুনে আমি তাদের গুনাহ মাফ করবো এবং তাদের দেশের অবস্থা ফিরিয়ে দেব” (২খান্দাননামা ৭ অধ্যয় চৌদ্দ পদ)।
এক্ষেত্রে সহজ শর্ত হলো, নম্রতা, প্রার্থনা ও খারাপ পথ থেকে ফিরে আসা। তা বন্ধু, একই কাজ আপনি বার বার করে চলবেন আর মুখে চিৎকার করতে থাকবেন, বাঁচাও বাঁচাও বাঁচাও- বাঁচতে কি পারবেন তেমন স্বেচ্ছাকৃত ভুলের গহবর থেকে? পুনঃপুন ভুলের কাজ করতে দেখে মানুষ আপনাকে অবশ্যই ছেড়ে যাবে, এমনকি মাবুদ নিজেও কাছে পিঠে আসতে পারবেন না। লেখা আছে তোমাদের হাত রঞ্জিত ভ্রাতার রক্তে। তোমাদের নৈবেদ্য অসার, যা লুণ্ঠিত দ্রব্যে পরিপূর্ণ। বাঁচতে হলে চেতনা ফিরাতে হবে। জানেন কি, আপনার মহান নির্মাতা এক রূহানি সত্তা, যিনি পূতপবিত্র, বার বার তাগিদ দিয়ে ফিরছেন, “আমি পবিত্র বলে তোমরাও পবিত্র হও” (লেবীয় এগার অধ্যায় চুয়াল্লিশ পদ)।
মাবুদ বরাবর অদৃশ্য এক মহান সত্তা, যিনি মানুষের কল্যাণবই অকল্যাণ সাধন করেন না। কালামপাকে তাই যথাযথ বর্ণিত রয়েছে, “তোমাদের জন্য আমার পরিকল্পনার কথা আমিই জানি; তা তোমাদের উপকারের জন্য, অপকারের জন্য নয়। সেই পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে তোমাদের ভবিষ্যতের আশা পূর্ণ হবে” (ইয়ারমিয়া ঊনত্রিশ অধ্যায় এগার পদ)। ঠিক এই মুহুর্তে আপনার হস্তদ্বয় ধুয়ে ফেলুন, তবে নোংরা জলে নয়, তাতে ময়লা বাড়বে ছাড়া কমবে না। খোদার সামনে উপস্থিত হবার পূর্বে অযুগোছন আবশ্যক, তা বোধ করি আপনার জানা আছে। অযু গোছল কেবল বাহিরের মালিন্য পরিষ্কার করে, তবে হৃদয়ের পুঞ্জিভুত মলিনতা দূর করার উপায় তো কিছু থাকতে হবে! আর তা হলো মাবুদ নিজে যিনি নিয়ত করাঘাত করে ফিরছেন আপনার হৃদয় দ্বারে, যদি তাঁর আওয়াজ শুনতে পান তবে ঠিক এই মুহুর্তে তা খুলে দিন, তাকে বরণ করে নিন, দেখবেন মুহুর্তের মধ্যে আপনার কলুষিত হৃদয় পরিবর্তন করে হেথা তাঁর ঐশি হৃদয় বসিয়ে দিয়েছেন (ইহিষ্কেল চৌত্রিশ অধ্যায় ছাব্বিশ পদ), ফলে খুলে গেছে আপনার হৃদয়ের চোখ খোদার মহান পরিকল্পনা দেখে আপনি হলেন অভিভুত। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করুন ঠিক এই মুহুর্তে। জীবনের ভার নির্ভয়ে তাঁর হাতে তুলে দিন; আপনি হয়ে গেলেন বোঝা মুক্ত, যা এতকাল ঝুকে ঝুকে আপনাকে বহন করতে হতো; আজ আপনি মুক্ত স্বাধীন। অতীত হলো বিগত, তা যতই কুৎসিত কদাকার হোক না কেন, হয়তো বলবেন ওগুলো আপনার কৃতকর্ম। সত্যিই আপনার কৃতকর্মের জন্য দয়াল মসিহ নিজের প্রাণের দামে শোধ দিলেন, আপনি হতে পারলেন কাফফারা মুক্ত। বিশ্বাস হয় না, কেবল বিশ্বাসহেতু আপনি পারবেন খোদাকে সন্তুষ্ট করতে (ইব্রাণী এগার অধ্যায় ছয় পদ)। তওবা করার সাথে সাথে আপনার অতীত পাপ কালিমা হয়ে গেল পতীত। এখন থেকে সম্পূর্ণ নতুন পথে চলতে শুরু করুন। যাকে বলা হয় “ছেরাতুল মোস্তাকিম”। মসিহ যথার্থ বলেছেন, “আমিই পথ সত্য ও জীবন” (ইউহোন্না চৌদ্দ অধ্যায় ছয়) পথ হারিয়ে বিপথে কি কাঙ্খিত গন্তব্যে কেউ পৌছাতে পারবেন?
যিনি সদাসর্বদা থাকেন জাগ্রত, তাকে পেতে বা ডাকতে লগ্নভ্রষ্টের ভয় থাকতে পারে কি? ওগুলো কেবল মানুষের গড়া নিয়ম যার পিছনে রয়েছে ক্ষণিকের বাণিজ্য। মসিহ একদা তেমন বাণিজ্যের পসরা বায়তুল মোকাদ্দস থেকে বের করে দিয়েছিলেন, “ইহুদীদের উদ্ধার-ঈদের সময় কাছে আসলে পর ঈসা জেরুজালেমে গেলেন। তিনি সেখানে দেখলেন, লোকেরা বায়তুল মোকাদ্দসের মধ্যে গরু, ভেড়া আর কবুতর বিক্রি করছে এবং টাকা বদল করে দেবার লোকেরও বসে আছে। এই সব দেখে তিনি দড়ি দিয়ে একটা চাবুক তৈরী করলেন, আর তা দিয়ে সমস্ত গরু, ভেড়া এবং লোকদেরও সেখান থেকে তাড়িয়ে দিলেন। টাকা বদল করে দেবার লোকদের টাকা-পয়সা ছড়িয়ে দিয়ে তিনি তাদের টেবিলগুলো উল্টে ফেললেন। যারা কবুতর বিক্রি করছিল ঈসা তাদের বললেন, “এই জায়গা থেকে এই সব নিয়ে যাও। আমার পিতার ঘরকে ব্যবসার ঘর কোরো না।” এতে পাক-কিতাবে লেখা এই কথাটা তাঁর সাহাবীদের মনে পড়ল! তোমার ঘরের জন্য আমার যে গভীর ভালবাসা, সেই ভালবাসাই আমার দিলকে জ্বালিয়ে তুলবে” (ইউহোন্না দুই অধ্যায় তের থেকে সতের পদ)। ধর্মীয় মতবাদ মানুষের হৃদয়ের কালিমা পরিষ্কার করার জন্য হয়েছে প্রদত্ত। বাণিজ্যের পসরা বানানো কেবল খোদাদ্রোহী দুষ্ট লোকের কারবার বটে। নিজেদের পরিষ্কার না করে যারা তা অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয় তাদের অবশ্যই প্রয়োজন রয়েছে শানিত তরবারি ব্যবহার করার। মসিহ অবশ্য শিক্ষা দিয়েছেন, খোদার কালাম দ্বিধার ছোড়ার চাইতে অধিক ধারালো, যা মানুষের অস্থিমজ্জ্যার মধ্যে সহজেই প্রবেশ করে, ন্যায়-অন্যায়ের মধ্যে সহজ ও সুক্ষ পার্থক্য দেখিয়ে দেয়। গড্ডালিকা প্রবাহে আর কতকাল ভেসে চলবেন। এখনই তওবা করার সময়, এখনই মন ফিরাবার সময়।