রাশিয়ার ভাড়াটে সৈন্য ওয়াগনার গ্রুপ দেশটির সামরিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। ওয়াগনারের প্রধান ইয়েভজেনি প্রিগোজিন শনিবার প্রায় ২৫ হাজার সেনা নিয়ে ইউক্রেন থেকে রাশিয়ার রোস্তভ শহরে প্রবেশ করে। নিজের অফিসিয়াল টেলিগ্রাম চ্যানেলে এক ভিডিও বার্তায় ওয়াগনার প্রধান বলেন, ‘আমরা সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে রোস্তভের সামরিক স্থাপনা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছি। এতে বিমানঘাঁটিও রয়েছে। এদিকে ওয়াগনারের সেনারা রাশিয়ার আরেকটি শহর ভোরোনেজ দখলে নেওয়া পর সেখানে একটি তেল ডিপোতে আগুন ধরার ঘটনা ঘটে। আগুন নিয়ন্ত্রণে শতাধিক কর্মীর সমন্বয়ে ফায়ার সার্ভিসের ৩০টি ইউনিট কাজ করে বলে জানিয়েছেন আঞ্চলিক গভর্নর আলেকজান্ডার গুসেভ। ভোরোনেজ শহরটি রোস্তভ ও মস্কোর মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত। খবর বিবিসি, এএফপি ও আলজাজিরা অনলাইনের।
এদিকে শনিবার মস্কোয় জাতির উদ্দেশে ভাষণে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ওয়াগনার গ্রুপের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, যারা রাশিয়াকে বিভক্ত করার চেষ্টা করছে, তাদের শাস্তি দেওয়া এবং সমাজে বিভক্তকারীদের শাস্তি অনিবার্য। পুতিন বলেন, রাশিয়ার ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে। বিদ্রোহীদের কর্মকা– রুশ জনগণের পিঠে ছুরিকাঘাত। তিনি বলেন, রাশিয়াকে রক্ষায় এই সংকট সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আদেশ দিয়েছি। পরিস্থিতি যে কোনো উপায়ে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন পুতিন।
ভাষণে ওয়াগনার প্রধান প্রিগোজিনের নাম উল্লেখ না করে পুতিন বলেন, কারও উচ্চাকাক্সক্ষা রাষ্ট্রদ্রোহের মতো অপরাধের দিকে যাচ্ছে। এদিকে ওয়াগনার গ্রুপের বিদ্রোহ ঘোষণার পর প্রিগোজিনকে বিদ্রোহী আখ্যা দিয়েছে মস্কো। তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে এবং ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ প্রমাণ হলে ১২ থেকে ২০ বছরের সাজা হতে পারে। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, বিদ্রোহে অংশ নেওয়া ওয়াগনারের অনেক সেনা আত্মসমর্পণ করেছে এবং তাদের নিজস্ব ঘাঁটিতে ফিরে যেতে সহায়তা চেয়েছে। এ ছাড়া যারা এখনো আত্মসমর্পণ করেনি তাদের দ্রুত আত্মসমর্পণ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
শনিবার এক বিবৃতিতে রুশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘আমরা ওয়াগনারের যোদ্ধাদের তাদের শীর্ষ কমা–ারকে অনুসরণ না করার অনুরোধ জানাচ্ছি। আপনাদের শীর্ষ কমান্ডার প্রিগোজিন আপনাদের সঙ্গে প্রতারণা করছে এবং নিজের ব্যক্তিগত উচ্চাভিলাষ পূরণ করতে এই অপরাধমূলক সশস্ত্র বিদ্রোহের ডাক দিয়েছে। দয়া করে আপনারা প্রিগোজিনকে অনুসরণ করা বন্ধ করুন। যে সব যোদ্ধা ওয়াগনার থেকে সরে দাঁড়াবেন তাদের সবাইকে আমরা নিরাপত্তা দেব। রাশিয়ার নিয়মিত সেনাবাহিনীতেও তাদের নিয়োগ দেওয়া হবে।’ এর আগে রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন প্রিগোজিন। তার বাহিনীর যোদ্ধাদের ওপর বড় ধরনের হামলা হয়েছে দাবি করে এর সঙ্গে রাশিয়ার জড়িত সামরিক নেতাদের উৎখাত করবেন বলে জানান তিনি। এ অবস্থায় তার বিশাল ভাড়াটে বাহিনী নিয়ে ইউক্রেনের রণাঙ্গন থেকে রাশিয়ায় প্রবেশের ঘোষণা দেন।
রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার ॥ সন্ত্রাসবিরোধী পদক্ষেপের অংশ হিসেবে রাশিয়ার রাজধানী মস্কো এবং গুরুত্বপূর্ণ শহর সেন্ট পিটার্সবার্গে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। মস্কোর মেয়র শনিবার বলেছেন, রাশিয়ার রাজধানীতে সন্ত্রাস দমনে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। রোস্তভ ও লিপেটস্ক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিন বলেছেন, মস্কোর হাতে আসা তথ্যের ভিত্তিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের লক্ষ্যে সন্ত্রাসবিরোধী বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। লিপেটস্ক গভর্নর ইগর আর্টামোনোভ বলেছেন, এই বিষয়ে তিনি এফএসবি সিকিউরিটি সার্ভিসের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এদিকে রাজধানী মস্কোর দিকে অগ্রসরমান ওয়াগনার সেনাদের বহরে গুলি ছুড়েছে রাশিয়ার বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার। ওয়াগনার সেনারা যেন মস্কোতে পৌঁছতে না পারে, সে জন্য শনিবার সন্ধ্যায় তাদের সেনাবহরে হেলিকপ্টার থেকে গুলি ছোড়া হয়েছে।
ওয়াগনারকে দমনের ঘোষণা চেচেন নেতা কাদিরভের ॥ রাশিয়ার চেচনিয়া অঞ্চলের নেতা রমজান কাদিরভ বিদ্রোহী ভাড়াটে সেনাবাহিনী ওয়াগনার গ্রুপকে দমনের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ওয়াগনারকে থামাতে প্রয়োজনে সর্বোচ্চ শক্তি ব্যবহার করা হবে। এ ছাড়া ওয়াগনারপ্রধান ইয়েভজেনি প্রিগোজিনকে বিশ্বাসঘাতক ও তার বিদ্রোহকে পেছন থেকে ছুরিকাঘাত করার শামিল হিসেবেও অভিহিত করেছেন এই চেচেন নেতা। রমজান কাদিরভ বলেন, প্রেসিডেন্ট পুতিন বিদ্রোহ নিয়ে যা যা বলেছেন সেগুলোকে আমি সমর্থন করি।
পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে ইইউ, ন্যাটো ও যুক্তরাষ্ট্র ॥ রাশিয়ার পরিস্থিতিতে নজর রাখছে পশ্চিমাদের সামরিক জোট ন্যাটো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং যুক্তরাষ্ট্র। ইইউর পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতিবিষয়ক মুখপাত্র নাবিলা মাসরালি বলেছেন, আমরা খুব সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছি। মস্কোতে আমাদের স্থায়ী রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সব সময় যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। এদিকে রাশিয়ার এই পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে এই বিষয় অবহিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের মুখপাত্র অ্যাডাম হজ। তিনি বলেন, আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি এবং মিত্র ও অংশীদারদের সঙ্গে এই অগ্রগতির বিষয়ে পরামর্শ করব।
ইউক্রেনে রুশ হামলা ॥ ওয়াগনারের সঙ্গে লড়াইয়ের মধ্যেই ইউক্রেনে হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। শনিবার ভোরে রুশ সেনাবাহিনী ইউক্রেনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এতে ব্যাপক ক্ষয়–ক্ষতি ও হতাহতের ঘটনা ঘটে। এদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, রাশিয়ার দুর্বলতা স্পষ্ট। মস্কো যত দীর্ঘ সময় ইউক্রেনে তাদের সেনা ও ভাড়াটে বাহিনীকে নিয়োজিত রাখবে তত বেশি নিজেদের দেশে বিশৃঙ্খলা দেখবে। রাশিয়ার কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন ওয়াগনারপ্রধান ইয়েভজেনি প্রিগোজিন। এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পরই টুইট বার্তায় এই মন্তব্য করেন জেলেনস্কি।