আকাশজুড়ে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখির উড়াউড়ি আর এ গাছ থেকে ও গাছে বিচরণ–এ যেন প্রকৃতির এক চিরচঞ্চল কাব্য, যেখানে প্রতিটি ডানার ঝাপটায় ছন্দ ওঠে, প্রতিটি কলকাকলিতে জেগে ওঠে জীবনের অনাবিল আনন্দ। বড় বড় গাছের ডালে শত শত বাসা। কোথাও সদ্য গড়া বাসা। কোথাও সদ্য ফোটা পাখির ছানা খাবারের অপেক্ষায় মুখ উঁচু করে বসে আছে। মা পাখি ঠোঁটে করে খাবার এনে ছানার মুখে তুলে দিচ্ছে। ভোরের আলো ফোটার আগেই কিচিরমিচির শব্দে মুখর হয়ে ওঠে পুরো গ্রাম। আর এ মোহনীয় দৃশ্যের দেখা মেলে পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার নাজিরপাড়া গ্রামে। দীর্ঘ প্রায় দেড়যুগ ধরে প্রতি বছর বংশ বিস্তারের জন্য নানা প্রজাতির দেশি–বিদেশি অতিথি পাখি এ গ্রামে আসে। স্থানীয় লোকজনের কঠোর সুরক্ষা আর নির্ভয় পরিবেশে কয়েক মাস থেকে পাখিরা তাদের ছানাদের নিয়ে আবার উড়ে যায় আপন গন্তব্যে। সরেজমিন ওই গ্রাম পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের প্রতিটি বড় গাছেই অসংখ্য পাখির বাসা। বিভিন্ন প্রজাতির বক, পানকৌড়ি, রাতচড়া, ঘুঘুসহ বিভিন্ন নাম না জানা অতিথি পাখিতে মুখর পুরো এলাকা।
পাখিদের কলকাকলি আর উড়াউড়ি দেখতে এখন প্রতিদিনই জেলার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও দূর–দূরান্ত থেকে মানুষ ভিড় করছেন। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জুন–জুলাই মাসে বিভিন্ন স্থান থেকে নাজিরপাড়া গ্রামে এসে বাসা বাঁধে এসব পাখি। এরপর ডিমে পেড়ে ছানা ফোটায়। ৬–৭ মাস অবস্থান করার পর নভেম্বর–ডিসেম্বরে বংশবিস্তার শেষে এখান থেকে চলে যায়। এভাবেই বছরের পর বছর একই নিয়মে চলছে পাখিদের আনাগোনা। নাজিরপাড়া গ্রামের প্রবীণ শিক্ষক তামজিদার রহমান খোকা বলেন, দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে প্রতি বছর এখানে শত শত পাখি আসে। বিদেশি পাখির মধ্যে শামুকখোলা সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয়। এছাড়া বিভিন্ন প্রজাতির বক, পানকৌড়ি ও রাতচড়া পাখিও রয়েছে। এখানে কেউ পাখি শিকারে এলে আমরা তাদের বাধা দেই। এলাকার লোকজনও উচ্চস্বরে কেউ শব্দ করে না। আর নিরাপদ পরিবেশ ভেবে পাখিরাও এখানে স্বাচ্ছন্দ্যে বাস করতে পারে। ফলে প্রতি বছরই এখানে পাখির সংখ্যা বেড়ে চলেছে। এখানকার মানুষের ঘুম ভাঙে পাখির কিচির মিচির ডাক শুনে। তবে অসংখ্য পাখি থাকার কারণে এদের মলমূত্রে রাস্তা ও আশপাশের পরিবেশ কিছুটা নোংরা হয়। দুর্গন্ধও ছড়ায়। তবে এ নিয়ে এলাকাবাসীর তেমন বিরক্তি নেই।
এলাকাবাসীর মতে, যদি পৌরসভা বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা ও ব্লিচিং পাউডার ছিটানোর ব্যবস্থা করা হয়, তবে আমাদের কষ্ট অনেকটাই কমবে। ঢাকা থেকে পাখি দেখতে এসে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আলিফ সামান্তা সৃষ্টি বলেন, শত শত পাখি ও তাদের উড়াউড়ির দৃশ্য দেখে সত্যিই মুগ্ধ হয়ে গেলাম। মনটা ভরে গেল। নাজিরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মো. খোরশেদ আলম পান্না বললেন, আমরা কখনো পাখিগুলোকে বিরক্ত করি না বা তাদের বসবাসে সমস্যা হয় এমন কাজ করি না। আর পর্যটকদের কাউকে পাখিকে বিরক্ত করতে বা শিকার করতে দেই না। পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. রবিউল ইসলাম বলেন, নাজিরপাড়া প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ একটি এলাকা। এই এলাকাটি পাখিদের অভয়াশ্রম। স্থানীয় লোকজনও পাখিদের নিরাপত্তার বিষয়ে বিশেষভাবে আন্তরিক।


