দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর গত ১৫ অক্টোবর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এই ঘোষণার ১২ দিন চলে গেলেও কর্মী পাঠানোর আনুষ্ঠানিক কোনো প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। মূলত কর্মী নিয়োগের নিয়ম, অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর দায়িত্ব বণ্টন ও মালয়েশিয়া গমনেচ্ছু কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য মেডিক্যাল সেন্টারের অনুমোদন নিয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় পুরো প্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। ফলে সরকারি পর্যায়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং ঘোষণা এলেও প্রক্রিয়াগত জটিলতায় কর্মী পাঠানো বিলম্বিত হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এবার নতুন ব্যবস্থাপনায় সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলসহ ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সি, ২৫টি প্রসেসিং এজেন্সি যুক্ত করার কথা জানানো হয়েছে। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর মালিকদের অভিযোগ, এজেন্সিগুলো কীভাবে তালিকাভুক্ত হলো, কর্মীরা কত টাকা খরচে মালয়েশিয়া যেতে পারবেন এবং বিনা খরচে যাওয়ার সুযোগ কারা পাবেন, এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়ায় দায়িত্ব পাওয়া দুটি রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইত্তেফাককে বলেন, কর্মীরা কত টাকা খরচে মালয়েশিয়া যেতে পারবেন এবং বিনা খরচে যাওয়ার সুযোগ কারা পাবেন, তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা কোথায় হবে, এসব বিষয়ে আমাদের এখনো বিস্তারিত জানানো হয়নি। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, শুধু সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে শ্রমবাজার চালুর ঘোষণা দিলেই স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয় না। কর্মী নিয়োগের ধাপ, এজেন্সিগুলোর দায়িত্ব এবং অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণের নিয়ম স্পষ্ট করা জরুরি। বায়রার সদস্যরা বলেন, আগে যেখানে ১০০টি প্রসেসিং এজেন্সি ছিল, এবার সেখানে ২৫টি প্রতিষ্ঠানকে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে আট শতাধিক রিক্রুটিং এজেন্সির পরিবর্তে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে ৩১২টিকে। এছাড়া রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে কর্মী পাঠানোর কার্যক্রম সম্পন্ন করতে প্রসেসিং এজেন্সি বা সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) কাছ থেকে অনাপত্তিপত্র (এনওসি) নিতে হবে। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, এতে একটি এজেন্সির কার্যক্রম অন্য প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে।
ফলে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারীদের প্রভাব বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। ২০২২ সালে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে কর্মী নিয়োগ সংক্রান্ত যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়, সেই অনুযায়ী কর্মী প্রেরণকারী বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সি (জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান) বাছাই করার দায়িত্ব এককভাবে মালয়েশিয়া সরকারের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছিল। এ সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত রয়েছে। এ কারণেই মালয়েশিয়া সরকারের আরোপিত শর্ত পরিবর্তন করাটা বাংলাদেশের পক্ষে সহজ নয় বলে মনে করেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বাজার খোলার ঘোষণার পাশাপাশি কর্মী পাঠানোর সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি ঠিক কেমন হবে, তা কার্যকর অভিবাসন কূটনীতির মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে আগেই আরো স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট করার দরকার ছিল। এ বিষয়ে বায়রার সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার চালু হওয়ায় আমরা খুশি।
কিন্তু কোন প্রক্রিয়ায় লোক পাঠানো হবে, কবে থেকে কর্মী পাঠানো শুরু হবে, সেসব বিষয়ে এখনো স্পষ্ট নয়। সরকারের পক্ষ থেকেও আমাদের এসব বিষয়ে কিছু বলা হচ্ছে না। ফলে অনেক এজেন্সিই এখনো দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছে। এদিকে মালয়েশিয়া গমনেচ্ছু কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য এখনো মেডিক্যাল সেন্টারের অনুমোদন দেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে। তবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে ২৫টি মেডিক্যাল সেন্টারকে মালয়েশিয়া গমনেচ্ছু কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার অনুমোদন দেওয়া হতে পারে। এই প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ চলছে। চলতি সপ্তাহ অথবা আগামী সপ্তাহে মেডিক্যাল সেন্টারের অনুমোদন ও মালয়েশিয়া গমনেচ্ছু কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার ঘোষণা আসতে পারে। তবে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য প্রত্যেক কর্মীকে কত টাকা ফি দিতে হবে তা এখনো নির্ধারিত হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর বিষয়ে এখনো কিছু প্রক্রিয়াগত জটিলতা আছে।
আশা করি, এসব জটিলতা আগামী সপ্তাহের মধ্যে শেষ হবে এবং নভেম্বরের মাঝাামাঝি থেকে কর্মী পাঠানোর আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করা যেতে পারে। এ বিষয়ে অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালুর ঘোষণা কিছুটা অপরিপক্ব মনে হয়েছে। কারণ এখানে দুই পক্ষ রয়েছে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া। মালয়েশিয়া তাদের অনুমোদিত এজেন্সির নাম প্রকাশ করলেও বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রক্রিয়াটি কীভাবে বাস্তবায়ন করবে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট ধারণা দিতে পারেনি। তিনি আরো বলেন, ডিসেম্বর মাসে দুই দেশের বর্তমান সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। এই সময়ের মধ্যে সেটি পর্যালোচনা করে জানুয়ারিতে নতুন সমঝোতা স্মারক করা যেতে পারে। সেখানে কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া, এজেন্সির অংশগ্রহণ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো স্পষ্ট করা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে শ্রমবাজার পুরোপুরি চালু হতে ডিসেম্বর বা জানুয়ারি পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।


