রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী বলেন, সাজেকের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পর্যটকদের নিরাপত্তার স্বার্থে আপাতত ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। অবরোধ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সাজেক আবারও পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। ‘কুইন অব হিলস’ খ্যাত রাঙামাটির সাজেক উপত্যকা এখন ভূতুড়ে পরিবেশে রূপ নিয়েছে। দীঘিনালা থেকে পর্যটকদের নিয়ে সাজেক ভ্যালিতে ছুটে চলা চাঁদের গাড়িগুলো সড়কশূন্য। মানুষের কোলাহলে মুখর থাকা তিনটি বাজারে অদ্ভুত থমথমে পরিবেশ। এসব বাজারের বেশির ভাগ দোকানপাটের ঝাঁপ নামানো। দু–একটি দোকান খোলা থাকলেও ক্রেতা নেই বললেই চলে। পরিচিত সেই প্রাণচঞ্চল বাজার ৩টি রূপ নিয়েছে স্তব্ধ জনপদে।
গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন নামে দুটি সংগঠনের ডাকা অবরোধে এমন অস্বাভাবিক পরিস্থিতি হয়েছে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলায়। রাঙামাটির পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আবদুর রকিব বলেন, বর্তমানে সাজেকের পরিস্থিতি স্বাভাবিক। সেনাবাহিনী ও পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। সাজেক ভ্যালিতে দুই আঞ্চলিক সংগঠনের ডাকা অবরোধ ও গোলাগুলির পর প্রশাসনের সাময়িক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞায় গতকাল সকাল থেকেই সাজেক হয়ে পড়েছে পর্যটকশূন্য। পর্যটক নিয়ে সাজেক অভিমুখী চলাচল করা চাঁদের গাড়িগুলোর ছিল পুরোপুরি বন্ধ। দীঘিনালা থেকে সাজেক ভ্যালি যাওয়ার ৪০ কিলোমিটার একমাত্র সড়কটিতে যান চলাচল বন্ধ থাকায় স্থানীয়রা বাধ্য হয়ে দীর্ঘ পাহাড়ি পথ হেঁটে গন্তব্যে চলাচল করছেন। গঙ্গারাম, উজো বাজার এবং বাঘাইহাট বাজারের বেশির ভাগ দোকানপাটের ঝাঁপ ছিল নামানো। ক্রেতাদের উপস্থিতিও ছিল নগণ্য। বাঘাইহাট স্টেশনের লাইনম্যান মো. জসিম জানান, ‘অবরোধকারীদের পিকেটিংয়ের কারণে কোনো যানবাহন চলছে না।’ দুই আঞ্চলিক সংগঠনের ডাকা এ অবরোধ ও গোলাগুলির পর পর্যটকদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সাজেকে সাময়িক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন। এর ফলে গতকাল সকাল থেকেই দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র সাজেক ভ্যালি একেবারে পর্যটকশূন্য হয়ে পড়েছে। কোনো পর্যটক না থাকায় ভ্যালির কটেজ ও রিসোর্টগুলো এখন নীরব। পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা বলা হলেও সাজেক ও বাঘাইহাট এলাকায় বাসিন্দাদের মধ্যে বিরাজ করছে চাপা আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা।
কবে যান চলাচল স্বাভাবিক হবে এবং সাজেক ভ্যালি আবার পর্যটকদের পদচারণে মুখর হয়ে উঠবে, এখন সেই অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ। এর আগে বৃহস্পতিবার সকালে উজো বাজার এলাকায় অবরোধকারীরা পর্যটকদের গাড়িবহর আটকালে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর সশস্ত্র গোষ্ঠী অতর্কিত গুলি চালালে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে বন্দুকযুদ্ধ চলে। পরে পরিস্থিতি শান্ত হলে আটকে পড়া ২ হাজার ৯৩৩ পর্যটককে কড়া নিরাপত্তায় খাগড়াছড়ি পৌঁছে দেওয়া হয়। রাঙামাটি প্রতিনিধি ফাতেমা জান্নাত মুমু জানান, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি জেএসএসের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাে র অভিযোগ তুলে সংগঠনটিকে সাজেক থেকে সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে দ্বিতীয় দফা অবরোধ পালন করেছে কারবারি অ্যাসোসিয়েশন ও গণঅধিকার রক্ষা কমিটি। শুক্রবার সপ্তাহিক ছুটির দিন থাকলেও অবরোধ কর্মসূচি চলমান ছিল ওই সংগঠনের। রাঙামাটি বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়ন উজো বাজার এলাকায় ছিল না কোন অবরোধকারী। দোকানপাট ছিল বন্ধ। অভ্যন্তরীণ সব যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকলেও খাগড়াছড়ি, দীঘিনালা ও বাঘাইছড়ি সড়কে যানবাহন চলাচল ছিল স্বাভাবিক। খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি জহুরুল আলম জানান, সাজেক থেকে নিরাপদে খাগড়াছড়িতে ফিরে পর্যটকরা এখন খাগড়াছড়ি পর্যটনের স্পটগুলোতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ফলে খাগড়াছড়ির পর্যটন স্পটগুলো বেশ জমজমাট হয়ে উঠেছে। গতকালও অবরোধের ফলে খাগড়াছড়ির গাড়ির কাউন্টার থেকে কোনো যানবাহন ছেড়ে যায়নি। সাজেক থেকেও কোনো যানবাহন খাগড়াছড়ি আসেনি। সাজেক এখন পর্যটকশূন্য।
পরিবহন সংস্থা সাজেক কাউন্টারের আরিফুল ইসলাম বলেন, অবরোধের কারণে সাজেকের পর্যটন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যানবাহনের শ্রমিকরা কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। এদিকে খাগড়াছড়িতে সাজেক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং পর্যটন কেন্দ্রগুলো খুলে দেওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল বিকালে পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও পরিবহন শ্রমিকসহ স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে খাগড়াছড়ি পৌরসভার শাপলা চত্বরে এ প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে বিক্ষোভকারীরা একটি মিছিল বের করে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পরে মিছিলটি পৌর শাপলা চত্বরে গিয়ে প্রতিবাদ সমাবেশে মিলিত হয়। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন পার্বত্য যানবাহন সমিতির সভাপতি আইয়ুশ চাকমা। এ সময় বক্তব্য রাখেন পরিবহন শ্রমিক নেতা জসিম উদ্দিন, উজ্জ্বল, মোহাম্মদ আসাদ মাসুম ও ওমর ফারুক কুসুম। বক্তারা বলেন, সাজেকে পর্যটকদের যাতায়াত বন্ধ থাকায় পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও পরিবহন খাতের মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাই পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দ্রুত সাজেক ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক করার দাবি জানান তারা।



