বান্দরবানের গহিন বনে কথিত আলাদা রাজ্য প্রতিষ্ঠার অপতৎপরতায় লিপ্ত
সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপ কেএনএ চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী দমনে চলমান সেনা
অভিযান লক্ষ্য করে আবারও হামলা চালিয়েছে।
এতে সেনাবাহিনীর ২ সৈনিক প্রাণ হারিয়েছে। দুই সেনা অফিসার গুলিতে গুরুতর
আহত হয়েছেন। তারা চট্টগ্রাম সিএমএইচে চিকিৎসাধীন। ঘটনার পর নিরাপত্তা
বাহিনীর অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে। দুই সৈনিক প্রাণ হারানোর ঘটনায় গভীর
শোক প্রকাশ করেছেন সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল এসএম শফিউদ্দিন আহমেদ।
আন্তঃবাহিনী গণসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো
হয়েছে, জেলার রুমা উপজেলায় সুংসুংপাড়া সেনা ক্যাম্পের আওতাধীন জারুলছড়ি
পাড়ার পানিরছড়া এলাকায় গত মঙ্গলবার দুপুর ১টা ৫৫ নাগাদ এ ঘটনা ঘটে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন কেএনএর (কুকি চিন
ন্যাশনাল আর্মি) অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা এ হামলা চালায়।
দু’জনের একজন মেজর ও অপরজন ক্যাপ্টেন। দুর্গম পানিরছড়া এলাকার কাছাকাছি
সেনা টহলদল পৌঁছলে কেএনএ সন্ত্রাসীদের ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস
(আইইডি) নিক্ষেপ করে এবং মুহুর্মুহু গুলিবর্ষণ করে। এতে চার সৈনিক গুরুতর
আহত হন। ঘটনার চার ঘণ্টা পর হেলিকপ্টার পাঠিয়ে তাদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম
সিএমএইচে নিয়ে আসা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সৈনিক আলতাফ আহমেদ ও
তৌহিদ মারা যান। আহত দুই সেনা অফিসার চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের অবস্থা
গুরুতর। তবে আশঙ্কাজনক নয় বলে সিএমএইচ সূত্রে জানা গেছে।
উল্লেখ করা যেতে পারে, গত ১২ মার্চ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে জাতীয় শিশু
দিবস ও মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায়
স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের উদ্দেশ্যে যাওয়ার সময় নিরাপত্তায় নিয়োজিত সেনা টহল
দলের ওপর কেএনএ সদস্যরা অতর্কিত গুলিবর্ষণ করে। এতে সেনাবাহিনীর মাস্টার
ওয়ারেন্ট অফিসার নাজিম উদ্দিন গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে মারা যান, আহত হন
দুই সেনা সদস্য।
আইএসপিআর সূত্রে জানা গেছে, বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন কেএনএ বান্দরবানের রুমা
রোয়াংছড়ি ও থানচি উপজেলার গহিন অরণ্যে সন্ত্রাসী তৎপরতার মাধ্যমে অরাজক
পরিবেশ সৃষ্টির অপতৎপরতায় লিপ্ত। পাহাড়ে এ সংগঠনটি ‘বম পার্টি’ নামে
পরিচিত। এ সংগঠনটির প্রধান নাথান বম। এরা মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে নতুন
জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বিয়া জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ
দেয়। এই তথ্য পাওয়ার পর বছরের অক্টোবর মাস থেকে বান্দরবানের গহিন বনে
নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান শুরু হয়। এতে কেএনএর একাধিক আস্তানা গুঁড়িয়ে
দেওয়া হয়। কেএনএ ও জঙ্গি সংগঠনের বেশকিছু সদস্য গ্রেপ্তার হয়। নিরাপত্তা
বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সেখানকার বেশকিছু এলাকায় পর্যটকদের প্রবেশে
নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
গত মঙ্গলবার জারুলছড়ি পাড়ায় সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদীদের তিনটি আস্তানা
রয়েছে বলে খবর পেয়ে সেনাবাহিনীর টহল দল সেখানে পৌঁছানোর চেষ্টা করে।
পানিরছড়া এলাকার কাছাকাছি পৌঁছানোর পর সেখানে কেএনএ সন্ত্রাসীরা আইইডি
দিয়ে হামলা চালায়। এর পাশাপাশি সেনা টহল লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করতে থাকে।
সেনা সদস্যরাও পাল্টা গুলিবর্ষণ করে। কেএনএ সন্ত্রাসীরা দ্রুত ঘটনাস্থল
ত্যাগ করে। ওই সময় তাদের গুলিতে আহত হন চার সেনা সদস্য। সন্ধ্যার আগেই
তাদের চট্টগ্রাম সিএমএইচে নিয়ে আসা হয়।
পাহাড়ের বম, খুমি, লুসাই, খিয়াং, পাংখোয়া, মোরোÑ এ ছয় নৃগোষ্ঠীর লোকজনের
জন্য আলাদা রাজ্য প্রতিষ্ঠার কথা বলে কেএনএফ (কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট)
প্রতিষ্ঠা করেন নাথান বম। এই কেএনএফের সামরিক শাখা হচ্ছে কেএনএ। এ সংগঠনটির
শাখা রয়েছে ভারতের মিজোরামে। এ সংগঠনের নিজস্ব ইন্টারনেট পেজে বলা আছে,
রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি, বরকল, জুরাইছড়ি, বিলাইছড়ি উপজেলা এবং বান্দরবানের
রোয়াংছড়ি, রুমা, থানছি, লামা ও আলিকদম নিয়ে কেএনএফ আলাদা রাজ্য গড়তে চায়।
২০০৮ সালে এ সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং ২০১৭ সালে এর সশস্ত্র শাখা
কেএনএর অপতৎপরতা প্রকাশ্যে আসে।
শুরুতে তাদের অপতৎপরতা নিয়ে প্রশাসন খুব বেশি উদ্বিগ্ন না হলেও জঙ্গি
সংগঠন জামা’আতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বিয়ার সঙ্গে গোপন আঁতাত করে সমতলের
একশ্রেণির যুবকের জঙ্গি প্রশিক্ষণ দেওয়ার তথ্য ফাঁস হওয়ার পর সেনা অভিযান
শুরু করা হয়। বর্তমানে এ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এখনো এদের অপতৎপরতা
বান্দরবানের গহিনে সীমাবদ্ধ রয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনী একের পর এক এদের
আস্তানা গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। অভিযানে টিকতে না পারলে এরা সীমান্তের ওপারে
নির্বিঘেœ চলে যায়। আবার সুযোগ বুঝে এপারে চলে এসে অপকর্ম চালায়।
রুমা উপজেলার গহিনে থিন্দন এলাকায় কেএনএর একটি ট্রেনিং সেন্টার রয়েছে বলে
পাহাড়ের সূত্রগুলো জানিয়েছে। এ ছাড়া এ উপজেলার আরও কয়েকটি এলাকায় এদের
বিক্ষিপ্ত ক্যাম্প রয়েছে। এমন একটি আস্তানার খবর পেয়ে গত মঙ্গলবার
সুংসুংপাড়া সেনাক্যাম্প থেকে কমা-ো মেজর মনোয়ারের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর
একটি টহলদল অভিযানে বের হয়েছিল। পানিরছড়া এলাকায় পৌঁছানোর আগে আইআইডি
বিস্ফোরণের পাশাপাশি কেএনএ সদস্যরা এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করে।
কেএনএ সম্পর্কে জানা গেছে, এদের সামরিক শাখার শতাধিক সদস্য গেরিলা
প্রশিক্ষণের জন্য মিয়ানমারের কাচিন প্রদেশে যায়। সেখান থেকে ২০২১ সালে এ
দলটি ফিরে এসে এলাকাজুড়ে সন্ত্রাসী তৎপরতা চালাচ্ছে। বান্দরবানের বিভিন্ন
সূত্র মতে, বর্তমানে সেনা অভিযানের ফলে কেএনএর অধিকাংশ আস্তানা গুঁড়িয়ে
গেছে। কথিত আলাদা রাজ্য প্রতিষ্ঠার দাবি এখন শুধু নামেই রয়েছে। বুধবার রুমা
উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে।
সেনা সদস্যদের তিনটি টিম তিন দিক থেকে থিন্দন এলাকা ঘিরে অপারেশন চালাচ্ছে।