কেপভার্দে নামে পৃথিবীতে একটি দেশ আছে তা অনেকেরই জানা ছিল না। এক বিশ্বকাপ খেলে দেশটির নাম সবার মুখে মুখে। ২০২৬ সালে দুনিয়া কাঁপানো আসরে অভিষেক হয়েছিল আফ্রিকা মহাদেশের এই দেশটির। যে দেশটিকে চিনত না, তারাই কি না বিশ্বকাপে প্রথম খেলতে এসেই বিশ্বকে চমকিয়ে দিয়েছে। বেশি দূর যেতে পারেনি, নকআউট পর্বেই থেমে গেছে। লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার বিপক্ষে দারুণ লড়াই করে বিদায় নিতে হয়েছিল। যে স্পেন ১৬ বছর পর এবার বিশ্বকাপের ট্রফি ফিরে পেয়েছে। তাদেরই কি না গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে ড্র করে রুখে দিয়েছে। দুবারের আরেক সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়েকে ড্র করে আটকে দেয়। যে কেপভার্দে বিশ্বে হইচই ফেলে দিয়েছিল তাদের দলে স্থানীয় ফুটবলার ছিলেন একজন। ২৬ জনের মধ্যে ২৫ জনই ছিলেন প্রবাসী বা অন্য দেশে জন্ম নেওয়া। বিশ্বকাপে বিভিন্ন দেশেও প্রবাসীরা খেলছেন। এ ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু কেপভার্দে যেভাবে আলোড়ন তুলেছে অন্য কারোর পক্ষে তা সম্ভব হয়নি। তাই তো ফুটবলের দুর্বল দেশগুলোর অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছে কেপভার্দে।
দলের শক্তি ও সাফল্য আনতে বাংলাদেশ এখন কেপভার্দে হতে চাচ্ছে। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) এখন সেই পরিকল্পনা নিয়েই নাকি এগোচ্ছে। জামাল ভূঁইয়াকে দিয়েই বাংলাদেশ জাতীয় দলে প্রবাসীর আগমন। এরপর তারিক কাজী ও কাজিম শাহরা খেলছেন। এলিটা কিংসসে তো নাইজেরিয়ার নাগরিকত্ব বাদ দিয়েই জাতীয় দলে নাম লেখান। জামাল, তারিক ও কাজিম টিকে থাকলেও এলিটাকে সরে যেতে হয়েছে। প্রবাসীতে বড় চমকটা আসে হামজা দেওয়ান চৌধুরীকে নিয়ে। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই ফুটবলারকে বাংলাদেশে খেলানোর জন্য অনেক আগে থেকেই চেষ্টা করা হচ্ছিল। ২০২৫ সালে ২৬ মার্চ শিলংয়ে এশিয়ান কাপ বাছাই পর্বে ভারতের বিপক্ষে অভিষেক হয় তাঁর। এরপর সামিত সোম, ফাহমিদুল ইসলাম, জায়ান আহমেদ, কিউবা মিচেলরা প্রবাসী কোটায় খেলেন। যদিও চ্যাম্পিয়ন হয়ে চূড়ান্ত পর্বে খেলতে পারেনি বাংলাদেশ। তবে হামজারা লাল–সবুজের জার্সি গায়ে জড়ানোর পর ফুটবলে নতুন প্রাণের সঞ্চয় হয়। ঢাকায় জাতীয় দলের প্রতিটি ম্যাচে উপচে পড়া দর্শকের সমাগম ঘটছে। প্রবাসীরা খেললেই ব্যর্থতার বৃত্ত ভাঙবে, হতাশা দূর হবে–এ আত্মবিশ্বাসটা তৈরি হয় ফুটবল সংগঠকদের। দলের শক্তি ও পরিবর্তন আনতে বাফুফে প্রবাসী ফুটবলারদের খুঁজে বেড়াচ্ছে। যাকে ভালো মনে করছে তাঁকেই উড়িয়ে এনে যাচাইবাছাই করছে। আসিয়ান কাপেই দেখা গেল জাতীয় দলের চূড়ান্ত স্কোয়াডে প্রবাসীদের ভিড়। জামাল, তারিক, কাজিম তো ঘরোয়া লিগে খেলছেন। দীর্ঘ ১০ বছর ধরে জামাল জাতীয় দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাদের ক্ষেত্রে এখন প্রবাসী শব্দ মানানসই না হলেও তার পরও তাদের নিয়ে আসিয়ান কাপে প্রবাসীর সংখ্যা দাঁড়িযেছিল ৯ জনে। কাজিম ট্রায়াল থেকেই বাদ পড়েন।
জামাল, তারিক, হামজা, সামিত, জায়ান, ফাহমিদুল ও নতুনভাবে দলে জায়গা পান ফারহান আলী, জিদান ইউসুফ এবং সুকিইতোফুসা। এতেও টুর্নামেন্টে জাতীয় দলের ভরাডুবি ঘটেছিল। বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়ার কাছে ২–৯ গোলের হারের লজ্জাটা ফুটবলপ্রেমীদের ব্যথিত করেছে। ফলাফল যাই ঘটুক এরা যে সামনেও জাতীয় দলে থাকবেন তা নিশ্চিত। শুধু তাই নয়, আসন্ন সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ দলে প্রবাসীর সংখ্যা বাড়ছে। রোনাল সুলিভান সাফ খেলতে আসছেন তা বাফুফে থেকেই ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এমন হতে পারে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে প্রবাসীদের নিয়েই বেস্ট ইলেভেন গড়া হবে। এই তালিকার বাইরে আরও তিনজন প্রবাসী যোগ হতে পারেন।
বাফুফের এক সদস্য জানালেন, ‘সাফই হবে আমাদের অগ্নিপরীক্ষা। টুর্নামেন্টে মূলত প্রবাসীদের গুরুত্ব দিয়ে চূড়ান্ত দল হবে। এখন কজন সুযোগ পাবেন তা কোচ পরীক্ষা–নিরীক্ষা করে রায় দেবেন। ২৩ বছর আগে বাংলাদেশ একবারই সাফ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। ঢাকাতেই আমরা ট্রফি উৎসবে মেতেছিলাম। এবার যদি চ্যাম্পিয়ন হয় তাহলে প্রবাসীদের গুরুত্বটা আরও বেড়ে যাবে। দল সাজাতে বাফুফের পরিকল্পনা থাকবে অন্যরকম।’ কেপভার্দের পথে বাংলাদেশ হাঁটবে কি না তা অনেকটা নির্ভর করছে সাফের সাফল্যের ওপর। জাতীয় দলের পরিবর্তন আনতে হামজা নাকি বাফুফেকে প্রেসক্রিপশন দিয়েছেন বিদেশি লিগে খেলা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের গুরুত্ব দিতে।
২০৩০ বিশ্বকাপে ৬৮টি দেশের খেলার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে চূড়ান্ত পর্বে এশিয়ার কোটা বাড়বে। হামজা নাকি কেপভার্দের উদাহরণ টেনে বলেছেন, ওরা বিশ্বকাপ খেলবে স্বপ্নে ভেবেছিল? নানা পরিকল্পনা করে এতদূর এসেছে। ২০৩০ বিশ্বকাপ না হোক পরিকল্পনা টিকিয়ে রাখতে হবে। এতেই স্বপ্নপূরণ হবে। বিষয়টি নিয়ে বাফুফের কেউ কথা বলতে চাননি। তবে একজন বলেছেন, ‘প্রবাসী ফুটবলার দিয়ে অন্য দেশ যেখানে উপকার পাচ্ছে। সেখানে বাংলাদেশ এমন পদক্ষেপ নিলে খারাপ কী? প্রবাসী বলতে তো ওরা বিদেশি নন। দেশের হয়েই খেলবেন।’



