হুতিদের হামলায় সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের পর দাম্মাম বিমানবন্দরের কার্যক্রমও সীমিত হওয়ায় একের পর এক ফ্লাইট বাতিল হচ্ছে। লন্ডভন্ড হয়েছে সৌদিগামী ফ্লাইটের শিডিউল। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে সৌদিগামী ৫১টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এতে দেশে আটকে পড়েছে সাড়ে ৫ হাজার বাংলাদেশি। ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের রিয়াদগামী সব ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। ঢাকায় এসে শাহজালাল বিমানবন্দরে পৌঁছানো প্রবাসী কর্মীরা পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে। আটকে পড়াদের অনেকেরই সৌদি আরবে প্রবেশের সময়সীমা শেষের দিকে থাকায় তৈরি হয়েছে তাঁদের কাজের অনিশ্চয়তা। এ অবস্থায় বিকল্প ফ্লাইটে সৌদি আরবে যাত্রী পাঠানোর চেষ্টা করছে সরকার। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সৌদি আরবে বসবাসরত বাংলাদেশিদের সতর্ক থাকতে বলেছে বাংলাদেশ দূতাবাস। সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোয় হুতিদের হামলায় গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ৫১টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) জানিয়েছে, সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোয় সীমিত পরিসরে ফ্লাইট পরিচালনার কারণে এখন পর্যন্ত ১২টি সরাসরি ও ৩৯টি ট্রানজিট ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। দেশে আটকে পড়েছে ৫ হাজার ৪১৮ জন যাত্রী। বাতিল হওয়া সরাসরি ফ্লাইটের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ৪, ইউএস–বাংলা এয়ারলাইনসের ২, সাউদিয়া এয়ারলাইনসের ৩ ও রিয়াদ এয়ারওয়েজের ৩টি ফ্লাইট রয়েছে। এ ছাড়া ইন্ডিগো এয়ারলাইনসের ১৬, সালাম এয়ারের ৩, ইজিপ্ট এয়ারের ১, এমিরেটস এয়ারলাইনসের ৯, কাতার এয়ারওয়েজের ৫, ফ্লাই দুবাইয়ের ৫টি ট্রানজিট ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এদিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের রিয়াদগামী ফ্লাইট ১৭ অক্টোবর এবং ইউএস–বাংলার ২১ অক্টোবর পর্যন্ত সব ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। গতকাল পৃথক বিজ্ঞপ্তিতে বিমান বাংলাদেশ ও ইউএস–বাংলার পক্ষ থেকে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। বিমান জানায়, সংস্থাটির ঢাকা থেকে রিয়াদগামী সব ফ্লাইট ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে।
ইউএস–বাংলার জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক কামরুল ইসলাম বলেন, ‘২১ অক্টোবর পর্যন্ত ইউএস–বাংলার ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে।’ বেবিচকের তথ্যানুযায়ী, সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোয় কার্যক্রমের ওপর বিধিনিষেধের প্রভাব এখন শুধু সরাসরি ফ্লাইটে সীমাবদ্ধ নেই; বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসের ট্রানজিট ফ্লাইটও এর আওতায় এসেছে। রিয়াদগামী সব ফ্লাইট হয় অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে, নয়তো বাতিল করা হয়েছে। এতে যাত্রীদের ভ্রমণ পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। গতকাল দুপুরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহির্গমন টার্মিনালের বাইরে দেখা যায় রিয়াদগামী ফ্লাইটের অপেক্ষায় থাকা যাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা এসব প্রবাসীর অনেকেই জানেন না কবে আবার সৌদি আরবে যাওয়ার সুযোগ পাবেন, কিংবা টিকিটের তারিখ পরিবর্তন করতে কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। ফ্লাইট বাতিলের পর বিকল্প যাত্রার নিশ্চয়তা না পেয়ে তাঁদের চোখে মুখে ছিল দুশ্চিন্তার ছাপ। বিদেশে কর্মস্থলে সময়মতো ফিরতে না পারার আশঙ্কার সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন করে যাতায়াত ও থাকা–খাওয়ার খরচের চাপ। সৌদিপ্রবাসী রফিকুল ইসলামের ছুটি কাটিয়ে গতকাল দুপুরে রিয়াদে ফেরার কথা ছিল। আগেই টিকিট কেটে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নির্ধারিত সময়ে বিমানবন্দরে পৌঁছান তিনি। কিন্তু সেখানে গিয়ে জানতে পারেন তাঁর ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। পরবর্তী ফ্লাইট কখন ছাড়বে, সে সম্পর্কেও নিশ্চিত তথ্য পাচ্ছেন না। বিমানবন্দরের বহির্গমন টার্মিনালের বাইরে দাঁড়িয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘হঠাৎ ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় বিপাকে পড়েছি। আমাকে যেকোনো মূল্যে সৌদি আরব যেতে হবে। সময়মতো যেতে না পারলে চাকরি বাঁচানো যাবে না।
সবকিছু অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যাবে। পরবর্তী ফ্লাইটের সিদ্ধান্ত জানানো হলে ভোগান্তি কিছুটা হলেও কমত।’ রফিকুলের মতো অনেক প্রবাসীই এখন অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। যথাসময়ে কর্মস্থলে যোগ দিতে না পারলে চাকরি, ভিসার মেয়াদ ও নিয়োগকর্তার শর্ত নিয়ে সমস্যায় পড়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা। এদিকে জরুরি পরিস্থিতিতে বিকল্প ফ্লাইটে যাত্রী পাঠানোর চেষ্টা করছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। মন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, ‘যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে এয়ার অপারেটরদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিকল্প ব্যবস্থায় যাত্রীদের দাম্মাম ও মদিনা এয়ারপোর্টে পাঠানো হবে। রিয়াদগামী ফ্লাইট বন্ধ শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা বিশ্ব থেকে বন্ধ করা হয়েছে। রিয়াদগামী যাত্রীদের হয়রানি বন্ধে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’ এ প্রসঙ্গে বিমানের এমডি কাইজার সোহেল আহমেদ বলেন, ‘দাম্মাম ও মদিনাগামী ফ্লাইটে যাত্রীদের সমন্বয় করার চেষ্টা চলছে। যাঁদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তাঁদের বিকল্প ফ্লাইটে মদিনা অথবা দাম্মামে পাঠানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে তাঁরা সেখান থেকে কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারেন এবং ভিসার মেয়াদ নষ্ট না হয়।’ তিনি বলেন, ‘সৌদি আরব আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি গন্তব্য। সেখানে অনেক বাংলাদেশি বসবাস করেন। সুতরাং আমরা ওইভাবে সমন্বয় করছি।’
বাংলাদেশিদের সতর্ক থাকার আহ্বান দূতাবাসের : মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের সতর্ক থাকার এবং স্থানীয় আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে রিয়াদস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস। গতকাল দূতাবাসের জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে সৌদি কর্তৃপক্ষের জারি করা নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ ও প্রতিপালনের জন্য বাংলাদেশিদের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ ও জনবহুল স্থান এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। দূতাবাস জানায়, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতি সম্পর্কিত যেকোনো তথ্য, ছবি বা ভিডিও ধারণ, আদানপ্রদান এবং সমাজমাধ্যমে প্রকাশ করা সৌদি আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ কারণে সৌদি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে এ ধরনের ছবি, ভিডিও বা স্পর্শকাতর তথ্য ফেসবুক, ইউটিউব, এক্সসহ কোনো সমাজমাধ্যমে প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়েছে দূতাবাস। এ ছাড়া এসব ছবি, ভিডিও বা স্পর্শকাতর তথ্য মুঠোফোনে সংরক্ষণ কিংবা অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করা থেকেও বিরত থাকতে বলা হয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে যোগাযোগের জন্য দূতাবাসের কয়েকটি হটলাইন নম্বরও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। শ্রমসংক্রান্ত টোল ফ্রি নম্বর : ৮০০১০০০১২৫, পাসপোর্টসংক্রান্ত টোল ফ্রি নম্বর : ৮০০১০০০১২৬, ডিপ্লোম্যাটিক উইং : ৮০০১০০০১২৪, মৃত্যুসংক্রান্ত হটলাইন : +৯৬৬৫৭০২১২১৮০।
দেশে ফিরছেন আটকে পড়া বাংলাদেশিরা : হুতিদের হামলায় সৌদি আরবে ৫ শতাধিক বাংলাদেশি আটকে পড়েছেন। তাদের দাম্মামস্থ কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গতকাল রাতে রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইং থেকে পাঠানো সবশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, হামলার পর রিয়াদ বিমানবন্দরে ৫ শতাধিক বাংলাদেশি আটকে পড়েন। এর মধ্যে ১৭ জনকে ম্যারিয়ট হোটেল, ২৫ জনকে রেডিসন ব্লু এবং ৪০ জনকে রিয়াদস্থ প্রিন্সেস নুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডরমিটরিতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সৌদিয়া এয়ারলাইনসের বাতিল হওয়া এসভি৮০৪ ফ্লাইটের প্রায় ৪০০ যাত্রীকে সৌদি ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের সহায়তায় দাম্মামস্থ কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে বাংলাদেশে ফেরত আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাসপোর্ট হারিয়ে ফেলা তিনজন বাংলাদেশির অনুকূলে জরুরি ট্রাভেল পারমিট ইস্যু করেছে দূতাবাস। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, শনিবারের হামলায় আহত বাংলাদেশির সংখ্যা বেড়ে ২৭ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে ১১ জন সৌদিপ্রবাসী কর্মী এবং ১৬ জন ওমরাহ যাত্রী। ১২ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসাধীন বাকি ১৫ জনের মধ্যে পাঁচজনের অবস্থা গুরুতর। তাদের মধ্যে রিয়াদ ন্যাশনাল গার্ড হাসপাতালে আইসিইউতে থাকা নওগাঁর সাফফাত রহমানের ডান পা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং মুখমণ্ডল ঝলসে গেছে।



