অনেক মাদকসেবী কম খরচের বিকল্প হিসাবে ‘ঝাক্কি’র দিকে ঝুঁকছেন। ঠান্ডা–কাশির সিরাপের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে তৈরি এই মাদককে অনেকে ‘মিক্সচার’ও বলেন। ৫০ থেকে ১২০ টাকার মধ্যে তৈরি করা যায় বলে মাদকসেবীদের কাছে এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে। ফেনসিডিল এলাকাভেদে সাড়ে ৬ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে অতিরিক্ত খরচ বহন করতে না পেরে অনেকেই ‘ঝাক্কি’ সেবন করছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ঝাক্কিসেবী জানান, ইয়াবা, গাঁজা ও মদের তুলনায় ঝাক্কির নেশা তাদের কাছে বেশি পছন্দের। বর্তমানে নিষিদ্ধ স্কাফ সিরাপের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়েও ঝাক্কি তৈরি করা হচ্ছে। এতে খরচ পড়ে ২৫ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত। ফেনসিডিলের সহজলভ্যতা কমলেও ডেমরায় হাত বাড়ালেই মিলছে ইয়াবা, মদ ও গাঁজা। শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীর তীরবর্তী এবং নিরিবিলি এলাকাগুলোতে মাদকের ব্যাপকতা বেশি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
থানা পুলিশের অন্য কাজে ব্যস্ততার সুযোগে মাদক ব্যবসায়ীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইয়াবা সেবন ব্যয়বহুল ও ক্ষতিকর এবং ফেনসিডিলের দাম অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই এখন ঝাক্কির দিকে ঝুঁকছেন। ডেক্সপোটেন, ওকফ, সুডুকফ, তুসকা, ফেনারগ্যান, ডায়ড্রিল, মিরাকফ ও এমব্রক্সসহ বিভিন্ন ঠান্ডা–কাশির সিরাপ ৮৫ থেকে ১১০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। ফেনারগ্যান, এমব্রক্স ও ডায়ড্রিল পাওয়া যাচ্ছে ৪০–৫০ টাকায়। ইউনানি বাশক, এসবি বাশক ও এডোবাস সিরাপের সঙ্গেও ঘুমের ওষুধ মেশানো হচ্ছে। নকটিন–১০, সেডিল, টিপটিন, ইজিয়াম ও এমিলিনসহ বিভিন্ন ঘুমের ওষুধ ১০ টাকা পাতা ও ১০০ টাকায় বক্স হিসাবে কিনে সিরাপের সঙ্গে মেশানো হয়।
কিছুটা বেশি দামের রিবোটিল, ডিসোপেন ও লোনাপামও ব্যবহার করছেন ঝাক্কিসেবীরা। সরেজমিন গেলে এলাকাবাসী অভিযোগ, ডেমরা ও আশপাশের এলাকায় ফেনসিডিল, ইয়াবা, গাঁজা ও মদ বিক্রি হচ্ছে। বাঁশেরপুল এলাকায় একটি বারে সহজলভ্য হয়েছে মদ। পার্সেল হিসেবেও এসব বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ। ডেমরার বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য ছোট–বড় ফার্মেসি গড়ে উঠেছে। অভিযোগ, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ঠান্ডা–কাশির সিরাপ ও ঘুমের ওষুধ বিক্রি করছেন। আবহাওয়া পরিবর্তনে ঠান্ডা–কাশি ও জ্বর বাড়ায় নেশার জন্য ওষুধ কেনা ব্যক্তিদের আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। আবার উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্য চিকিৎসকের দেওয়া ঘুমের ওষুধের প্রেসক্রিপশন সংগ্রহ করে মাদকসেবীরা সিরাপের সঙ্গে এসব ওষুধ কিনছেন। একাধিক ঝাক্কিসেবী জানান, ফেনসিডিল ও ইয়াবা সেবনে বেশি টাকা লাগে। তাই প্রতিদিন একটি ঝাক্কি খেলেই চলে। কখনো দুই–তিনটিও লাগে।
স্কুল–কলেজের ছাত্রদের পাশাপাশি ছাত্রীরাও ঝাক্কি সেবন করছে বলে তারা দাবি করেন। রাজাখালী এলাকার অভিভাবক মিজানুর রহমান বলেন, থানা পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকলেও ঝাক্কির দৌরাত্ম্য বন্ধে তেমন পদক্ষেপ নেই। এতে অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। সারুলিয়া জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক শামীম মিছির বলেন, ঘুমের ওষুধ ঠান্ডা–কাশির সিরাপের সঙ্গে মিশিয়ে খেলে অতিরিক্ত তন্দ্রা, শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি কমে যাওয়া, বিভ্রান্তি, ভারসাম্যহীনতা, অজ্ঞান হওয়া এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। ডেমরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তাইফুর রহমান মির্জা বলেন, ইয়াবা–ফেনসিডিলের কথা শুনেছি, তবে ঠান্ডা–কাশির সিরাপের সঙ্গে ঘুমের বড়ি মিশিয়ে নেশা করার বিষয়টি এখনই জানলাম। মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা এবং ওয়ার্ডভিত্তিক মাদক ও সন্ত্রাসবিরোধী কমিটি গঠন করতে হবে।



